সুমন ভট্টাচার্য : 
বব ডিলান যেদিন নোবেল পুরস্কার পেলেন, সেদিন সৈয়দ শুজাত বুখারি ফেসবুকে তাঁর পোস্টে লিখেছিলেন, ভাগ্যিস ডিলান এইসময়ের ভারতে জন্মাননি। তাহলে তাঁকে দেশদ্রোহী ধরা হত। তাহলে কী সৈয়দ শুজাত বুখারি এমন একজন কাশ্মীরী ছিলেন, যিনি ভারতবর্ষকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন? একদম নয়। তাহলে ৯০ এর দশকে শুজাত বুখারির সঙ্গে আমার আলাপই হত না। সেই ৯৭-এ শুজাত তো ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডিফেন্স করেসপন্ডেস কোর্স করতেই এসেছিল। অতএব, নেহাতই সাদা এবং কালোর মাপদণ্ডে সৈয়দ শুজাত বুখারিকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘ দেশপ্রেমী’ কিছুই ভাববেন না। শুজাত একজন কাশ্মীরী সাংবাদিক ছিলেন, এবং কাশ্মীরী হওয়ার সুবাদে যা যা সঙ্কট তাঁকে রোজ মোকাবিলা করতে হত, তিনি তা সবই করতেন। শুধু সবচেয়ে কঠিন সঙ্কট- বুলেটকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারলেন না।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শুজাত বুখারির মৃত্যুর খবরটা আসার পর থেকে অসংখ্য মানুষের প্রতিক্রিয়া শুনেছি এবং অনেক বিশিষ্ট সাংবাদিকদের লেখাও পড়লাম। সাগরিকা ঘোষ যেমন তাঁর ব্লগে সরাসরি শুজাত বুখারিকে হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণাকারী একজন সাংবাদিক হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। সাগরিকার মতো সাংবাদিকরা, যারা এখনও সবসময়েই একটা রাজনীতিকে তুলে ধরতে চায়, একধরনের সত্যতা সামনে আনে, তারা কেউ বললেনই না, শুজাত বুখারির দাদা বর্তমানে কাশ্মীর সরকারের, অর্থাৎ কিনা মেহবুবা মুফতি সরকারের আইন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ভুলে যাবেন না, শুজাতের দাদা যে সরকারের মন্ত্রী, সেই সরকারের অন্যতম শরিক বিজেপি ।
তাহলে শুজাত কে? আমাদের বন্ধু শুজাত, যিনি বৃহস্পতিবার বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছেন!তাঁকে এক শ্রেণীর মিডিয়া প্রবল বিজেপি বিরোধী এবং কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে দেখানোর এই প্রয়াসটা কেন? আসলে এটাই আমাদের দেশের তথাকথিত সেক্যুলার রাজনীতি । শুজাতের মৃত্যু যে রাজনীতির আবর্ত্যে এসে পড়েছে, কিন্তু শুজাত কী এটাই চাইতেন! আবার জোরের সঙ্গে বলছি, একদম না। কলকাতায় স্যাটারডে ক্লাবে এক মধ্যান্হ ভোজে আড্ডা দিতে দিতে সৈয়দ শুজাত বুখারি, রাইজিং কাশ্মীরের সম্পাদক, আমাদের পরিস্কারই বলেছিলেন, আলোচনার মাধ্যমেই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান সম্ভব । এবং শুজাত যখন আমাদের এই কথা বলছেন, তখন বুরহান বানির মৃত্যুর পরে কাশ্মীর উপত্যকা জ্বলছে। কিন্তু সেই সময়ে দাঁড়িয়েও শুজাত জানতেন বাস্তবের রাজনীতিতে কী হওয়া সম্ভব।
শুজাত জানতেন, ভারত কাশ্মীরকে নিজের অবিচ্ছ্যেদ্য অঙ্গ মনে করে। অতএব, নয়াদিল্লির পক্ষে সেখান থেকে সরে আসার সম্ভাবনা নেই। সেই জন্যই শুজাত জানতেন হুরিয়ত কন্ফারেন্স বা কাশ্মীরের একশ্রেণীর মানুষ যতই ‘আজাদি’ বলে চিৎকার করুন, বাস্তবে সেটা সম্ভব হবে না। বরং শ্রীনগরের জন্য সেরা সমাধান হচ্ছে নয়াদিল্লির কাছ থেকে আরও সুযোগ সুবিধা আদায় করা এবং কাশ্মীরের উন্নতিকে নিশ্চিত করা। শুজাত এই মতামতটার কথাই বারবার বিভিন্ন আলোচনা চক্রে বলতেন। এবং তার সঙ্গে অবশ্যই বলতেন কাশ্মীরীদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শুনতে। নিজের জাতি বা নিজের জনগোষ্ঠীর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনার কথা যিনি বলেন, তিনি কোন রাজনীতিক সূত্রে ‘ বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হয়ে যান! তাহলে তো দলিতের কথা বলার জন্য আম্বেডকরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে হতে পারে!
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সূত্রে শুজাত বুখারি দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগেও তিনি ফিরলেন তুরস্ক ঘুরে। আর প্রতিবারই প্রায় নিয়ম করে তিনি আমেরিকায় যেতেন, কাশ্মীর নিয়ে বক্তৃতা দিতে। একইসঙ্গে, শুজাত অনেকবার পাকিস্তান তো গিয়েইছেন, পাক অধিকৃত কাশ্মীরও ঘুরে দেখে এসেছেন । তাই সাংবাদিক হিসেবে তিনি ভালই জানতেন পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অবস্থাটা কী ধরনের। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে সৈয়দ শুজাত বুখারিকে ‘আজাদ কাশ্মীরের’ সমর্থক বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে প্রচার করাটা নেহাতই বালখিল্যতা। আসলে যে কোনও কাশ্মীরী সাংবাদিকদের যেটা সঙ্কট, সৈয়দ শুজাত বুখারিকেও সেই সরু দড়িটার ওপর দিয়ে রোজ হাঁটতে হত। এপাশে পা রাখলেই তাঁকে বলা হবে জেহাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এজেন্ট, আর ওপাশে পা রাখলেই তাঁকে বলা হবে ‘দিল্লির লোক বা রয়্যাল গুপ্তচর’। হয়তো শুজাত ওই সরু দড়ির ওপর দিয়ে চলতে চলতে একটু বেশীই আলোচনার টেবিলে বসার কথা বা কাশ্মীর উপত্যকায় শান্তি ফেরানোর কথা বলতে শুরু করেছিলেন । সেজন্যই ঈদের ঠিক আগের দিন ইফতারে আর তাঁর যাওয়া হয়ে উঠল না। জঙ্গিদের বুলেট তাঁকে চিরতরে চুপ করিয়ে দিল।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news