সুমন ভট্টাচার্য : 
রামগোপাল ভর্মার ‘কাল্ট’ সিনেমা ‘সত্যা’র এ বছর ২০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ‘সত্যা’ করে বলিউডি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়া অনুরাগ কাশ্যপ থেকে মনোজ বাজপেয়ি, সকলেই এই সিনেমার একটা বিশেষত্বের কথা বলেন। এই সিনেমার মূখ্য চরিত্র, অর্থাৎ সত্যা, কে, তিনি কোথা থেকে মুম্বাই শহরে এসেছিলেন, সেই সম্পর্কে সেলুলয়েডের পর্দায় কিছু বলা হয় না। অর্থাৎ হিন্দি সিনেমার যে প্রচলিত ধারণা, নায়ক উচ্চ বংশের হবে, তার স্কুল এবং কলেজ জীবন নিয়ে অনেক কিছু বলার মতো থাকবে, ‘সত্যা’ সেই সমস্ত স্টিরিওটাইপকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। রামগোপাল বর্মা, পরবর্তীকালে যতই খারাপ থেকে খারাপতর সিনেমা বানান, ‘সত্যা’ দিয়ে তিনি বলিউডে এক নতুন ঘরানার সূচণা করেছিলেন। তাঁর একদা সহযোগী অনুরাগ কাশ্যপরা যে ঘরানাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
‘সত্যা’ দিয়ে বলিউড তার স্টিরিওটাইপ ভাঙলেও কলকাতা কি তার ঘরানাকে বদলাতে পেরেছে? বোধহয় না। প্রায় ২০ বছর আগে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে আমাকে কংগ্রেসের তৎকালীন বিধায়ক, প্রখর বাগ্মী সৌগত রায় বলেছিলেন, ‘বিধানসভার রিপোর্টিং করবে, অথচ আমার উক্তি যাবে না, তাও কখনও হয়?’ আমার এখনও মনে আছে সেই দিন বিধানসভায় দুটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক ছিল। একটি সিইএসসি-র বিদ্যুতের দাম এবং অন্যটি হলদিরামের বেআইনিভাবে কারখানা চালানো। সৌগত রায় আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, যে দুটি বিষয়েই তিনিই বিরোধী কংগ্রেসের হয়ে প্রধান বক্তা। আর একজন যিনি গুরুত্বপূর্ণ, তিনিও কলকাতার বিধায়ক। ঘটনাচক্রে সেই সৌগত রায় এবং কলকাতার অন্য বিধায়কও এখন তৃণমূলের সাংসদ।
কিন্তু সৌগত রায় আমাকে মূলত যেটা বলতে চেয়েছিলেন, সেই কথাটা কতটা সত্যি ছিল? উনি তো আসলে বলতে চেয়েছিলেন, এই শহরের বা এই বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করেন ২০০ বা ২৫০ জন ‘এলিট’। এদের বিধানসভাতে বক্তৃতাই খবরের কাগজে ছাপা হয়, এরাই বিভিন্ন দূতাবাসের পার্টিতে ডাক পান, এদেরই ছবি খবরের কাগজে ছাপা হয়, এদেরই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এদের মধ্যেই কেউ রাজনীতিক, কেউ অধ্যাপক, কেউ কবি, কেউ চলচ্চিত্র নির্মাতা, কেউ ব্যবসায়ী। এই তথাকথিত ‘এলিট’রাই কলকাতার বা রাজ্যের জনমত তৈরি করেন।
কলকাতায় যেমন এই ২০০ বা ২৫০ জনই সমাজের এবং সংস্কৃতির ‘ভাগ্য’ নির্ধারণ করেন, দিল্লিতেও তেমনি ‘লুটিয়েনস দিল্লি’ আছে। রাজধানীর তথাকথিত বিদগ্ধজনেরা এই ‘লুটিয়েনস দিল্লি’র প্রধান চরিত্র। সন্ধ্যেবেলার পার্টিতে, কোনও ক্লাবের সান্ধ্য আড্ডায় তাঁরাই রাজধানীর গতিপথ নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। মজার বিষয়, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসার পর এই ‘লুটিয়েনস দিল্লি’ খুব চিন্তায় পড়ে গেছে। কারণ গুজরাত থেকে আসা মোদি এদের কাউকে চেনেন না, এদের সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডায় বসেন না, কোনও ক্লাবে কাউকে ধরলে বিশেষ পোস্টিং পাওয়াও আর নিশ্চিত নয়। তভলিন সিংহ তাঁর ‘দরবার’ বইতে দিল্লির যে বর্ণনা দিয়েছেন এবং গাঁধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে কারও কারও যে বিস্ময়কর উত্থানের আখ্যান শুনিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদির জমানায় তা হওয়া মুশকিল।
