নিজস্ব সংবাদদাতাঃ
পশ্চিম মেদিনীপুর, ১০ নভেম্বর : জঙ্গলমহলের আদিম কুড়মি জনজাতির মানুষের ঘরোয়া উৎসব বাঁদনা । এই উৎসব তিনদিন ধরে চলে নানান পর্যায়ে। অমাবস্যার রাতে গরু জাগানো হয়। তারপর দিন ‘গরৈয়া’। এই পর্যায়ে সারাদিন উপবাসে থেকে মা-মাসিরা গরুকে দেবতা হিসেবে পুজো করে। শেষদিনে গরুখুঁটান হয়, বাঁদনার সবচেয়ে আনন্দদায়ক পর্যায়।
খুঁটিতে একটি করে গরুকে শক্ত করে বেঁধে বাদ্যযন্ত্রসহ মৃতপশুর চামড়ার সাহায্যে গরুখেলানোই হল গরুখুঁটান। একসময় জামিরগোট, মধুপুর, চাঁচগাড়ি প্রভৃতি জঙ্গলঘেরা গ্রামগুলিতে আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপন করা হত এই উৎসবের। কিন্তু বর্তমানে অনেকখানি কমে গেছে ‘বাঁদনা’র উন্মাদনা। ঢিলেঢালা হয়ে গেছে বাদ্যযন্ত্র, পশুচামড়া প্রভৃতি যোগাড়ের টান পড়েছে। একসময় প্রতিটি ঘরের একটা করে গরু খুঁটানো হত। ছেলে বুড়ো সবাই আনন্দ করত। কিন্তু এখন অার তত মানুষ গরু খুঁটাতেই আগ্রহী নন। মোবাইলপ্রজন্ম তো গরু খুঁটানের গানই জানে না। স্থানীয় বাসিন্দা অসীম মাহাত বললেন, এখন ধান কাটা আর আলু লাগানোর সময় চলছে। গরুখেলাতে গিয়ে গরুর ক্ষতি হতে পারে। তাই তিনি এবছর গরুখুঁটাননি। সুভাষ মাহাত বলেন, মানুষের এখন সময় নেই। গরু খুঁটালে তো কেউ টাকা দেবে না। মৃণালকান্তি মাহাত মহাশয়ের শর্ট ডকুমেন্টারি ‘বাঁদনা’-য় রয়েছে গরুখুঁটানের আসল রহস্য। তাঁর মতে গরুখুঁটান গরুকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং জঙ্গলে চরতে গিয়ে গরু যাতে নানান বন্যজন্তুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিততে পারে, তারই কিছু ট্রিকস শেখানো। তাছাড়া ধান লাগানো হয়ে যাবার পর দু’তিন মাস গরুর তেমন কোনও কাজ থাকে না। গরুগুলি অলস হয়ে যায়। তাই গরুখুঁটানের মাধ্যমে পুনরায় গরুগুলিকে তেজি করার জন্যই মূলত গরুখুঁটান।
যাই হোক, গরুখুঁটান কিন্তু অনেকখানি জৌলুস হারিয়েছে জঙ্গলমহলের গ্রামগুলি থেকে। এইভাবে ধীরে ধীরে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে ভাঁটা পড়ছে সবখানেই। এলাকার এক ঝুমুর শিল্পীর আক্ষেপ, এই আঞ্চলিক সংস্কৃতিগুলিকে ব্যবহার করে দেশবিদেশের নানান শিল্পীরা তাদের শিল্পকে পুষ্ট করে পুরস্কার পাচ্ছেন, আর আমরা কিনা ভুলে যাচ্ছি আমাদের সংস্কৃতি। ভুলে যাচ্ছি আমাদের মায়ের ভাষা। আর কে না জানে নিজস্ব ভাষা আর নিজস্ব সংস্কৃতিই হল একটা জাতির জাতিসত্বা তথা মেরুদণ্ড।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news