Breaking News
Home / TRENDING / তুমি কেমন করে গান লেখ হে গুণী ?

তুমি কেমন করে গান লেখ হে গুণী ?

পার্থসারথি পাণ্ডা :

আদালতটা যেন হয়ে উঠেছিল রজনীকান্ত সেনদের পারিবারিক কর্মস্থল। কারণ, জ্যাঠা, বাবা, জ্যাঠতুতো দাদারা এবং তিনি নিজে হয় মুনসেফ, নয় সাব জজ কিম্বা উকিল হিসেবে সারাটাজীবন কাজ করে গেছেন। পরিবারটি ছিল রাজশাহীতে। এঁরা শাক্ত। এবং পরিবারের সকলেই সংস্কৃতিমনস্ক; বিশেষ করে সঙ্গীতের প্রতি ছিল সকলের দুর্বলতা। বাড়িতে পুজোআচ্চা-উৎসব-অনুষ্ঠানে কীর্তন ও ভক্তিমূলক গানের আসর বসত। কান্তকবির বাবা গুরুপ্রসাদ সেন কোনদিন প্রথাগতভাবে গান শেখেননি, কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি আজন্ম ভালোবাসার জন্যই তৈরি হয়েছিল কান, গড়ে উঠেছিল প্রবল সঙ্গীতবোধ। সেইসঙ্গে গলায় দারুন সুরও ছিল। তাই তিনি অসাধারণ গাইতে পারতেন। ভক্তিসঙ্গীত গাইবার সময় তাঁর চোখ দিয়ে ভাবাবেশে দরদর করে গড়িয়ে পড়ত জলের ধারা। কীর্তন ও চণ্ডীর গান শুনে তিনি ভাবে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে কখনও নাচতেন, কখনও কোলাকুলি করতেন। তিনি নিজে গান রচনা করতেন। বাংলা ১২৮৩ সালের বৈশাখ মাসে তাঁর গানের বই ‘পদচিন্তামণিমালা’ প্রকাশিত হয়। এমন বাপের ব্যাটা রজনীকান্ত সেন। তিনি যে ভক্তিমূলক গানের ধারায় ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে’, ‘আমি অকৃতী অধম’, ‘আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে’-র মতো কালোত্তীর্ণ গান রচনা করবেন তাতে আর আশ্চর্য কী।

রজনীকান্তও প্রথাগতভাবে ওস্তাদ-গুরুর কাছে গান শেখেননি। গান ছিল তাঁর রক্তে। ছোটবেলা থেকেই বাঁশি বাজিয়ে সুর তুলতে পারতেন। তবে সঙ্গীতপথে তিনি পেয়েছিলেন এক বন্ধুকে, সেই বন্ধুই তাঁকে সুরের জগতে অনেক কদম এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। গুরুমুখী এ বিদ্যায় গুরুর নাম যদি করতেই হয়, তাহলে বলতে হয় সেই বন্ধুটিরই নাম। তাঁর নাম তারকেশ্বর চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন রজনীকান্তর চেয়ে চার বছরের বড়, তবুও বন্ধু—বন্ধু এবং গুরু। যে সময়ের কথা বলছি তখন রজনীকান্তের বয়স চোদ্দ আর তারকেশ্বরের আঠারো। তারকেশ্বরের একটি অসাধারণ গুণ ছিল, তিনি কবিওয়ালা ও পাঁচালিকারদের মতো একইসঙ্গে গান রচনা করে সুর দিয়ে টানা ঘণ্টা তিনেক গাইতে পারতেন। এই গুণের জন্যই রজনীকান্ত তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর অনুকরণে তাৎক্ষণিকভাবে কোন বিষয় নিয়ে একইসঙ্গে গীতরচনা করতে করতে সুরে গাওয়ার অভ্যেস করতেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রবলভাবে উৎসাহ পেয়েছেন তারকেশ্বরের কাছ থেকে। তারকেশ্বর তখন গুরু ধরে সঙ্গীত শিখছেন। যা শিখছেন সব তাল, ফাঁকতাল, মাত্রা, লয়, রাগরাগিণী সব শিখিয়ে দিচ্ছেন এসে রজনীকান্তকে। এভাবে অবিরত অভ্যাসে অল্পদিনেই রজনীকান্ত ছাড়িয়ে গেলেন বন্ধুকে। তবে, তারকেশ্বরের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনার যে শিক্ষা রজনীকান্ত পেয়েছিলেন, তা পরবর্তীকালে তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

