Breaking News
Home / TRENDING / পৌষ-পার্বণে বানান রাঢ়ের পিঠে: ‘গড়গড়ে’

পৌষ-পার্বণে বানান রাঢ়ের পিঠে: ‘গড়গড়ে’

 পার্থসারথি পাণ্ডা:

গড়গড়ে আসলে পুরওয়ালা পুলিপিঠে গোত্রের একটি পিঠে। এতে তেলের কোন ছোঁয়াচ নেই। এই পিঠে সম্পূর্ণরূপে জলে সেদ্ধ করেই তৈরি হয়। তাই এই পিঠে একদিকে যেমন দারুণ সুস্বাদু, অন্যদিকে তেমনি সহজেই হজম হয়। আপনার যদি তেলে বা ঘিয়ে ভাজা পিঠে পছন্দ না-হয়, কিম্বা শারীরিক কারণে খাওয়া না-চলে, তাহলে আপনি অবশ্যই গড়গড়ে খান। নিশ্চিন্তে খান, তারিয়ে তারিয়ে খান।

গড়গড়ে বানাতে যা যা লাগবে:

গড়গড়ে পিঠে বানাতে লাগে-
চালের গুঁড়ো, সামান্য নুন, খোয়া ক্ষীর, চিনি আর জল।

পিঠে বানাবেন যেমন করে:

খোয়া ক্ষীর লাগে পিঠের ভেতর পুর হিসেবে ব্যবহারের জন্য। চিনিটাও সেজন্যেই। প্রথমে আসুন পুরটা তৈরি করে নিই। বাজার থেকে খোয়া কিনে আনলে তাতে তো চিনি দেওয়া থাকে না। তাই পিঠে মিষ্টি করতে খোয়ায় চিনি অবশ্যই মেশাতে হবে। এক কাপ মতো দুধ আড়াইশো গ্রাম খোয়ার সঙ্গে একটা পাত্রে মেখে মিশিয়ে নিন প্রথমে। তারপর মাঝারি আঁচে খুন্তি দিয়ে নাড়তে নাড়তে ফোটাতে থাকুন, মিশ্রণটি ঘন হয়ে গেলে কড়া অথবা হালকা যেমন মিষ্টি আপনার পছন্দ, সেই আন্দাজে তাতে চিনি মেশান। চিনি গলে গিয়ে মিশ্রণটি বেশ লালচে ঘন হয়ে গেলে বুঝবেন পিঠের জন্য পুর একেবারে রেডি। এবার পুরটা চুলো থেকে নামিয়ে ঠাণ্ডা হতে দিন।

পুর ঠাণ্ডা হতে হতে আসুন পিঠে বানাতে চালের গুঁড়োর যে মণ্ড লাগে, সেটা বানিয়ে ফেলি। ধরুন, আপনি পাঁচশো গ্রাম চালের গুঁড়োর মণ্ড বানাবেন। তাহলে, একটা কড়াইতে এক লিটার মতো জল নিয়ে তাতে এক চা-চামচ নুন দিয়ে ফুটতে দিন। এবং হাতের কাছে রুটি বেলার বেলুনি একটা রাখুন। একটু পরেই সেটা খুব কাজে দেবে।

জল ফুটতে শুরু করলে এক হাতে তাতে চালের গুঁড়ো ঢালতে থাকুন। আর অন্য হাতে বেলুনি নিয়ে সমানে কড়াইতে জলের মধ্যে নেড়ে জলের সঙ্গে চালের গুঁড়ো মেশাতে থাকুন। লক্ষ্য রাখুন চালের গুঁড়ো যেন জলের সঙ্গে স্মুদলি মেশে, কিছুতেই যেন ডেলা ডেলা না-হয়ে যায়। নাড়তে নাড়তে চালের গুঁড়ো যখন সেদ্ধ হয়ে যাবে, জল শুকিয়ে আঠা আঠা হয়ে বেলুনির গায়ে লেগে যেতে চাইবে, একতাল কাদার মতো নরম মোলায়েম হয়ে উঠবে, তখনই বুঝবেন পিঠের জন্য মণ্ড এক্কেবারে রেডি।

 

মণ্ডটা গরম থাকতে থাকতেই পিঠে বানাতে হবে। কারণ, ঠাণ্ডা হয়ে গেলে খুব শক্ত হয়ে যায়, তখন পিঠে বানাতে গেলে তা ফেটে যায়।

হাতের কাছে একটা বাটিতে ঠাণ্ডা জল রাখতে হবে। এবার গরম মণ্ড হাতে নিয়ে ছোট গোলা পাকাতে হবে, তারপর হাতে ঘোরাতে ঘোরাতেই খোল বানিয়ে ফেলতে হবে। এবার খোলের মধ্যে খোয়ার পুর রেখে তালুর মধ্যে সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে মুখ বন্ধ করে দিন। তারপর আলতো করে চেপে চেপ্টে দিন। ব্যস, হয়ে গেল গড়গড়ে। এরকম বেশ কয়েকটি পিঠে বানিয়ে নিন। হাতে মন্ডের গরম সইয়ে নিতে এবং পিঠে বানানোর সুবিধের জন্য হাত পিছল রাখতে মাঝে মাঝে দুই হাত বাটির জলে চুবিয়ে নিতে থাকুন।

 

এবার একটা কড়াইতে হাফ লিটার জল গরম হতে দিন। জলে দিন এক চিমটে নুন। জল বেশ গরম হয়ে ফুটে উঠলে এক ঝাঁক পিঠে ছেড়ে দিন। পিঠে জলে ভেসে উঠলে ঝাঁঝরি দিয়ে জল ঝরিয়ে তুলে নিন। এবার গরম গরম খান বা ঠাণ্ডা করে, পাবেন অমৃতের স্বাদ।

