দ্বিগবিজয় চৌধুরী
( প্রয়াত গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর পুত্র তথা চলচ্চিত্র প্রযোজক)
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটা ফোন পেলাম। ফোনের ওপার থেকে আমার এক পরিচিত বলল, “দ্বিগবিজয়দা জানেন তাপস পাল মারা গেছে ?” মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো! বললাম কি আজে বাজে বকছো ? কিন্তু আমার সেই পরিচিত বলল, “দাদা টিভি খুলে দেখুন তাপস পাল আর নেই!” তাড়াহুড়ো করে টিভি খুললাম। দেখলাম সত্যিই “তাপস আর নেই!” ছোট ভাইয়ের মতো ছিল আমার। ওকে নিয়ে কত শত বিতর্ক! কিন্তু বিশ্বাস করুন, “তাপস একেবারেই তেমন ছিল না।” যারা ওঁকে কাছ থেকে দেখেছে তারা জানে, “বাড়ির সাদাসিধে ছেলে তার মতোই একেবারে সহজ সরল ছিল।” উত্তেজিত বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভুল কথা বলে ফেলেছিল। খুব আবেগপ্রবণ ছিল তো। যা রাজনীতিকদের একেবারেই হতে নেই। তাই ভুল করে কথাগুলো বলে ফেলেছিল। কিন্তু, তাপস একেবারেই তেমন মানুষ ছিল না।

(দ্বিগবিজয় চৌধুরী ও অঞ্জন চৌধুরীর কন্যা রিনা চৌধুরীর সঙ্গে তাপস পাল)
আজ কত কথা মনে পড়ছে। ১৯৯০ সাল, তখন অঞ্জন চৌধুরীর ‘মায়া-মমতা’ ছবির শুটিংয়ের জন্য আমরা আউটডোরে মিরিক গিয়েছি। অঘোষিতভাবে ভাবে আমি ছবির এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার। অঞ্জনদা সবকিছুর দায়িত্ব আমার ওপরই ছেড়ে ছিলেন। নব্বইয়ের দশক, সেই আউটডোরে তাপসের সঙ্গে আমার আলাপ। মিশুকে স্বভাবের তাপস খুব সহজেই আমাকে আপন করে নিয়েছিল। তারপর কখনও মনে হয়নি বাংলা সিনেমার সফল একজন অভিনেতার সঙ্গে মিশছি আমি।
তারপর ‘মেজ বউ’ ছবিতে আমি সহ চিত্রনাট্যকার। নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছিল তাপস। ছবি তো সুপারহিট হয়েছিল। তাপসের নেগেটিভ চরিত্র প্রশংসিত হয়েছিল জনে জনে। তারপর ‘মহাজন’ ও ‘বাঙালিবাবু’র মত সুপারহিট ছবিতেও তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। প্রত্যক্ষ করেছিলাম সুপারস্টার তাপস পাল নয়। ভাই তাপস পালকে (Tapas Paul)। সেই সব দিনগুলো আজ খুব মনে পড়ছে।
সালটা ২০০১ হবে। শুনলাম তাপস আলিপুরে ভোটে দাঁড়াচ্ছে। দাঁড়ালো, জিতলও। এই সময় অঞ্জনদা স্ক্রিপ্ট লেখার কাজে প্রায়ই পিয়ারলেস ইন হোটেলে যেতেন। সেখানেই একদিন দেখলাম সম্পূর্ণ অচেনা তাপস পালকে। আগের চেয়ে অনেক বেশী উদ্ধত! দেখে অবাক হলাম। অভিনেতা তাপস পাল তো এমন নয়! মনে প্রশ্ন জাগল, রাজনীতিতে যোগ দিয়ে কি মানুষটা বদলে গিয়েছে? তাঁর সেই আচরণ দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলাম? সেদিনই তাঁকে বলেছিলাম, “তাপস রাজনীতি তোমার কাজ নয়। রাজনীতি থেকে সরে অভিনয়ে মন দাও।” কথাগুলো চুপ করে শুনেছিল। কোনও উত্তর করেনি। তারপর ক্রমশ রাজনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায় তাপস। বিধায়ক থেকে সাংসদ হয়। সেই সময় যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আমাদের।
এই ব্যবধানে আমিও বাংলা ছবির প্রযোজনায় চলে এসেছি। ২০১৮ সালে তাপস তখন সিবিআই হেফাজত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতায় ফিরে এসেছে। আমার ছায়াছবি ‘ছায়াসূর্য’ স্ক্রিপ্টের কাজ চলছে। ওকে মাথায় রেখেই একটি চরিত্র লেখা হল। চরিত্রটি ছিল রাধানাথের। ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। যেদিন ওর গলফ গ্রিনের ফ্ল্যাটে গেলাম, দেখলাম খুব অসুস্থ। ছবির গল্প শুনে কাজ করতে রাজি হয়েছিল। সেদিন আবার বললাম, “তোমার রাজনীতিতে যাওয়া ঠিক হয়নি তাপস।” মাথা নেড়ে বলেছিল, “আপনি ঠিকই বলেছিলেন দাদা।”
২০১৯ সালের পয়লা জানুয়ারি ‘ছায়াসূর্য’ শুটিং করেছিল সারাদিন। বলেছিল ছবিটা শেষ করবই। কিন্তু তাপসের শরীর সায় দেয়নি। জেনেছিলাম, ভুবনেশ্বরে থাকাকালীন ওঁর শরীর খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। শারীরিক পরিস্থিতির কথা জেনেই বাধ্য হয়ে ‘ছায়াসূর্য’-তে রাধানাথের চরিত্রে অন্য অভিনেতাকে বেছে নিই। জানতাম, তাপস পালের বিকল্প নেই। তাপস পালের বিকল্প হয় না। তাপস পালের বিকল্প হবে না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news