এর বেশ কিছুকাল পরের কথা। উকিল হিসেবে তখন তাঁর প্রসার বেড়েছে, সাময়িক পত্রিকায় তাঁর কবিতা ও গান প্রকাশিত হচ্ছে; সেসময়ই এলো স্বদেশী আন্দোলনের বান। বিদেশী বস্ত্র ও দ্রব্য বয়কটের ডাক। এরইমধ্যে একদিন তিনি কলকাতায় বন্ধু অক্ষয় সরকারের মেসে এসে উঠেছেন সঙ্গে সঙ্গে মেসের ছেলেরা তাঁকে ঘিরে ধরল স্বদেশী আন্দোলনের একটা গান লিখে দিতে হবে। গানের কথায় তাঁর শরীরে বেশ উত্তেজনা খেলে যেত, চোখ হয়ে উঠত উজ্জ্বল। তখন বেলা এগারোটা। টেনে নিলেন কাগজকলম। একটা নাগাদ গানের অন্তরা তৈরি হয়ে গেলো—‘ মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই…’। সেই অন্তরাখানা নিয়েই চললেন পরম সুহৃদ সাহিত্যিক জলধর সেনের কাছে। তিনি তখন বসুমতী অফিসে বসে। তিনি গানের অন্তরা দেখে তো আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন, গান তো না, যেন হীরের টুকরো! তিনি বললেন, এ গান এক্ষুনি ছাপব, গানের বাকি অংশটুকু কই? রজনীকান্ত লাজুক হেসে বললেন, প্রেসে এই অংশটা কম্পোজ করতে করতে বাকি অংশটা লিখে ফেলব। আর লিখলেনও তাই। এক তাড়া কাগজে ছাপা হয়ে সে কবিতা পৌঁছে গেল ছেলেদের ও লোক সাধারণের হাতে হাতে। সেদিন বিকেল থেকেই স্বদেশী মিছিলে, পথে ঘাটে নৌকায় হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে শোনা যেতে লাগল—‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই…’। এই গান কান্তকবিকে অসম্ভব জনপ্রিয় করে তুলল, দিকে দিকে সম্মানীত হলেন তিনি। একটি চিঠিতে কবি এদিনের কথা লিখেছিলেন—‘ আমার মনে পড়ে, যেদিন ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’ গান লিখে দিলাম, আর এই কলিকাতার ছেলেরা আমাকে আগে করে প্রসেসন বের করে এই গান গাইতে গাইতে গেল, সেদিনের কথা মনে পড়ে আজও আমার চক্ষে জল আসে।

উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি যে শুধু ভক্তিমূলক গান বা স্বদেশী আন্দোলনের আবহে স্বদেশী গান লিখেছেন তাই কিন্তু নয়। দ্বিজেন্দ্রলালের ধারায়, তাঁর অনুসরণে হাসির গানও তিনি প্রচুর লিখেছিলেন। তবে সেসব কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে একাল অব্দি আর পৌঁছয়নি।

ব্যক্তিগত শোক থেকেও তো কবির কবিতা আসে, গীতরচয়িতার গান আসে। সে শোক কখনও কখনও দেখা গেছে, নিদারুণ অপত্যশোক। কবি গানের মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করে অশ্রুভারাক্রান্ত হৃদয়ে সান্ত্বনা খুঁজেছেন, সান্ত্বনা পেতে চেয়েছেন। এভাবেই পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে নজরুল লিখেছিলেন ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর’ গানটি, প্রিয় পুত্র শমীর মৃত্যুর পর ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন আর পুত্র ভূপেন্দ্রনাথের মৃত্যুতে কান্তকবি লিখলেন ‘তোমারি দেওয়া প্রানে, তোমারি দেওয়া দুখ’ গানটি।

গীত রচয়িতার প্রানে গান তো কত ভাবেই আসে। আর সেই সব গানেরই প্রেক্ষাপটে এক একটি গল্প থাকে, বুকের অনেক ক্ষরণ থাকে। কাল কখনও তা মনে রাখে, কখনও রাখে না…

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *