দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:
আজকাল আগের মত খাওয়াদাওয়া করি না। ব্যোমকেশ খাদ্যাভ্যাস একই রাখলেও আমি বদলেছি। সকালে জলখাবারে মুড়ি খাই। দুপুরে অল্প ভাত, নিরামিষ তরকারি। রাতে দুটো রুটি, অল্প সবজি। ব্যোমকেশ আমাকে গরুছাগল জ্ঞান করছে আজকাল। সত্যবতীও অভিমানী। তার হাতের লুচি আমি এখন ছুঁই না। এইরকমই চলছে টানা দু’টি বছর ধরে।
গতকাল, গতকাল মানে সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯, দিনটা অন্যরকম হয়ে গেল। ফেসবুক থেকে জানলাম আজ প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন। মনে কেমন একটা সেলিব্রেসনের ভাব এল। মুড়ির বদলে রুটি খেলাম। কুমড়ো ছেঁচকি দিয়ে। তারপর গরম গরম ডালের বড়া নিয়ে এল সত্যবতী। সাঁটিয়ে দিলাম ছ’টা। সত্যবতী অবাক হল, তবে কিছু বলল না। ব্যোমকেশ একবার আড় চোখে আমার বড় হাঁ মুখটা দেখে নিল। আমি তখন বড়া মুখে পুরতে বড় করেছি হাঁ। এক ঝলক দেখেই ব্যোমকেশ আবার চোখ রাখল মোবাইলে। বলে রাখা ভালো, ব্যোমকেশ এখন আর খবরের কাগজ পড়ে না। সব খবর ডিজিটালি পড়ে। দেশ বিদেশের কত যে নিউজ পোর্টাল ব্যোমকেশ পড়ে তার ঠিক নেই।
আমি ছ’নম্বর ডাল বড়াটি শেষ করার পর চেঁচিয়ে বললাম চা। রান্নাঘর থেকে সত্যবতী জানিয়ে দিল, ‘চাপিয়ে দিয়েছি’। ঠিক তখনই মোবাইলটা সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে ব্যোমকেশ বলল, ফেলু বোধহয় ঠিক বলছে না। প্রসঙ্গটা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। চ্যানেল হিন্দুস্তানে খবরটা আমি আগেই পড়েছি। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর প্রদোষ মিত্র গোয়েন্দা প্রধান রজীব কুমারের অন্তর্ধান রহস্যে মুখ খুলেছেন। প্রদোষবাবুর মতে, গোয়েন্দা প্রধান বেঁচে আছেন কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন। ব্যোমকেশকে বললাম, প্রদোষবাবু তো বলছেন রাজীব কুমার নিহত! তুমি…, কথা শেষ করার আগেই আমাকে থামিয়ে ব্যোমকেশ বলল, খবর পড়তে শেখো অজিত। এখানে অফিসিয়ালি ফেলু কিছুই বলেনি। যা বলেছে তোপসেকে, মানে যাঁকে বলে ঘনিষ্ঠ মহল। আমি বললাম, তুমি কি বলছ? প্রশ্নটা করার সঙ্গে সঙ্গে চা নিয়ে প্রবেশ করল সত্যবতী। টেবিলে ট্রে রাখতে রাখতে বলল, তোমরা আমায় একটা কথা বলো, রাজীব কুমারের সেফ সেলটার এখন কোনটা? তৃণমূলের আশ্রয় না বিজেপির?
চায়ে চুমুক দিয়ে ব্যোমকেশ একটা তৃপ্তিসূচক ‘আ’ উচ্চারণ করল এবং চোখ দুটো বুজে নিল। চোখ বন্ধ করার অর্থ ও এখন এই নিয়ে কিছুই বলবে না। চোখ বন্ধ অবস্থায় অস্ফুটে শুধু বলল, শুধু মোদী নয়, আজ বিনয়েরও জন্মদিন। সেটা যেন মনে থাকে। আমি জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, কে বিনয়? তার আগেই ব্যোমকেশ বলল, মজুমদার, বিনয় মজুমদার। ‘ভালবাসা দিতে পারি তোমরা কি গ্রহনে সক্ষম…’।
গতকাল সারাদিন আর রাজীব কুমার নিয়ে কথা হয়নি। ব্যোমকেশ কবিতা মুগ্ধ… বলা ভালো বিনয় মুগ্ধ হয়ে কাটিয়েছে দিনটা।
বলল বাংলার এই গণিতবিদ মহাকবির জন্মদিনটা আমি রাজীব কুমারের কথা ভেবে কাটাতে পারব না।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর কবির জন্মদিন পালন হল আইসক্রিম খেয়ে।
যাই হোক, আজ সকালে উঠেই আমার মনে একটা খাই খাই ভাব জাগল। আজ বিশ্বকর্মা পুজো। গায়ে পাঞ্জাবিটা গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য কচুরির দোকান। ছোলার ডাল দিয়ে চারটে আর আলুর তরকারি দিয়ে চারটে দ্রুত সাঁটিয়ে ব্যোমকেশ আর সত্যবতীর জন্য ঠোঙায় ভরে দিতে বললাম। ওজন করে পাঁচশ জিলিপি নিলাম। হাতে গরম। এই দোকানটিতে বড় ভাল জিলিপি হয়। সোনারঙা জিলিপি, স্বাদেও সুমধুর। দু’হাতে দুটো ঠোঙা নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি ব্যোমকেশের মুখ গম্ভীর। সত্যবতী কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত তার সামনে বসে আছে। কারও মুখে কোনও কথা নেই। কচুরির গন্ধে ব্যোমকেশের দৃষ্টি আমার হাতে ধরা ঠোঙার দিকে গেল। বাংলার কচুরির সম্ভবত এটাই মাহাত্ম্য। ঘরের গুমোট পরিবেশটা হঠাৎ বদলে গেল। সত্যবতী দৌড়ে এসে ঠোঙা দুটো আমার হাত থেকে নিল। ব্যোমকেশের মুখে এক গাল হাসি। আমি জিগেস করতে যাব যে, কিছু হয়েছে না কি? তার আগেই ব্যোমকেশ বলল, তুমি বেরিয়ে যাবার আগেই একটা ফোন এসেছিল। মালদ্বীপ থেকে। যিনি ফোন করেছিলেন, তিনি আমার পুরনো পরিচিত। অনেক ওপরের দিকে তাঁর যোগাযোগ। আমায় একটা অন্য কথা শোনালেন, একদম অন্য কথা।
ততক্ষণে থালা বাটিতে কচুরি-তরকারি-জিলিপি সাজিয়ে ঘরে ঢুকল সত্যবতী। ব্যোমকেশ বলে চলল, ভদ্রলোকের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর সঙ্গে বিমানবন্দরে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর দেখা হয়ে যাওয়াটা নাকি মোটেই কাকতালীয় নয়। বরং প্রিপ্ল্যান্ড। বললাম, বল কি? শেষে এই রাজনীতির পাঁকে যশোদাবেনকেও নামানো হল? ব্যোমকেশ বলল, আমার এখনই এমনটা মনে হচ্ছে না। আমি খবর নিয়েছি। আসানসোলে যশোদাবেন আগেও এসেছেন। ওখানে ওঁদের আত্মীয় থাকেন। তাছাড়া ওঁর সঙ্গে দেখা করে বা সৌজন্য করে কোনও রকম রাজনৈতিক লাভ হবে বলেও মনে হয় না। আমার ইনটিউসন বলছে ওসব কিছু নয়। তবে রাজীবের হদিশ পাওয়াটা জরুরি।
দ্বিতীয় কচুরি শেষ করে ব্যোমকেশ বাঁ হাতে মোবাইলটা ধরল। ফেসবুক খুলল। একটি পোস্টের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে বলল, শোনো এই লেখাটা। লাইনটা খুব চেনা লাগছে আমার। লাইনটা পড়ে শোনাল ব্যোমকেশ—ছল করে জল আনতে আমি যমুনাতে যাই।
আমি বললাম, কবিতা? সত্যবতী সঙ্গে সঙ্গে বলল, না। গানের লাইন।
ব্যোমকেশ বলল, কোন গান? কার গাওয়া?
আমার কাছে কোনও ক্লু নেই। সত্যবতী অনেকবার লাইনটা আওড়াল। তারপর লাইনে একটা সুর লাগল। কালোয়াতি সুর। সত্যবতী চেঁচিয়ে বলল, হারমোনিয়াম, ছায়া দেবী। আমি বললাম, হারমোনিয়াম? ওঃ সিনেমা! ব্যোমকেশ বলল, আহা বড় ভাল গান। যমুনাতে যাই আমি যাই যমুনায়। তারপরেই আমার দিকে ঘুরে বলল, বুঝলে অজিত তোমার প্রদোষ মিত্র যদি ভেবে থাকে রাজীব কুমার আর বেঁচে নেই তাহলে সে ভুল করছে। রাজীব বেঁচে আছে। রাজীব বেঁচে না থাকলে যমুনাতে জল আনতে যাবার দরকার কি?
সত্যবতী বলল, এটার সঙ্গে রাজীবের কি সম্পর্ক হল?
ব্যোমকেশ বলল, আছে সত্যবতী আছে। জানো তো রাজীব অনেকটা আমার মতো! ও ছদ্মবেশে ঘোরে। মনে রেখো ও যদি কোনও অন্যায় করেও থাকে তাহলে একেবারে বোকার মতো করেনি, যে তাকে দিয়ে যারা অন্যায় করাল, যখন ইচ্ছে হবে তারা তাকে ছুঁড়ে ফেলবে। ওকে বোকা ভাবার কোনও কারণ নেই।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, তুমি হয়তো ঠিকই বলছ, কিন্তু বীরভোগ্যা বসুন্ধরা এখন ক্ষমতাবানদের ভোগ্যা হয়েছেন। ঠিক তখনই ব্যোমকেশের মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রীনে ভেসে উঠল বাংলায় লেখা একটি নাম, ফেলু।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news