Breaking News
Home / TRENDING / যেখানে নারী অধিক পরাক্রমশালী সেখানে পুরুষও ধর্ষিত হতে পারে

যেখানে নারী অধিক পরাক্রমশালী সেখানে পুরুষও ধর্ষিত হতে পারে

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়:

গত ২৭ শে নভেম্বর, হায়দরাবাদ এক পশুচিকিৎসক নিজের জীবনের বিনিময়ে দেখলেন মানুষ পশুর চেয়েও কতখানি ভয়াবহ হতে পারে। ধর্ষণ করে তাঁকে মেরে ফেলা হল। জ্বালিয়ে দেওয়া হল দেহ। এ অবশ্য নতুন কথা নয়— “দ‍্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রেপ-কালচার”!
তারপর থেকে যদিও সারা দেশের মানুষ বেশ নড়েচড়ে বসেছে, ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে মুখর হয়েছে, প্রতিবাদে ফেটে পড়ছে, স্যোশাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে, আরও কী কী যেন সব হচ্ছে। ভালো কথা।
দিকে দিকে অভিনব সব শাস্তির দাবি উঠছে। সেগুলো কী কী একটু শুনে নেওয়া যাক— জনসমক্ষে ধর্ষকদের পুড়িয়ে মারা, মব লিঞ্চিঙের জন্য অপরাধীদের পাবলিকের হাতে ছেড়ে দেওয়া, হাত-পা বেঁধে ইঁদুর দিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ খাওয়ানো, লিঙ্গচ্ছেদ, বন্য শুয়োরের খাঁচায় ধর্ষকদের রেখে দেওয়া, ফাঁসি-টাসি তো আছেই। মানুষের দোষ নেই, তারা আর আইন-আদালতের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। তাই তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার চাইছে। কিন্তু, ফাঁসি বাদে বাকি শাস্তিগুলি মধ্যযুগীয় বর্বরতা। ভারতবর্ষের মতো একটি দেশ কখনওই এক যুগ পিছিয়ে গিয়ে এইসব শাস্তি অনুমোদন করতে পারে না। তাই এগুলি অলীক কল্পনা এবং জনসাধারণের সাময়িক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
বাকি রইল ফাঁসি। প্রথমেই বলি, শাস্তির চেয়ে বড় বিষয় হল ধর্ষণ বন্ধ করা, মেয়েদের সুরক্ষিত করা। ধর্ষক শাস্তি পেলে, যে মেয়েটি যোনির মধ্যে লোহার রড নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে প্রাণ দিল, তার কষ্টটা মুছে যাবে? যে শিশুটি দিনের পর দিন গোটা কয়েক আধ-দামড়া লোকের অত্যাচার সহ্য করতে করতে মরে বাঁচল, তার যন্ত্রণা লাঘব হয়ে যাবে? রেপ করার পর যে মেয়েকে জ্যান্ত পোড়ানো হল, সেই মেয়েটির জ্বালা কিছু কমবে? না, এই মেয়েগুলো ফেরত চলে আসবে? যাদের কোল খালি হবার তা তো হয়েছে। শাস্তি এখানে একটা প্রতিশোধ। একটা চোখের বদলে আরেকটা চোখ। তাছাড়া, হয়তো আর কিছুই না।


