ঋত্বিক মুখোপাধ্যায়: 
সিনিয়র অ্যাসিসটেন্ট এডিটর, ফিনান্সিয়াল ক্রনিকল্
গত বুধবার পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম মাত্র ১ পয়সা করে কমানোকে কেন্দ্র করে বিস্তর বিতর্ক-বিবাদ এবং লোক হাসাহাসির পর শুক্রবার রাষ্ট্রায়ত্ব তেল সংস্থা—ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন ডিজেলের দাম ৫পয়সা লিটার পিছু এবং পেট্রোলের দাম ৬ পয়সা লিটার পিছু করে বসিয়েছে। কিন্তু তাতেও স্বস্তি বা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে না। কারণ দেশের নানান শহরে পেট্রোলের দাম এখনও গড়ে লিটার পিছু ৮০ টাকার কাছকাছি আর ডিজেলের দাম এখনও গড়ে লিটার পিছু ৭০—৭৩ টাকার কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। মনে রাখতে হবে ২৪ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত সম্ভবত কর্ণাটক নির্বাচনকে মাথায় রেখে পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া গেলেও ১৪ মে-র পর লাগাতার প্রত্যেকদিনই পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়ে চলেছিল। রাষ্ট্রায়ত্ব তেল সংস্থাগুলি যখন শুক্রবার ৫-৬ পয়সা লিটার পিছু ডিজেল-পেট্রোলের দাম কমিয়েছে, সেই একই দিনে আবার রাষ্ট্রায়ত্ব ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন ভর্তূকি-ভুক্ত এবং ভর্তূকি-বহির্ভূত রান্নার গ্যাসের দাম সিলিন্ডার পিছু যথাক্রমে ২.৩৪ টাকা এবং ৪৮ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এইখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে ২০১০ সালের জুন মাসে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউ.পি.এ সরকার পেট্রোলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে দেয় আর ২০১৪ সালের অক্টোবার মাসে মোদী সরকার একই পথে হেটে ডিজেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে। এরপর আরও একধাপ এগিয়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে মোদী সরকার চালু করে পরিবর্তনশীল জ্বালানী মূল্য নীতি। অর্থাৎ তাত্ত্বিক ভাবে বা নীতিগত ভাবে জ্বালানী মূল্যের ব্যাপারে সরকারের খাতায়-কলমে আর কোনও ভূমিকাই নেই। বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠ-নামার ওপরেই আমাদের দেশের তেলের দামের ওঠা-নামা হওয়া উচিত।
সরকারি দাবি অনুযায়ী এই খোলা-বাজারি নীতি মেনেই সাম্প্রতিক কালে পেট্রোলের ডিজেলের দাম পরপর ১৬ বার ধারাবাহিক ভাবে বেড়ে চলেছে। এই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে আমাদের দেশের জ্বালানী চাহিদার ৮০% পূরণ করা হয় আমদানি কৃত জ্বালানী দিয়ে। এবং ভারতের আমদানি তালিকায় ক্রুড অয়েলই সবচেয়ে ব্যয়বহুল বা দামি। কাজেই একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রা বা টাকা যত দূর্বল হবে দেশের বাজারে তেলের দামের ওপর ততই চাপ বাড়বে। এবং এ বছর এখনও পর্যন্ত মার্কিন তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্য ৬%-এরও বেশি পড়ে গেছে। এই তত্ত্ব এবং তথ্যের পাশাপাশি জেনে রাখা ভালো যে ২০১৩ সালে বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেল পিছু ১১০—১১৫ ডলার এবং এখন যা ব্যারেল পিছু ৭০—৭৫ ডলারের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। ২০১৫ সালে পেট্রোপণ্যের ওপর কেন্দ্রীয় কর ছিল লিটার পিছু ৯.৪৮ টাকা, যা এখন দাঁড়িয়েছে লিটার পিছু ১৯.৪৮ টাকা। ২০১৩ সালে রাজ্যের কর ছিল লিটার পিছু ১২.৬৮ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.২৯ টাকা। অর্থাৎ রাজ্যস্তরে কর বেড়েছে লিটার পিছু ১০ টাকা।
এবার দেখে নেওয়া যাক পেট্রোলের পাম্পে যে দামে পেট্রোল বা ডিজেল বিক্রি হয় তার পিছনে কি কি কাজ করে। পেট্রোপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে এই সমস্ত ব্যয়ের ওপর—ডলারের দামের ওঠা-নামা, বিদেশ থেকে তেলের পরিবহন ব্যয়, পরিশোধন ব্যয়, পরিশোধনাগার থেকে পাম্প পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়, পরিশোধনাগারের মুনাফা, পরিবহন কালে যে পরিমাণ জ্বালানী উবে যায় তার মূল্য ইত্যাদি।
এর অনেক গুলোর ওপরই সরকারের এই মুহূর্তে কোনও হাত বা ভূমিকা নেই। কিন্তু সরকারের হাত যেখানে আছে তা হল কর কাঠামো ও করের পরিমাণ। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন পেট্রোপণ্যকে যদি জি.এস.টি-র আওতায় আনা যায়, এমনকি তা যদি জি.এস.টি-র সর্বোচ্চ স্তর ৩০%-এও থাকে তাহলেও পেট্রোল এবং ডিজেলের মূল্য একলাফে আনেকখানি কমে আসবে আর স্বস্তি মিলবে সাধারণ মানুষের। এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে পেট্রোপণ্যের মূল্যের ওপরে যদি কোনও সরকারি নিয়ন্ত্রণ না-ই থাকে, তাহলে শুধুমাত্র কর্ণাটক নির্বাচনের সময় এর দামবৃদ্ধিকে আটকে রাখা গেল কীভাবে, যদিও সেই সময়ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উর্ধ্বমুখীই ছিল।
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news