কিশোর ঘোষঃ

কবির মৃত্যুদিন আসলে কবির জন্মদিন। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তো বটেই। যে কবি একশ বছর পরেও তাঁর কবিতা চর্চা হচ্ছে মানসচক্ষে দেখতে পান। বলে যান—আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর ক্ষেত্রে মৃত্যুদিন বা ২২ শ্রাবণ জন্মদিনই বটে। কিন্তু এখন যুগ বদলাচ্ছে। আজকের কবি-প্রজন্ম মরে যাওয়ার পরে ‘বেঁচে’ থাকার কথা ভাবার সাহস পায় কি! বরং বেঁচে থেকে ‘মরে’ যাওয়ার ভয় পায়। তাই সারাক্ষণ লাইমলাইটে থাকার চেষ্টা। তাই সংবাদপত্রে, বাণিজ্যিক পত্রিকায়, লিটল ম্যাগাজিনে যত বেশি বেশি তাঁর নাম দেখা যায় তত ভালো থাকে সে। যত সে টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশনে, ইউটিউব চ্যানেলে ডাক পায় তত তাঁর নাকে কবি হয়ে বেঁচে থাকার ফুরফুরে গন্ধ আসে। ডাক পাওয়া সেই সব রাতে ঘুমের ওষুধ ছাড়াই ঘুমোতে পারে সে। এরপর আছে ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্কডিন, বল্গ ইত্যাদি। যেখানে ক্রমাগত নিজের কাব্যচর্চার আপডেট দিতে হয়। যেখানে আজকের কবিরা বন্ধু ও পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করেন নিজেদের কাব্যদর্শন তথা কাব্যচর্চার ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। কে কোন সভাঘরে, কবিতা উৎসবে আগামী শনি ও রবি কবিতা পড়ছেন বা কাব্য আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন তাও জানান তাঁরা। এমনকী কোন বড় কবি তাকে ভালো বলেছেন, কোন পত্রিকায় তাঁকে প্রশংসা করা হয়েছে। কিংবা তাঁর বই নিয়ে আলোচনা হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও ব্যক্তি কবি ছবি দেন নদীর ধারে প্রেমিকার সঙ্গে প্রেম করছেন। আলগোছে কাব্যময় চুমু খাচ্ছেন। হয়তো বা জঙ্গলে একান্তে ঘুরছেন সাউন্ড অব সাইলেন্সের অদৃশ্য হাত ধরে।
অর্থাৎ কিনা কবির ব্যক্তি জীবনের পরমানু মুহূর্তকেও প্রচার করেন আজকের প্রজন্ম। কিছুদিন আগে নয়ের দশকের এক পরিচিত কবি (যিনি নিজেও ফেসবুকে আছেন। তবে আত্মপ্রচার থেকে বিরত।) সোশ্যাল মিডিয়াতেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এরা এত অনুষ্ঠানে যায়, সেই অনুষ্ঠান যাওয়া নিয়ে এত এত লেখে, ছবি দেয়। কবিতা লেখার সময় পায় কখন?
সেদিন এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল আমারও। তবে আমার মনে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। আমার মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া থাকলে রবীন্দ্রনাথ ‘রবীন্দ্রনাথ’ হতেন না। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘন্টায় ঘন্টায় উপস্থিত থাকাটা এখন সত্যি খুব জরুরি। নিজের কবি সত্বার প্রমাণ দেওয়াটা দরকারি কাজের মধ্যেই পড়ে। অতএব অত কবিতা, অত গান, অত গল্প, উপন্যাস, নাটক, চিঠি, ডায়েরি লিখতেন কী করে রবীন্দ্রনাথ আজকের আধুনিক কবি প্রজন্মের প্রতিনিধি হলে? যেহেতু ২২ শ্রাবণে এসব কথা উঠছে সেক্ষেত্রে আজ কেবল তাঁর জীবনের শেষ দশটা বছরের সৃষ্টিকর্মের দিকে তাকালেই যথেষ্ট অবাক হওয়া যাবে। ভাবুন—১৯৩২ থেকে ১৯৪১, যখন ক্রমশ ভাঙছে শরীর, ওই এক দশকে রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। যেমন পূনশ্চ (১৯৩২), শেষ সপ্তক (১৯৩৫), শ্যামলী ও পত্রপুট (১৯৩৬)। সবচেয়ে বড় কথা
জীবনের এই পর্বে সাহিত্যের নানা শাখায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন কবি। তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্যতম ফসল গদ্য কবিতা। এবং নৃত্যনাট্য—চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬), শ্যামা (১৯৩৯) ও চণ্ডালিকা (১৯৩৯)। শেষ তিন উপন্যাস দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪) ও চার অধ্যায়ের (১৯৩৪) কথাও মনে পড়বে। এরপর আঁকলেন ছবি। প্যারিসে প্রদর্শনীর পর পিকাসো সহ তৎকালীন বিশ্বের সেরা চিত্রকররা প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন। পাশাপাশি উপনিষদের কবি জীবনের শেষের বছরগুলোতে বিজ্ঞান বিষয়ে অসম্ভব আগ্রহী হয়ে উঠলেন। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হল প্রবন্ধ সংকলন বিশ্বপরিচয়। উল্লেখ্য, সে (১৯৩৭), তিন সঙ্গী (১৯৪০) ও গল্পসল্প (১৯৪১) গল্পসংকলন তিনটিতে তাঁর বিজ্ঞানী চরিত্র-কেন্দ্রিক একাধিক গল্প।
অথচ জীবনের শেষ চার বছর ছিল রবীন্দ্রনাথের ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময়। এই সময়ের মধ্যে দু’বার খুব বেশিরকম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে প্রথমবার অচৈতন্য হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল। সেবার সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ হওয়ার পর আর সেরে উঠতে পারেননি। অবশেষে ১৯৪১ এর ৭ আগস্ট সেই ঐতিহাসিক প্রয়াণ। বাংলা তারিখ ২২ শ্রাবণ।
কিন্তু সেটা বড় কথা না। আসল কথা হল যখন তিনি অসুস্থ, যখন মৃত্যুপথযাত্রী। তখনও অনন্ত জীবনের অন্তিম শক্তি খরচ করেছিলেন সৃষ্টির তাগিদে। কিন্তু আমরা এই প্রজন্মের কবি।
আমাদের জীবন দর্শন আলাদা। আমরা উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, দেবদাস আচার্য, আলোক সরকার, স্বদেশ সেন, মণীন্দ্র গুপ্তের মতো সাধকদের কথা শুনতে রাজি নই। আমরা রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত হতে গেলে যে অধ্যাবসায় লাগে তাও খরচ করতে চাই না কোনও মতে। আমরা একজন জয় গোস্বামীর, সুবোধ সরকারের হয়ে ওঠার খবর না রেখেই ভালো আছি। তাই কবিতায় নয়, কবিতার প্রচারে বেঁচে থাকতে চাই জীবদ্দশায়।
যতোই রবীন্দ্রনাথ মরে প্রমাণ করুন কবির মৃত্যুদিনই আসলে জন্মদিন।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news