ধর্ষণ, দুর্বলের ওপরে সবলের অত্যাচারের একটা মাধ্যম। যেখানে নারী অধিক পরাক্রমশালী, সেখানে পুরুষও ধর্ষিত হতে পারে। আমাদের দেশে মেয়েরা আজও দ্বিতীয় লিঙ্গ, শুধু তাই নয়, তারা পুরুষের অধীনস্থ গবাদীপশুর সমতুল্য। তাই পুরুষ অন্যায় করলে অনেক সময় শোনা যায় তার পরিবারের কোনো স্ত্রীলোককে ধর্ষণ করা হয়েছে। আর শিশুরা তো সব সময় সফট টার্গেট। তাই এই চেতনার অভাব শাস্তি দিয়ে পূরণ করা যাবে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
সেদিন একটা ভিডিও দেখছিলাম। এক সাংবাদিক পঞ্জাব-হরিয়ানার গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, ধর্ষণ কেন হয়। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা, এই ধরুন সিক্স-সেভেনে পড়ে, তারা বলছে- “মেয়েরা ছেলেদের দেখে হাসলে, পিছন ফিরে ছেলেদের দিকে তাকালে, জিন্স পরলে, অকারণে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে ছেলেরা বেসামাল হয়ে পড়ে। তাই জন্য রেপ হয়।” এদের এসব শেখাচ্ছে কে? একটি মেয়ে, ওই সিক্স-সেভেন হবে, সে তো বলেই বসল- “টিচার বলেছে ছেলেবন্ধু করলে রেপ হয়। ছেলেরা প্রথমে বন্ধু হয়ে আসে। পরে বন্ধুত্বের ফায়দা ওঠায়।” শিশুরা যখন এইসব বলছে তখন এই অঞ্চলের প্রাপ্ত বয়স্করা কী বলছে শোনা যাক। তাদের বক্তব্য- “এক হাতে তো আর তালি বাজে না। মেয়েটারও দোষ থাকে।” এলাকার তরুণ, মধ্য বয়স্ক, প্রৌঢ়, এমনকী মহিলাদেরও একই মত। একজন তো আরও এক কাঠি ওপরে গিয়ে বলল- “আগে খাপ পঞ্চায়েত ছিল। ভালো ছিল। ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ছেলে-মেয়ে উভয়কেই শাস্তি দিত। এখন পুলিস যা করছে ভালো করছে না। ছেলেগুলোকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে আর মেয়েগুলো ঘরে ফিরে আসছে।”
এটাই আমাদের ভারতবর্ষ। এ-দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেকটি গ্রামে-গ্রামে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করুন, এরকমই উত্তর পাবেন। আমরা যারা মোমবাতি-মিছিল করি, সোশাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় তুলি- তারা আর কত জন? গোটা দেশের জনসংখ্যার ১০%-ও নই হয়তো। তাও এই আমরাই, পাশের বাড়ির মেয়েটা ধর্ষিত হলে বলব- “বাবা! ও রেপড হবে না তো কে হবে? যা চরিত্র। মাসে মাসে বয়ফ্রেন্ড পাল্টাত।” বা বলব- “যা সব উগ্র পোশাক পড়ত। রেপড তো হতই।” অথবা বলব- “রেগুলার রাত করে বাড়ি ফিরত। রেপড তো হবেই।”
আজকের দিনেও, একটা মেয়ে তার নিজের সম্মান, তার পরিবারের সম্মান, তার ধর্মের সম্মান, হয়তো তার দেশের সম্মানও দু-পায়ের ফাঁকে নিয়ে ঘোরে। আমাদের দেশে মেয়েরা এখনও একটা মাংসের দলা বলেই বিবেচিত হয়। তাই মেয়েদের আবার “হ্যাঁ”, “না” কীসের? ধর্ষণটা যে অপরাধ এই বোধটা কি সমাজের আছে?
ধর্ষণের অপরাধে যারা জেলে বন্দি আছে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলে দেখুন, তাদের মধ্যে অনুশোচনার লেশমাত্র পাবেন না। যাওবা, দু-একটা ধর্ষক নিজের কৃতকর্মের জন্য একটু-আধটু অনুতাপ প্রকাশ করবে তারা এটাই হয়তো বলবে— “মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেল”, “মেয়েটার আর বিয়ে হবে না”। মানে ওই, একটি মেয়ে আপাদমস্তক একটা যোনি ছাড়া কিছুই নয়। তার মন নেই, মস্তিষ্ক নেই, তার ব্যথা-যন্ত্রণার কোনো দাম নেই, তার মানবাধিকার বলে কিছু থাকতে পারে না। ওহ হ্যাঁ, মানুষ বলে মান্যতা পেলে তবেই তো মানবাধিকারের প্রসঙ্গ আসে।
এরপরেও বলব, ধর্ষকদের ফাঁসি হোক। ছ’মাসের মধ্যে বিচার-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করে পরপর পরপর বেশ কিছু ধর্ষককে ফাঁসিতে ঝোলানো হোক। কারণ, মানুষের বিচারবুদ্ধির পরিবর্তন আনা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ততদিনে, আরও কত যে নিষ্পাপ নারীকে ধর্ষণের যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে, কত নীরিহ প্রাণ চলে যাবে, কত শিশু অত্যাচারিত হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে? তাই পরীক্ষামূলকভাবেই কিছু ধর্ষকের প্রাণদণ্ড অবিলম্বে কার্যকরী হোক। এই অব্যবস্থার দেশে কত তো মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, পথ-দুর্ঘটণায় প্রাণ হারাচ্ছে, কত কৃষক আত্মহত্যা করছে, বর্ডারে সেনা মরছে; সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু ধর্ষককে ফাঁসি দিলে দেশের এমন কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে না। বেশ কিছু ধর্ষককে ফাঁসি দিয়ে মানুষের মনে একটা ত্রাসের সঞ্চার ঘটানো যায় কিনা দেখাই যাক না।


শুধু, ধর্ষক নয় যারা ভিক্টিম ব্লেমিং করে, ধর্ষকদের প্রশ্রয় দিয়ে কথাবার্তা বলে তাদেরও শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। যারা ইভ-টিজিং করে, বাসে-ট্রেনে মহিলাদের যৌন-হেনস্থা করে, অনুমতি না নিয়ে ইনবক্সে আপত্তিকর কথাবার্তা বলে বা আপত্তিকর ছবি/ ভিডিও পাঠায়— জানবেন, এরাও পোটেনশিয়াল ধর্ষক, শুধু সুযোগের অপেক্ষা করছে। এদেরও ছেড়ে দিলে চলবে না, এদের ক্ষেত্রেও যথাযোগ্য শাস্তি অবশ্যই কাম্য। হায়দ্রাবাদের পশুচিকিৎসকের ক্ষেত্রে পুলিস একটু তৎপর হলে মেয়েটিকে হয়তো প্রাণে বাঁচানো যেত। মেয়েটির পরিবার পুলিসে খবর দিলেও তাদের টালবাহানা এক প্রকার দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। এরাই বা শাস্তির আওতা থেকে বাদ যাবে কেন? ১০০ নম্বরে ডায়াল করলে নাকি পশুচিকিৎসক প্রাণে বেঁচে যেতেন? ভয় কাকে বলে জানেন? ভয়? রাত-দুপুরে স্কুটি খারাপ হয়ে গেছে, চারটে অচেনা লোক ঘিরে ধরেছে— এমন অবস্থায় পড়লে যে কোনো মহিলা বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলবেন, এটাই স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ১০০ নম্বরে ফোন করে ভিক্টিম পুলিসি সহায়তা পাবেন এমনটাই আশা রাখছি।
শেষ লাইনে এসে আবার বলছি, আমি প্রাণদণ্ডের বিরোধী। কিন্তু, একটা তৃতীয়বিশ্বের দেশে, বিপুল জনসংখ্যার ভারে যার প্রাণ ওষ্ঠাগত, সেখানে প্রাণদণ্ড না দিয়ে ধর্ষকদের জেলে পুষে রাখাটা বিলাসিতা নয় কি? তাই বেশ কয়েকজনকে ফাঁসি দিয়ে দেখা যাক না, অবস্থার উন্নতি হয় কিনা।

Spread the love

Check Also

ভর্তুকিতে পেঁয়াজ বিক্রি, বাংলা মডেল সংসদে তুলবেন তৃণমূল সাংসদরা

সূর্য সরকার। সরকারি ভর্তুকিতে পেঁয়াজ। সেটাই হোক ‘বাংলা মডেল’। সোমবার সংসদে এমনই দাবি তুলবেন তৃণমূল …

দাসপুরে কাটমানি নিয়ে তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষ, আহত ২

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ ফের কাটমানি ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ দাসপুরে। রবিবার পশ্চিম মেদিনীপুরের …

দিল্লিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত বেড়ে ৪৪, আহত ১৫

নিজস্ব প্রতিবেদন:   ২২ বছর পর ফের এত বড় অগ্নিকাণ্ডের মুখোমুখি হল রাজধানী দিল্লি। ভোর …

One comment

  1. Kakali Mukherjee

    Akdom jugopojogi lekha. Khubi valo laglo. Kichu dharsok manusher fanshi hole jodi aktu rape case kome, meyegulo prane banche to dekhte dosh ki?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *