জিষ্ণু বসু : 
রাজনীতি বড় দায়। রাজনীতিকরা অনেকের থেকে অনেক বেশি মেধাবী। তাঁদের স্মৃতিশক্তিও প্রখর। কিন্তু ভোটের লোভে সব এলোমেলো হয়ে যায়! আজ অসমের এনআরসি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস দিল্লি থেকে কলকাতা উথালপাতাল করছে। হেভিওয়েট নেতানেত্রীদের শিলচর থেকে পত্রপাঠ ফিরে আসতে হল। সন্তোষমোহন দেবের কন্যা বর্তমান কংগ্রেসের সাংসদ সুস্মিতা দেব আটঘাট বেঁধে লিখেছিলেন, যদি তৃণমূল নেতারা গণ্ডোগোল পাকাবেন না মনে হয় তবে যেন জেলা প্রশাসন তাঁদের যেতে দেয়। জেলা প্রশাসন গণ্ডোগোলের সম্ভাবনা দেখে তাঁদের আর বিমানবন্দরের বাইরে বের হতেই দেয়নি। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। উনি বলেছেন অসমের এনাআরসির জন্য ‘গৃহযুদ্ধ’ হবে, ‘রক্তগঙ্গা’ বইবে। এতে ঘাবড়ে গিয়ে অসমে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি দীপেন কুয়ার পাঠক পদত্যাগ করছেন। কিন্তু মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তারপরেও থেমে থাকেননি। বলেছেন, এরাজ্যে নাগরিক পঞ্জিকরণের জন্য বিজেপি হাত বাড়িয়ে দেখুক না!
কিন্তু জাতীয় সংবাদ চ্যানেলগুলোতে মাননীয় নেত্রীর ২০০৫ সালে সংসদের ভেতরের ফুটেজ বারবার দেখাচ্ছে। ৪ অক্টোবর দিদি দুহাতে দুই বাংলার ভোটার লিস্ট নিয়ে বোঝাতে চাইছিলেন কিছু বাংলাদেশী নাগরিকের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্টেও আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন বারবার বলেছিলেন এই অনুপ্রবেশ দেশের জন্য এক ভয়ানক বিপদ ডেকে আনবে। তাঁকে একবার বলতে দেওয়া হোক। কিন্তু তৎকালীন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় একবার বিষয়টির উত্থাপন খারিজ করে দিয়েছেন। তাই ভারপ্রাপ্ত স্পিকার চরণজিৎ সিংহ অটোওয়াল বেচারা কী করেন! শেষ পর্যন্ত সদনে না বলতে পেরে দিদি রেগে গিয়ে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে স্পিকারের চেয়ারের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ওই দুই গোছা কাগজ।
এখন প্রশ্ন হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন ঠিক বলেছিলেন না আজ ঠিক বলছেন?
অবশ্যই উনি সেদিনই ঠিক বলেছিলেন। সত্যি কথাই তো সিপিএম কেবল ভোটের লোভে অবাধে বাংলদেশী মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের এরাজ্যে ঢুকতে দিয়েছে। পার্টির নেতারা কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের ভোটার লিস্টে নাম তুলে দিতেন। যেমনটা হয়েছিল নদীয়ার করিমপুরে। করিমপুরে পার্টির ক্যাডারদের ধরে নিজের ভোটার কার্ড বানিয়ে নিয়েছিল বাংলাদেশী অনুপ্রেবশকারী শাকিল আহমেদ। শাকিল কিন্তু ভোটার কার্ড করেই চুপচাপ বসে থাকেনি। সে দুই বাংলায় ছড়িয়ে থাকা জেহাদি চক্রে যুক্ত হল ওতপ্রোতভাবে ভাবে। সিমুলিয়ার মাদ্রাসার মতো জেহাদের আঁতুড়ঘর তখন তৈরী হচ্ছে সারা বাংলায়। গরিব ঘরের মেয়েরা দুপুরে খাবার বিনিময়ে জেহাদে জড়িয়ে গেল। বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী শাকিল বিয়ে করল ভারতীয় মেয়ে কৌসরকে। দুজনে যুক্ত হয়ে গেল জেহাদে।
মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পরে যদি ২০০৫ সালে তাঁর নিজের উপলব্ধি মনে রাখতেন তবে হয়তো খাগড়াগড়ের ঘটনা ঘটত না। কিন্তু ভোট বড় দায়। মৌলবাদের বাড়বাড়ান্তি সর্বকালের রেকর্ড ছাড়াল। বর্ধমানের খাগড়াগড়ে তৃণমূল নেতা হয়ে গেলেন নুরুল হাসান চৌধুরী। নুরুল তার বাড়ির নিচের তলায় তৃণমূল পার্টির আফিসের জন্য জায়গা দিল। আর দোতলাতে ভাড়া দিল শাকিল আহমেদকে, মাসে ৪,৭০০ টাকার বিনিময়ে। শাকিল ততদিনে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের সক্রিয় সদস্য। তাদের চুক্তি মত তারা নুরুলের বাড়িতে ইম্প্রোভাইস এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসে আরডিএক্স ভরত। তারপর বাংলাদেশে সম্ভবত জেএসবিকে সরবরাহ করত। তাই একজন অনুপ্রবেশকারী এতজন ভারতীয়কে জেহাদি সন্ত্রাসের জাহান্নামে নিয়ে এল। একটি খাগড়াগড় ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর সামনে এসেছে, আরও কত কত স্লিপার সেল তৈরী করেছে এমনই একজন অনুপ্রবেশকারী।
অনুপ্রবেশকারী আর উদ্বাস্তুঃ এই দুটি শব্দের অর্থের পার্থক্যও এখন প্রায় সকলের কাছে পরিষ্কার। রাষ্ট্রসংঘের একটি সংস্থা ইউনাইটেড নেশানস হাই কমিশন ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর)। রাষ্ট্রসংঘের এই সংস্থার সংজ্ঞা মতে, ধর্ম বর্ণ জাতি ভাষা ইত্যাদি কারণে অত্যাচারিত হয়ে যদি কেউ অন্য দেশে শরণ নেয় তবেই সে শরনার্থী মানে উদ্বাস্তু। সেই হিসাবে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু বা বৌদ্ধই কেবলমাত্র ভারতে উদ্বাস্তু। কারণ অত্যাচার, ধর্ষণ, লুঠ, হত্যা তো একতরফা হিন্দুদের বিরুদ্ধেই হয়েছে। তাই বাংলাদেশ থেকে অর্থনৈতিক বা অন্য কারণে ভারতে আসা বাংলাদেশী মুসলমান নাগরিক অনুপ্রবেশকারী। এরা দুজন আন্তর্জাতিক আইনেও এক নয়, মানবিকতার দিক থেকেও এক নয়।
পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের সঙ্গে যে অনুপ্রবেশকারীদের মতো ব্যবস্থা নিলে ঠিক হবে না সে কথা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)ও বহুবার বহু জায়গায় বলেছে। ২০১২ সালে কোজিকোটে সিপিআইএমের ২০তম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্টিত হয়। তাতে ‘ফর রাইট অফ বেঙ্গলি রিফিউজি’ শিরোনামে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেখানে বলা হয় যে, ‘বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রাদায়ের উদ্বাস্তুদের বিষয়ে নাগরিকত্ব আইনের ধারা ২ (এল) (বি)কে যথাযথ ভাবে সংশোধনের জন্য এই পার্টি কংগ্রেস দাবি করছে।’ পরিষ্কার ভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ মানে উদ্বাস্তুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলেছে পার্টি। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ভারতে রাখার দাবি করেনি পার্টি।
কিন্তু ভোট বড় দায়। সর্বস্বান্ত হিন্দু উদ্বাস্তুরও মাত্র একটা ভোট আবার সুযোগসন্ধানী অনুপ্রবেশকারীও একটাই ভোট। ১৯৯৮ সাল। বামফ্রন্টের সূর্য তখন মধ্যগগনে। উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ফরওয়ার্ড ব্লকের রবীন ঘোষ। উলুবেড়িয়া আর ধূলাগড় অঞ্চলে তখন বসছে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী। অনুপ্রবেশকারী মানে ব্লক ভোটার। ২৩ জুন শোনা গেল ৮০২৯ কুরলা এক্সপ্রেসে মুম্বাই পুলিশ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে আসছে, ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে ছেড়ে দিতে। বিধায়ক মহাশয় নিজে কয়েক হাজার লোক নিয়ে ট্রেন আটকালেন। সশস্ত্র লোক ট্রেনের কামরায় ঢুকে ছিনিয়ে নিয়ে এল অনুপ্রবেশকারীদের। হাতে গোনা প্রহরীদেরকেই উদ্ধার করে আনে জিআরপি।
অসমের নাগরিক পঞ্জিকরণের জন্য কংগ্রেস বহুবার যত্নশীল হয়েছিল। পূর্ব প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধীর সময়ই ঠিক হয়েছিল তৈরী হবে সিটিজেনশিপ রেজিস্টার। অসম অ্যাকর্ডের মূল ভাবনাটাই সেটা ছিল। তাই এবারও সংসদের দুই কক্ষেই অসম থেকে আসা কংগ্রেস প্রতিনিধিরা এনআরসির সমর্থন করছেন। রীপন বোরা বা ভনেশ্বর কালিতার মত সাংসদরা তো এনাআরসিকে কংগ্রেসের সাফল্য হিসাবেই দেখিয়েছেন। যে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম নাগরিকপঞ্জিতে নেই তাদের ওপর কোনও অমানবিক ব্যবহারের কথা অসমে বিজপি বা কংগ্রেস কেউ বলেনি। নির্বাচন কমিশনও আসামী লোকসভা ভোটে তাদের ভোটাধিকারের ঘোষণা করে দিয়েছে।
কিন্তু একটা সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশের অধিকার থাকবে না তার নাগরিকদের তালিকা প্রস্তুত করার! কোনও একটি সময় তো বলতে হবে, যথেষ্ট হয়েছে আর অনুপ্রবেশ নয়!
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পূর্ববঙ্গের হিন্দু উদ্বাস্তুদের সম্মানজনক নাগরিকত্ব। ওপার বাংলাতে তারা অত্যাচারিত, মা বোনেরা ইজ্জত খুইয়ে, সারা জীবনের সব অর্থ সঞ্চয় মৌলবাদীদের হাতে দিয়ে এখানে এসেছে। তারা এখানে এসেও সারা জীবন পুলিশের তাড়া খাবে আর নেতাদের পায়ে ধরবে এটাই কি মানবিকতা? স্বাধীনতার পরে এই প্রথম কোনও কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ থেকে আসা হিন্দুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছে। সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০১৬ হিসাবে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আগে যেসব বাংলাদেশী হিন্দু উদ্বাস্তু ভারতে এসেছেন তারা যতদিন খুশি এদেশে বিনা উপদ্রবে থাকতে পারবেন। এই বিল পূর্ববঙ্গে উদ্বাস্তুদের জন্য স্বর্ণময় সুযোগ এনেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক পঞ্জিকরণ বা এনআরসি না হলে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া অসম্ভব। কারণ একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশ অত্যাচারিত হিন্দু শরনার্থী বা উদ্বাস্তুকে নাগরিকত্ব দিতে পারে কিন্তু বেআইনী অনুপ্রবেশকারীকে কখনওই স্থায়ী নাগরিকত্ব দেবে না।
তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম সহ বামফ্রন্ট বা কংগ্রেস বিভিন্ন সময়ে পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘু হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভারতে সম্মানজনক বৈধ নাগরিকত্বের কথা বলেছেন একই সঙ্গে ভারতে বেআইনী অনুপ্রবেশের বিপদের কথাও। এই উপলব্ধি তাদের সমাজের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে হয়েছে। ভোটের কারণে হয়তো সাময়িক ভাবে অন্য কথা বলতে হয়েছে। কিন্তু সকলেই তো মানবেন দুটো বিষয় কোনওভাবেই এক নয়। এ বিষয়ে কেউ তর্ক করলেই আমার চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মূহুরীর কথা চোখে ভাসে। ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর স্যার সকালের কাগজ পড়ছিলেন। ১০/১২ জন মৌলবাদী খুন করল এই প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধাকে। স্যারের নিথর দেহ, মাথার পাশে ঝুলে পড়া মাংস…। আচ্ছা অধ্যাপক মূহুরীর পরিবার ভারতের নাগরিকত্ব চাইলে সেটা কি একজন অনুপ্রবেশকারীর সঙ্গে একভাবে বিবেচনা করা উচিত? একটু ভেবে দেখুন! পূর্ববঙ্গে হিন্দু উদ্বাস্তুদের বহু পুরাতন সমস্যা আজ সমাধানের দোর গোড়ায়। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে একটিবার মানবিকতার আধারে ভাবুন। দোহাই আপনাদের!
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news