পুরের ভ্যারাইটি:

শুধু যে খোয়া ক্ষীরের পুর দিয়েই এ পিঠে হয়, এমন নয়। দুধ, নারকেল কোরা, চিনি বা নলেন গুড় কিম্বা আখের গুড় দিয়ে নারকেলের পুর বানাতে পারেন। পুরে নলেন গুড় দিলে স্বাদেগন্ধে পিঠে হয় অপূর্ব। মিষ্টির মাঝে স্বাদবদলের জন্য অনেকেই পছন্দ করেন ঝাল-নোনতা পুর। সেক্ষেত্রে জাই মুগ বা বরবটি সেদ্ধ করে মসলা দিয়ে চপের পুরের মতো সুস্বাদু পুর বানানো হয়। এছাড়াও বাঁকুড়াতে তিলের পুরও অনেকে তৈরি করেন। আগে অভাবী মানুষ খোয়া বা নারকেল জোগাড় করে উঠতে না-পারলে চালের গুঁড়ো দুধ ও চিনি দিয়ে ফুটিয়ে বানাতেন এক রকমের পুর। একে বলা হত ‘এটকালি পুর’। এছাড়া হত ছানার পুর। এগুলো তেমন সুস্বাদু নয়।

যাইহোক, পিঠে বানানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে ভেতরের পুর যেন খুব বেশি না হয়ে যায়, তাহলে সেদ্ধ করার সময় পিঠে ফেটে যাবে।

গড়গড়ে পিঠের ঘর-বার:

রাঢ় অঞ্চল বলতে, রাঢ়ের একটা অংশ–বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও অবিভক্ত মেদিনীপুরে এই পিঠের চল দেখেছি। আরও অন্য কোথাও চল থাকলে সেটা আমার জানা নেই। মূলত পাঁচ ছ’শো বছর আগে এই সমস্ত অঞ্চলে উড়িষ্যা থেকে যেসব ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় এইসব অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন, তাদের বলা হয়, উৎকল ব্রাহ্মণ। এই সম্প্রদায়ের মধ্যেই এই পিঠের চল প্রথম দেখা যায়। এখন অবশ্য এই অঞ্চলের সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই এই পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। এই উৎকল ব্রাহ্মণেরা উড়িষ্যা থেকে গড়গড়ের ঐতিহ্য নিয়ে এসেছিলেন, না এখানে এসে ঐতিহ্য তৈরি করেছেন, সে ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানতে পারিনি।

পিঠের নামটি ‘গড়গড়ে’ লিখলাম বটে, তবে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার মানুষ একে ডাকেন ‘গড়গড়িয়্যা’ বলে। এই ডাকের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে এই পিঠের নামকরণের ইতিহাসও। কারণ, এই অঞ্চলের মানুষ কোনকিছু ‘গড়িয়ে যাওয়া’-কে বলেন ‘গড়গড়াই গেল’।গড়গড়ের গোলপানা গড়ন হওয়ায় কড়াই থেকে নামাতে নামাতে, পাতে দিতে দিতে বড্ড গড়িয়ে যায়। তার এই স্বভাবের জন্যই হয়তো এমনধারা নাম। এটা শুধু সম্ভাবনা, নিশ্চিত কিছু না। চালের গুঁড়োর যে মণ্ড তৈরি হয়, তাকে এই অঞ্চলের মানুষ ‘খইল’ বলেন। আর মণ্ড নাড়ার জন্য আপনাদের বেলুনি ব্যবহার করতে বললাম, সেক্ষেত্রে এখানকার মানুষ ছুতোরকে দিয়ে শাল কাঠের একটি সুদৃশ্য একহাত লম্বা লাঠি বানিয়ে নেন, একে বলেন ‘খইল খাড়ি’। ‘খাড়ি’ মানে যদিও ‘কাঠি’; তবু ছোট্ট আকারের জন্য এর এরকম নাম।

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুরে পুড়হা পরব, পৌষ-পার্বণ ও শ্রীপঞ্চমীর পরদিন ষষ্ঠী পার্বণে গড়গড়ে পিঠে মাস্ট। এছাড়া কেউ মারা গেলে তাঁর বাৎসরিক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিতদের গড়গড়ে পিঠে খাওয়াতেই হবে, এ অঞ্চলের এটাই নিয়ম।

এখানে আমার সামান্য গবেষণায় যেটুকু তথ্য পেয়েছি লিখলাম। হে প্রিয় পাঠক, আপনাদের যদি এ বিষয়ে কোন তথ্য জানা থাকে, প্লিজ কমেন্ট বক্সে জানান।

Spread the love

Check Also

নিজের মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একটি ভারতীয় ভাষা সকলের শেখা উচিত : রাজনাথ

নিজস্ব প্রতিনিধি। মহাদেব শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক। দেশের প্রতিটি কোনায় তাঁর মন্দির এক এবং অখণ্ড ভারতের …

শোভনের পাল্টা ববিদাকে চাই হোডিং কলকাতায়

নিজস্ব প্রতিনিধি। শোভনের পাল্টা ববি ! শুক্রবার দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে একটি হোডিং চোখে পড়ে। যেখানে …

পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় প্রিয়াঙ্কা গাঁধী ? জল্পনা কংগ্রেসে

নিজস্ব প্রতিনিধি। পশ্চিমবঙ্গ থেকেই কী রাজ্যসভায় যাবেন প্রিয়াঙ্কা গাঁধী ? তেমনি জল্পনা উস্কে দিয়ে গেলেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *