তরুণ সেন :
শ্রীকান্ত মোহতাকে সি বি আই যে আজ ভুবনেশ্বর নিয়ে যাচ্ছে, সেকথা মিডিয়া মারফৎ বৃহস্পতিবারই রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল। এবং তাতে স্টুডিও পাড়ায় জল্পনাও শুরু হয়ে গিয়েছিল যে, মুখ্যমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ সুদীপ বন্দোপাধ্যায় আর তাপস পালের মতোই শ্রীকান্ত স্যারের ভবিষ্যৎও এবার এক-দেড় বছরের জন্য আপাতত শ্রীক্ষেত্রের সি বি আই শ্রীঘরে নিশ্চিন্ত। এই অবসরে কিছু দুর্মুখ আবার নখ বাজাতে শুরু করেছে, শ্রীকান্ত তো গেলেন, মণি নয় কেন?
মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য ছিলেন তাপস এবং সুদীপও, কিন্তু অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ভুবনেশ্বরে ছুটে গিয়েও তিনি কিছুই করে উঠতে পারেননি। স্নেহের হাত আইনের হাতের চেয়ে লম্বা হতে পারেনি। শোনা যায়, সেবার সহোদরের দুখানা হোটেল উদ্বোধন করে তাঁকে নাকি ফিরে আসতে হয়েছিল। সেসব কথা মনে করে, শ্রীকান্ত কি কিছুটা এখন হতাশ? সি বি আই জানে!
মুখ্যমন্ত্রীর কাজের মানুষ, কাছের মানুষ শ্রীকান্তের অফিসে সি বি আই হানা দিলেও হাল ছাড়েননি, বরং কণ্ঠ ছেড়েছিলেন জোরে। তারই জেরে কসবার পুলিশকে ডাক পেড়ে ছিলেন। ভেবেছিলেন, দিদির পুলিশ হয়তো এই সম্ভ্রান্ত সৈনিককে রক্ষা করবেই। পুলিশ চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য সব চেষ্টায় সাফল্য আসে না! শ্রীকান্ত হয়তো ভেবেছিলেন, যেভাবে কয়েক বছর আগে পোর্ট ট্রাস্টের জমিতে অবৈধ ভাবে স্টুডিও করেও পোর্ট ট্রাস্টকে তেমন একটা পাত্তা দেননি স্রেফ খুঁটির জোরে, তেমনি এবার সি বি আই-এর ডাককে পাত্তা না দিয়েও ঠিক লড়ে নেবেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি উল্টো দিক থেকেও হয়!
প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শ্রীকান্তর প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থা ভেঙ্কটেশ ফিল্মস ছড়ি ঘোরাচ্ছে সবার ওপর। আর্টিস্ট, ছোট প্রযোজক, পরিচালক সবার ওপর। তাঁরা কোনও ছবি অফার করলে, সে যেমনই ক্যারেক্টার হোক না কেন, আর্টিস্টদের না-বলার আগে তিনশো বার ভাবতে হয়, কারণ একবার না-বললে রাজরোষে পড়ে আর এখান থেকে কাজ পাবে না। হিসেব মতো, বছরে সব চেয়ে বেশি ছবি হয় এই হাউস থেকেই। ফলে, তাদের চটাতে সাহস করে না কেউই। ওয়েব প্ল্যাটফর্ম ‘হৈ চৈ’ লঞ্চ করার সময় থেকেই প্রচুর ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে মাস মাইনের কন্ট্রাক্ট করে নিয়েছে। লিখিত কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী এঁরা ভেঙ্কটেশের বাইরে কোথাও কাজ করতে পারবেন না। এ যেন সেই বাংলা সিনেমার আদি যুগের স্টুডিও সিস্টেম। যখন অভিনেতা, পরিচালক ও কলাকুশলীরা স্টুডিওর মাস মাইনে করা কর্মচারী ছিলেন। কেউ সেই স্টুডিও বাইরে গিয়ে কন্ট্রাক্ট শেষ হওয়ার আগে কাজ করতে চাইলে মোটা টাকা খেসারত দিতে হতো কিংবা কোর্ট কাছারির চক্কর কাটতে হতো। বাংলা সিনেমার প্রযোজনা ও পরিবেশনা শুরু হয়েছিল যে ভদ্রলোকের হাত ধরে তিনিও অবাঙালি, পার্সি, জে এফ ম্যাডান– তিনি ১৯১২ থেকে ২২-এর মধ্যে ১৭২টা সিনেমা হল তৈরি করেছিলেন। এবং ছোটখাটো প্রযোজকদের ছবি তাঁর হলে চালাতেই দিতেন না। তিনিই তখন ইন্ডাস্ট্রির রাজা। সেই ভদ্রলোকেরই সার্থক উত্তরসূরি শ্রীকান্ত মোহতা। শেয়ার ও মালিকানা মিলিয়ে অধিকাংশ হলেরই টিকি বাঁধা তাঁর হাতে। ছোট প্রযোজকেরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ জানিয়ে আসছেন যে, তাঁরা ছবি বানালেও রিলিজ করার জন্য তেমন হল পাননা। শ্রীকান্ত নাকি তাঁদের সেই সুযোগই দেন না। কখনো দিলেও, অসময়ে ছবির প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি একটি বেসরকারি নিউজ চ্যানেলে এসে প্রযোজক ও অভিনেতা দেবও সেই অভিযোগ জানিয়েছিলেন। ভেঙ্কটেশে মাস মাইনের পরিচালকদের একের পর এক প্রোডাকশন করে যেতে হয়, সে যে মানেরই ছবি বা ওয়েব সিরিজ হোক না কেন! ফলে, প্রোডাকশন হচ্ছে গণ্ডা গণ্ডা, অর্ডার সাপ্লাইয়ে পাতে দেবার যোগ্য হচ্ছে ক’টা তা তো বাংলার দর্শককুল দেখতেই পাচ্ছেন!
যেটা বলার, এই যে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ওপর ভেঙ্কটেশ-এর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ, এর জন্যই শ্রীকান্ত মোহতা ডাক দিলে টলিউড ভিড় করতে বাধ্য হয় মুখ্যমন্ত্রীর সভায় এবং মিছিলে। টলিউডের আপামর সবাই তো আর তৃণমূল নয়, তবু তারাও যেতে বাধ্য হন। কারণ, স্রোতের বিপরীতে হাঁটলেই কাজের সংশয়, কাজ না পেলে খাবেন কি! টলিপাড়ার কানাঘুষোয় জানা গেল, এই জোরের জায়গা থেকেই ভেঙ্কটেশ নাকি নিজেদের শ্যুটিং-এ গিল্ডের নিয়মের তোয়াক্কা না করেও ১৪ ঘন্টার বেশি শ্যুটিং করতে পারে, বিদেশে নিজেদের ইচ্ছেমাফিক টেকনিশিয়ান নিয়ে যেতে চেষ্টা করে, টেকনিশিয়ানদের ন্যূনতম মাইনে দিয়ে থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি অনিয়মের কথা। যা রটে, তার কিছুটা তো সত্য বটে।
শোনা যাচ্ছে, গৌতম কুণ্ডুর কাছ থেকে ২৫ কোটির কেলেঙ্কারি ছাড়াও সারদা কাণ্ডের চাপও নাকি আছে শ্রীকান্তর জীবনে। ফলে, টালিপাড়ায় আশঙ্কা ভেঙ্কটেশ-এর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়ার মতো অবস্থা হলে, যেসব ছবি বা ওয়েব সিরিজের শ্যুটিং সদ্য শেষ হয়েছে, যেগুলোর শ্যুটিং চলছে, যেগুলো ফ্লোরে যাবে– সেসবের কি হবে? আর্টিস্ট ও টেকনিশিয়ানরা সেগুলোর পেমেন্ট পাবেন তো?
ভেঙ্কটেশ সারা বছরে একটার গায়ে গায়ে আর একটা ছবি, সিরিয়াল এবং ওয়েব সিরিজ করে থাকে, তাতে আর যাই হোক, বেশ কিছু মানুষের নিশ্চিত কর্মসংস্থান তো হয়, সেই জায়গাটা এবার টলমলে হয়ে উঠবে না তো?
শ্রীকান্তর গ্রেফতারির মধ্যে পার্থ চট্টোপাধ্যায় গণতন্ত্রের বিপন্নতা দেখেছেন! এসব ওঁরা টাকা কাণ্ডের প্রতিটি গ্রেফতারিতেই দেখেন। কিন্তু টালিগঞ্জ এই টলমলে পরিস্থিতিতে কি দেখছে, কায়েমি স্বার্থ-সাম্রাজ্যের পতন? বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে জিও বা এরসের মতো প্রভাবশালী প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থার পদধ্বনি? ছোট প্রযোজকদের উঠে দাঁড়ানো? নাকি অনিশ্চয়তা?—সেটা সময়ই বলবে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news