অচিন্ত্য বিশ্বাস :
৭ জুন, নাগপুরে, শিক্ষার্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের তরুন দলকে তৃতীয় বছরের অভিনন্দন জ্ঞাপন। আরএসএসের প্রচলিত রীতি, প্রতি বছর তাঁরা কোনও এক সম্মানীয় ব্যক্তিকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান । এবছর আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ডঃ প্রণব মুখোপাধ্যায় । এ নিয়ে ব্যাপক জলঘোলা হয়েছে। কেন তিনি আগাগোড়া কংগ্রেসি হওয়া সত্ত্বেও এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন? যারা এই হইচই করছেন, তাদের মনে থাকল না, রাষ্ট্রপতি পদে উপনীত হওয়ার পর কোনও ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় থাকার কথা নয়। অবসর নেওয়ার পর তাঁর পক্ষে স্বাধীনভাবে যে কোনও আমন্ত্রণ গ্রহণ করা ব্যক্তিগত অধিকারের পর্যায় পড়ে। প্রকৃতপক্ষে যারা এই সমালোচনা করেছেন তাঁরা মাননীয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে অতিরিক্ত নজরদারি করতে চেয়েছেন। এটা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত, অবান্তর ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ছাড়া কিছু নয়। অনেকেই এ কথা বলতে শুরু করেছেন, মাননীয় ডঃ মুখোপাধ্যায় যেন এই সমাবেশে অতিথির সম্ভাষণে আরএসএসকে তাদের ‘ভ্রান্ত সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ’ সম্পর্কে সমালোচকদের মনোভাবকেই সুস্পষ্ট করে দেন। বিষয়টি রাস্তার মোড়ে মোড়ে মুখরোচক আলোচনার পর্যায়ে নামিয়ে এনে কংগ্রেস, বাম এবং বিচিত্রমনা সমালোচকেরা বাজার মাথায় করেছিলেন। এতে যে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে অথবা তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হচ্ছে সেটা বোঝার মতো ধৈর্য তাদের ছিল না।
যাই হোক, ডঃ মুখোপাধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে আরএসএসের সদর দফতরে গিয়ে তাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন । শুধু তাই নয়, আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতার ভিটেয় পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী ছাড়াই গিয়েছেন এবং তাঁর সম্পর্কে লিখে এসেছেন, “হেগলেওয়াড় ছিলেন আমাদের মাতৃভূমির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান।“ শুধু এটুকুতেই সমালোচকদের মুখে বালি ঘষে দিয়ে এসেছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ।
তা সত্তেও সংবাদপত্রগুলি বিচিত্র সংবাদ পরিবেশন করে চলেছে যেন আরএসএসের চূড়ান্ত সমালোচনা করে এসেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায় । মন দিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কথা যে শুনবেন, তিনি বুঝবেন আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে ‘অর্থকুক্কুটীন্যায়’ বলতে যা বোঝায় এরা তাই করেছেন । একটি মোরগকে কেটে দু’ভাগ করলে তা জীবন্ত থাকে না। এই সহজ কথাটি তাঁরা ভুলে গিয়েছেন । হয়তো সাধারন মানুষকে বোকা ভাবছেন। বুধবার সন্ধ্যায় প্রণববাবুর অসাধারন বক্তৃতা সবাই শুনেছেন। অথচ খবরের কাগজওয়ালারা ভাবছেন তারা যা বলছেন তাই সবাই মেনে নেবেন। এ কখনওই স্বীকার করা উচিত নয়।
ডঃ প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতায় ষোড়শ মহাজনপদ থেকে শুরু করে স্বাধীন রাষ্ট্রের গড়ে ওঠা, বিকশিত হওয়া ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনগুলির সুবিস্তৃত বর্ণনা করেছেন । বলেছেন, উত্তরে রেশম পথ আর দক্ষিণে মশলা আসা যাওয়ার পথ, এর মাঝখানে ভারতের গৌরব যেন সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাতায়। মধ্য এশিয়া, চিন ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের শান্তিপূর্ণ বিজয় রথ কেমন করে ছড়িয়ে পড়ল, বলেছেন সে কথাও। এটাই তাঁর মনে হয়েছে হিন্দু সমাজের সর্বগরিষ্ঠ সাংস্কৃতিক নিদর্শন। অথচ ডঃ মুখোপাধ্যায় নাকি আরএসএসের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে সমালোচনা করেছেন! ভারতবর্ষে ভ্রমণ করতে এসেছেন এমন ৩ জন পর্যটকের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায় । ১) মেগাস্থিনিস, ২) ফা হিয়েন এবং ৩) হুয়েন সাং। অথচ তিনি আল বেরুনী বা ইবন বতুতার কথা বলেননি। অর্থাৎ, তিনি মুসলমান যুগ সম্পর্কে আরএসএসের মতেই রইলেন।
