কিশোর ঘোষ:

মেলা বসার অনেক আগে এসে পড়ে ওরা। বলা ভালো ওদের যাযাবর সংসার আসে। রথ হোক কিংবা রাস, ওরাই তো আনন্দ-মেলার আসল কারিগর। একেকটা ‘ছোট হাতি’তে নাগরদোলার খণ্ডাংশ আসে। টেম্পোতে করে আসে বন্দুক, বেলুন, গরিবের কমদামি উপহার। আর রঙবেরঙের কাচের চুড়ির দোকান, আচার, হরেক মাল ১০টাকার খেলনা, হাতা-খুন্তি-কাপ-প্লেট। আসে রাজ-রানি পুতুল, মাটির ঘাড় নাড়া বুড়ো। ভোজবাজির মতো বিরাট কড়াই, ডাবু হাতা আর কাঠের বড় থালা সমেত এসে পড়ে হালুইকর। মিষ্টি আর নোনতা কাঠি গজা বানাবে কেউ। কেউ বা বানাবে চারকোনা, চানাচুর বাদামও ভাজা হবে সোজা থেকে উল্টো রথ অবধি। আর আড়াই প্যাচের জিলিপি। যা না থাকলে যে কোনও মেলাই অধুরা।
পঞ্জিকা মতে যেদিন রথ তার অন্তত দিন সাতেক আগে মালের মাঠে পড়ে যায় ওদের রঙচটা ত্রিপলের তাবু। ওই তাবুই ঘর-বারান্দা-উঠোন। কীভাবে যে মানিয়ে নেয় মানুষগুলো! বউ-বাচ্চা পরিবার ছেড়ে অস্থায়ী সংসার পাতে কেমন করে! যে কদিন মেলা চলে সে কদিন স্থানীয় স্টেশনের সুলভেই সকালের কাজ সারে। স্টোভ জ্বেলে পালা করে রাঁধেবাড়ে। দুপুরে যখন কাস্টোমার কম তখন খানিক ঝিমিয়ে নেয়। সন্ধে হলে প্রাণ আসে মেলায়। চলে বিকিকিনি, হইচই, শতকটি শব্দব্রহ্ম মুখোরিত জীবনের জলসা। ঘাম ঝরিয়ে বিজনেস করে ওরা। মেলা ফুরোলে টেম্পোতে সংসার চাপিয়ে রওনা দেয় ফের কোনও অচিনপুরের মেলার উদ্দেশ্যে। মেলা না থাকলে তবে বাড়ি ফেরা। অথচ ওরা আদিবাসী যাযাবর উপযাতি নয়। বরং গৃহস্থ হয়েও পেশার কারণে অচেনা অজানা শহরে গ্রামে ঘুরে বেড়াতে হয় বছর ভর প্রায়। এমন মানুষগুলোর যাপন নিয়ে অন্য অনেকের মতো আমারও বড্ড কৌতূহল। অতএব সেবার বারাসাত রথতলার মাঠে ঢুকে পড়েছিলাম ওদের তাবুতে।

এক হালুইকরের ‘বাসায়’। চিমসে চেহারার বয়স গুলিয়ে যাওয়া মানুষটা বললে, ‘সব শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের আশির্বাদ।’
আমি বললাম, ‘রথ আসতে এখনও সাতদিন। চলবে দিন দশেক। তার মানে এক পালাতেই সতেরো দিন বাড়ি ছাড়া। ভালো লাগে?’
সে লোক একমুখ হেসে বললে, ‘না না।’ খানিক চুপ থেকে বললে, ‘শেষবার গয়নাপুরে গেছি ছয় মাস হবে।’
আমি বললাম, ‘সে কী? কেন?’
‘কত মেলা করলাম। আয় উপায় করতি হবে না! মেলায় ঘুরি দোকান না খুললি পেট চলবে?’
ছোট্ট তাবুর ভিতরে নাড়কেল দড়ির খাটিয়া তারই একধারে বসেছি আমি। এদিকে ওদিকে এনামেলের বড় কৌটো অনেকগুলো। চিড়ে মুড়ি থাকে বোধ হয়—আন্দাজে হাতরাই। একদিকে ঝুলছে কালি ধরা হেরিক্যান। আমি বললাম, ‘গয়নাপুরে মিষ্টির দোকান দিলেই তো পারতে। পুজি নেই তাই?’
কথা শুনে হেসে খুন জিলিপিওলা। বললে, ‘সেও ঠিক। তবে কিনা অভ্যাস হয়ে গেছে।’
আমি বলালাম, ‘হুম।’
সে লোক মাথা চুলকে বললে, ‘মেলায় নেশা আছে। প্রথম প্রথম বাড়ির জন্য, বালিশ, বিছানা, বউটা, ছেলেটার জন্য কষ্ট হত। কিন্তু মেলার টান আছে। ম্যাজিকির টান!’
তাবু থেকে বেরিয়েই আসছিলাম। কিন্তু হালুইকরের নামটাই যে জানা হল না! অতএব পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলাম।
সে বললে, ‘মুজিবর। গ্রাম গয়নাপুর, জেলা মুর্শিদাবাদ।
আমি হাতা নেড়ে বললাম, ‘আবার দেখা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।
সে বুকের বাঁদিকে হাত ঠেকিয়ে আকাশের দিকে মুখে তুলে বললে, ‘শ্রীজগন্নাথের কৃপা, পিরবাবার দোয়া যদি থাকে…।’
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news