কিশোর ঘোষ

রথের মেলা বিশ্ব উষ্ণাণের বিরুদ্ধে গেরিলা বিপ্লব।
ভাবুন তো, যে জিনিস হাজার সরকারি প্রচারেও সম্ভব হয় না। বড় বড় প্রবন্ধ লিখেও সাধারণ মানুষকে যে কাজে উৎসাহী করা যায় না, সেই কাজ জগন্নাথ দেবের পুজোর দিন হেলায় ঘটে যায়! আসলে একরকম করে ভাবলে রথ উৎসব হল বৃক্ষ উৎসব। কারণ এই দিন বাঙালি যেমন জিলিপি-পাঁপড় কিনে খায়, যেমন নাগরদোলায় এক চক্কর দুলে নেয়, তেমনি মহানন্দে কম পক্ষে একটি চারগাছ কিনে নিয়ে যায় নিজের বাড়ির উঠোন কী টবে পুতবে বলে। যেমন এক দৃশ্য সবাই দেখেছে—

পাড়ার কাকিমার হাতে হয়তো নতুন কাপডিস আর জিলিপির ঠোঙা, বাচ্চার হাতে খেলনা বন্দুক আর কাকু ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে চলেছে একটি অঙ্কুরিত নাড়কেলের চারা। এই কারণেই মেলার এক দিকে লাইন দিয়ে বসে যায় চারাগাছ বিক্রেতারা। থাকে ডালিয়া-টগর-চন্দ্রমল্লিকা-জবা-জুই যেমন, তেমনি মেলে আম-কাঠাল-পেয়ারার চারাও। যার যেমন ইচ্ছে সে তেমন কিনে নেয়। এর মানে এই নয় যে যাঁরা গাছ কিনছেন তারা বিরাট প্রকৃতি প্রেমিক। এদিনের গাছ কেনার মধ্যে সরল স্বার্থই থাকে। অনেকেই মেহগিনির চারা কেনেন। ঘর করার পরেও একফালি জমি পড়ে আছে হয়তো সেখানেই পুতে দেবেন যত্নে। একদিন সেই গাছ বড় হলে বিরাট দাম হবে। উপকার হবে গরিব সংসারের। ফল-ফলালির গাছ যাঁরা কেনেন তারাও ভাবেন আমের চারাটা বড় হয়ে ফল দেবে। নিজের গাছের আমের স্বাদই আলাদা! তাছাড়া বাজারের কার্বাইড যুক্ত হিমসাগরের বদলে একদিন একটু…। যাঁরা ফুলের চারা কেনেন তারা হয় সৌন্দর্য প্রেমিক, নয় সনাতন ভক্ত। ফুল ফুটলে পুজো দেবেন। কিন্তু ওই অবধি। মোদ্দা কথা এরা কেউ সুভাষ দত্ত নন। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। আসল কথা হল স্বার্থে বা নিঃস্বার্থে বাংলার গৃহস্থের উঠোনে, টবে নতুন করে হাজার হাজার চারাগাছ পোতা হয় রথের মরসুমে। কারণ ‘রথের দিন ঠিক বৃষ্টি হবে।’

কারণ ভরা বর্ষায় আসে জগন্নাথ দেবের পুজোর দিবস। বাঙালি বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো বিলুপ্তপ্রায় বাংলা ক্যালেন্ডারে যে মাস হাতড়ে দেখা হয় কবে রথ সেই মহিনা হল আষাঢ়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।’ গ্রীষ্মের আগুন নেভাতেই তো আকাশ ভরে জরো হয় কালো কুচেকুচে মেঘ। অতএব আবহাওয়া দফতর যাই বলুক রথের দিন বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৯৯%। এবং সেই বর্ষায় মাটি নরম হয় এবং বৃষ্টিই বন্দোবস্ত করে প্রাকৃতিক জলসেচের। অতএব যখন আমাজনের জঙ্গলের একাংশের দখল নিতে চলেছে মুনাফাখোর মাল্টি ন্যাশানাল কোম্পানির শয়তানি। যখন উন্নয়ণের নামে জশোর রোডের, শিলিগুড়ির শতবর্ষ প্রাচীন হাজার হাজার গাছ কেটে বাংলাকে, ভারতকে, পৃথিবীকে সাহারা করে দেওয়ার আত্মঘাতী আয়োজন করে চলেছে একদল নির্বোধ মানুষ। তখন জনন্নাথ দেবের আশির্বাদে স্বার্থে হোক বা সৎ উদ্দেশ্যে, মানুষ প্রাণ ভরে কিনুক চারাগাছ, রোপণ করুক নতুন সবুজ।
চলুন, রথযাত্রার দিন প্রতিবারের মতোই বৃক্ষ উৎসবে মেতে উঠি আমরা।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news