পার্থসারথি পাণ্ডা:
আচ্ছা, আমরা কারা? তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম, নির্দল? পক্ষপাতী ভোটার? উঁহু, আমরা আসলে গিনিপিগ। হ্যাঁ, ভারতীয় গণতন্ত্রের পরীক্ষাগারে আমরা প্রকৃষ্টতম গিনিপিগ। আমাদের দিয়েই চলে গণতন্ত্রের মহান নিরীক্ষা। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে দর্শক পুলিশের সামনে দিয়ে লাইন বেয়ে যদি আমরা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে বেরিয়ে বাড়ি পৌঁছতে পারি, ভোট লুট হলেও কায়দা করে আমরা নিজেদের অক্ষত রাখতে পারি, তাহলেই গণতন্ত্র শত শতাংশ সফল। মধ্যিখানে নেতা বা নেতার চামচারা হুমকি দেবেন আর পুলিশ প্রশাসন দন্ত বিকশিত করবেন, এটা একরকমের দীর্ঘদিনের রুটিন, আমাদেরও গা সওয়া, নেতাদেরও এসব না হলে মনে হয় যেন ভোটটাই জমল না, নির্বাচন কমিশন এসবের সঙ্গে সমঝোতা করতে একরকম প্রস্তুতই থাকেন এবং গণতন্ত্র তাতে বিঘ্নিত হয় না। এমনকি মারপিট, বোমাবাজি এসব হলে যদি দু’চারজন গিনিপিগ মারাও যায়, যদি মিডিয়ার সাংবাদিককুলের কয়েকজন ঘায়েলও হন তবুও অতীত ইতিহাস অনুযায়ী গণতন্ত্র খুব একটা বিঘ্নিত হয় না। শুধু গণতন্ত্রের সামান্য দু’একটা স্তম্ভ লঘু বিদ্রোহ করে, মোমবাতি মিছিল হয় এবং আমাদের নিরন্তর ভুলে যাওয়া প্র্যাকটিস করতে হয়। কারণ, আমরা যাঁদের সুবিখ্যাত হাতে বা সুনিপুণ পোষা হাতে মার খাই, তাঁদের কাছেই দু’দিন পরে আমাদের ব্রেকিং খুঁটতে যেতে হয়! কারণ, নিছক কর্মী দিয়ে তো আর মিডিয়া চলে না, চলে কারেন্সি দিয়ে। কড়ি ফেলল কে? তারই তেল, আমার নীতি! মাছের তেলে বেগুন ভাজবো। যাক গে, যা বলছিলাম, এসবের বাইরে অ্যাকশনটা মাত্রাছাড়া হয়ে গেলে, মারাত্মক রকমের হিংসা ছড়িয়ে গেলে, এলাকায় কারফিউ-টারফিউ জারি করার মতো অবস্থা হলে, তখনই গণতন্ত্র বিপন্ন হয়, তার আগে নয়। সুতরাং, গণতন্ত্র বেশ মজবুত একটা জিনিস, এক্ষেত্রে সরকারী চোখে চট করে যা বিপন্ন হয় না। ফলে, গিনিপিগ ব্যবস্থার বিবর্তনও ঘটে না।
পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র আবার মন মেজাজে একটু অন্যরকম; সরকার ‘স্পর্শকাতর’ হলে সেও স্পর্শকাতর, সরকার তাকে ‘বহাল তবিয়ত’ বললে সেও আনন্দে ডগমগ, সরকার তাকে ‘বিপন্ন’ বললে সেও মুহ্যমান মুমূর্ষু হয়ে পড়ে! সরকারী মর্জি সে বোঝে ভালো, তারসঙ্গে জনগণের লেনদেন শুধু অভ্যাস-পরিমাণে বা তার কম। যেমন, কোন কাণ্ডে সরকার ঘনিষ্ঠ কাউকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ধরলেই এখানে গণতন্ত্র বিঘ্নিত হয়, যদি সোশ্যাল সাইটে জননেত্রীর ব্যঙ্গ ছবি প্রচারিত হয়, তাহলে গণতন্ত্র বিঘ্নিত হয় এবং গণতন্ত্র বিঘ্নকারীর জেল হয়। শুধু তাই নয়, জননেত্রীর বহুল কাট আউটের বিপক্ষে কথা বললে, তিনি যদি পরিচালক হন তাহলে তাঁর চলচ্চিত্রও গণতন্ত্রের বিঘ্ন ঘটাতে পারে, এই আশঙ্কায় সেই ছবির ভবিষ্যৎও অন্ধকার হয়ে যেতে পারে। যেমন হয়েছে ‘ভবিষ্যতের ভুত’ ছবির ক্ষেত্রে। কিংবা, কারও বই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে, সরকার এরকম আশঙ্কা করলেও গণতন্ত্রের পক্ষে লেখক বিপদজনক হয়ে উঠতে পারেন। সুতরাং, এগুলোই হল পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র বিঘ্নিত হওয়ার ক্রাইটেরিয়া। এর বাইরে, পুলিশের গুলিতে ছাত্রের মৃত্যু, প্রশ্ন ফাঁস, বেআইনিভাবে চাকরিতে নিয়োগ, চাকরির জন্য অনশন ও অসুস্থতা, অনাহার মৃত্যু, ভোটের আগের বা ভোট চলাকালীন বা ভোট-উত্তর সন্ত্রাসেও এখানে গণতন্ত্র চট করে বিঘ্নিত হয় না। সুতরাং, আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তি এত মজবুত যে, কোনকিছুতেই চট করে বিঘ্নিত হয় না!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news