ভারতের প্রাচীন রাষ্ট্র গঠন, সমাজ সংগঠন ও উন্মুক্ত প্রশাসনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সুস্পষ্টভাবে ভারতে হিন্দু ধর্মরাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে তাঁর কোনও দ্বিধা ছিল না। এই বক্তৃতার ছত্রে ছত্রে তাঁর প্রমাণ আছে।
৬০০ বছরের মুসলমান যুগকে একটি বাক্যে সম্পূর্ণ করেছেন – বিদেশী আক্রমণকারী। এছাড়া মুসলমানদের জন্য আর কোনও বিশেষণ তিনি বরাদ্দ করেননি। বরং পলাসীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন তাঁর চোখে বেনিয়া কর্পোরেট সংস্থার সম্প্রচারকরা আর সিপাই বিদ্রোহের পর মহারানী ভিক্টোরিয়ার বিবাহে যৌতুক হিসেবে ভারত রাষ্ট্রকে তুলে দেওয়া তাঁর কাছে ইষৎ তালি মারার ব্যাপার মনে হয়েছে । তবে তিনি ব্রিটিশ শাসনকে ভারতে আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনে অন্যতম ইতিবাচক ঘটনা বলে মনে করছেন। এ থেকে বোঝা যায়, অনুক্ত ৬০০ বছরের মুসলমান যুগে হিন্দু যুগে মতো রাষ্ট্র কাঠামো নির্মান হয়নি। আর যা করেছে সে ব্যাপারে ডঃ মুখোপাধ্যায়ের ইঙ্গিতই যথেষ্ট । তিনি বিষয়টি উৎক্ষেপণ করে যুক্তিবাদী ইতিহাস ব্যাখ্যাকারদের নতুন করে ভাববার সুযোগ করে দিয়েছেন ।
স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, বাল গঙ্গাধর তিলক প্রভৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেন ব্রিটিশ শাসনে ভারত অসংখ্য সামন্ত রাজাদের অধিকারে থাকা রাজ্য সমগ্র, সব মিলিয়ে যে অখণ্ড ভারত, মণিপুর থেকে দ্বারকা, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী যে ভারত, তাকে স্বাধীন করার জন্য আমাদের সংগ্রামীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আজকে যে সমস্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি ভারত ভাঙার খেলা খেলছে, প্রণববাবুর বক্তৃতায় তাদের আড়াল সমালোচনা আছে।
একটি অসাধারন পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা বলেছেন তিনি। আমার ধারণা প্রণববাবুর এই কথাটি সংবাদপত্রের সম্পাদকদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছে । তিনি বলেছেন ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতে তিনটি পূর্বতন জাতির সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন লক্ষ্য করেছেন। এরা হল ককেশীয়, দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয়। নজর করার বিষয় বক্তৃতায় তিনি সংস্কৃত শ্লোক প্রয়োগ করলেও আর্য জাতির কথা বলেননি। ১৮-১৯ শতাব্দীতে প্রচলিত আর্য জাতিতত্ব স্বামী বিবেকানন্দ, বাল গঙ্গাধর তিলক বা আর জি মান্নানকরের মতো পণ্ডিতরা স্বীকার করেননি। ভূমধ্য সাগর অঞ্চল থেকে আসা ককেশীয় ও সুমেরীয় ( পরে দ্রাবিড় বলে পরিচিত) জাতির আক্রমণ ভারতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। আর পূর্ব দেশের থেকে এসেছে ইরাক জনগোষ্ঠী। এই অসাধারন নৃতত্ব ও সংস্কৃতির ব্যাখ্যান প্রকৃতপক্ষে ডঃ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বক্তৃতায় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকেই সমর্থন করে।
সমাজ থেকে উৎকট, ছদ্ম ধর্ম নিরপেক্ষ প্রচার যারা করেন তাদের ভাঁড় শূন্য হয়ে এসেছে। এমন কাদা ছোঁড়াছুড়ি ছাড়া তাদের কোনও উপায় নেই। কংগ্রেস মুক্ত ভারত হবে কিনা তা ভবিষ্যত বলবে। তবে কংগ্রেসের বরিষ্ঠতম রাজনৈতিক নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় বুধবার যে বক্তৃতা দিয়েছেন তা কংগ্রেসের দূর্গে একটি মহা বিস্ফোরণ ছাড়া কিছু নয়।
(লেখক গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য)
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news