কিন্তু কলকাতা, কলকাতার কি হলো? কলকাতা কি এই স্টিরিওটাইপকে ভাঙতে পারলো? নরেন্দ্র মোদির মতোই মমতা বন্দোপাধ্যায়েরও যে চোখ ধাঁধানো রাজনৈতিক পারফরমেন্স, তাতে তাঁর এই ‘এলিট’দের দরকার লাগার কথা নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কলকাতাতে এই ‘এলিট’রা আজও ছড়ি ঘুরিয়ে চলেছেন, ‘সত্যা’র মতো কেউ এসে আধিপত্যের সগর্ব ঘোষণা করতে পারেনি। প্রায় ২০ বছরের ব্যবধানে যদি চোখ ফিরিয়ে দেখি, তাহলে দেখবো কলকাতার এই তথাকথিত ‘এলিট’রা একই রয়ে গিয়েছেন।
কারা এরা? কাদের ছবি ছাপা হয় এই শহরের পেজ থ্রি পার্টির উজ্জ্বল মুখ হিসাবে? এমন ব্যবসায়ী যিনি নীরব মোদি বা বিজয় মালিয়ার বিদেশে পালিয়ে যাওয়া নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বলে যাবেন, কিন্তু তাঁর নিজেরই ব্যাঙ্কে অনাদায়ী ঋণের পরিমান কয়েক কোটি টাকা। এমন কাগজের সম্পাদক অথবা সম্পাদকের অভিনেত্রী স্ত্রী, যে কাগজের সার্কুলেশন শিয়ালদহ থেকে ট্রামে চেপে বেরলেও গুনে ফেলা যাবে। অথবা এমন পরিচালক যিনি গত চার বছরে কোনও হিট ছবি না দিলেও নায়িকাদের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জনের জন্য খবরে থাকতে পারবেন। অথবা এমন উপাচার্য কিংবা যশস্বী অধ্যাপক যিনি আলিমুদ্দিনে গিয়ে দাঙ্গার তত্ত্ব থেকে স্তালিনের শিল্পনীতি, সবই বোঝাতে পারতেন, কিন্তু আজকাল শুধুই মন্ত্রীদের জন্য ‘থিসিস’ লিখে দেন। একদা এই শহরের এই ‘এলিট’রা নিজেদের বুকসেলফে কটা গ্রামশি কিংবা গ্যাব্রিয়েলা গার্সিয়া মার্কুয়েজ আছে, তাই দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতেন। আলিমুদ্দিনের কৌলীন্য চলে যাওয়ার পর আর তাদের সেই দায়ও নেই। শুধু ‘দাদা’ ধরার বিশেষ দক্ষতা থাকা চাই।
সিরিয়ায় শরনার্থী সংকট হোক, কিংবা বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার উত্থান, যে কোনও বিষয়ে কলকাতার এই ‘এলিট’রা এখনও অক্লেশে বাণী এবং প্রয়োজনে ফটো অপোর্চুনিটিও তৈরি করতে পারেন। তার জন্য প্রয়োজনে ধর্মতলায় দাঁড়িয়ে গরুর মাংসও খাওয়া যেতে পারে অথবা কাজ না পাওয়া কিন্তু কোনও কালে কোনও সিনেমায় মুখ দেখিয়েছেন এমন অভিনেত্রী বান্ধবী যোগাড় করে হাফ প্যান্ট এবং বিশ্বকাপের কোনও দলের জার্সি পরে ছবি তোলালেও ক্ষতি নেই।
‘লুটিয়েনস দিল্লি’ যেমন জানতো না ২০১৪ সালে কোনও মোদি ঝড় এসে তাঁদের সন্ধ্যেবেলার ‘ককটেল পার্টি’, বিদেশি দূতাবাসের দেওয়া ‘জাঙ্কেট ট্যুর’ সবকিছুকেই বানচাল করে দেবে। তেমনই কলকাতার ‘এলিট’রা কি জানেন, কোনও ‘সত্যা’ তাঁদের সাজানো বাগানে আচমকাই ঢুকে পড়বে কিনা?
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news