কিশোর ঘোষঃ

এক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ইজ দ্য বেস্ট। বন্ধুত্ব কতটা স্বচ্ছ কাঁচ, কতখানি নিষ্পাপ আলো তা অনুভব হয় তাঁর ‘বিবিধ প্রবন্ধে’র ছোট্ট গদ্য ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা’ পড়লে। তিনি লিখেছেন, ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু ঝট্ করিয়া সে তফাৎ ধরা যায় না। বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। কিন্তু ভালোবাসার পোশাক একটু ছেঁড়া থাকিবে না, ময়লা হইবে না, পরিপাটি হইবে। বন্ধুত্ব নাড়াচাড়া টানাছেঁড়া তোলাপাড়া সয়, কিন্তু ভালোবাসা তাহা সয় না।….’ (বানান অপরিবর্তিত)।
অর্থাৎ কিনা বন্ধুত্ব মেকি হতে পারে না, সেখানে হাই-হ্যালোর সৌজন্য নেই। কারণ বন্ধুত্ব শর্তহীন এক সম্পর্ক। এখন প্রশ্ন হল, যত বেশি করে তেমন তেমন বন্ধুত্ব মিলছে না ততই কি আমরা বন্ধুত্ব দিবস নিয়ে হইচই করছি?
আগামী রবিবার (৫ আগস্ট) বন্ধুত্ব দিবস, জানি তার আগে এমন কড়া কথা শুনতে কারও ভালো লাগছে না। তবু এ কথা না তুললেই নয়। কারণ প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে বন্ধুত্ব হজম না হওয়া এক শব্দ। ফলে সমসময়ের ছোটবেলা থেকে বড়বেলা, স্কুল থেকে অফিস—কোথাও প্রকৃত বন্ধু নেই। বুকে হাত দিয়ে ছলছল চোখে আর বলতে পারি না—বন্ধু ছাড়া প্রাণ বাঁচে না। যে সময়ে এক ক্লাসের দুই ছাত্র একে অপরকে নোট দেখায় না, পাছে ‘বন্ধু’টি এগিয়ে যায় পড়াশোনায় এই ভয়ে, তখন বন্ধু নামের চারাগাছটি আলো-হাওয়া পাবে কী করে বলুন! অফিস কলিগও তো প্রতিযোগী। এই ভাগাভাগি করে টিফিন খাচ্ছে, পরক্ষণে উপর মহলের কান ভাঙাচ্ছে সহকর্মীর বিরুদ্ধে। অন্যের ডিমোশনে নিজের প্রমোশন হলেও আচ্ছা। এই বাস্তবতা এক কঠিন কঠোর সমাজ বিজ্ঞান। বন্ধুত্ব তো আসলে নিজের ঘরের জানলা দরজাগুলো বিশেষ মানুষের সামনে হাট করে খুলে দেওয়ার নাম। আমার ধারণা, আজকাল এতখানি প্রকাশ্য হতে ভয় পাই আমরা। সংস্কৃতির বিবর্তনে ইদানীং পুঁচকেবেলাতেই এই ভয়ের ভাইরাস ঢুকে পড়ে মনে।
যদিও বড় মানুষেরা সুন্দর সব কথা বলে গেছেন বন্ধুত্ব নিয়ে। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘দু’টি দেহে একটি আত্মার অবস্থানই হল বন্ধুত্ব।’ কী অপূর্ব বলেছিলেন হেলেন কেলার— ‘অন্ধকারে একজন বন্ধুর সঙ্গে হাঁটা আলোতে একা হাঁটার চেয়ে ভালো।’ নিথসে মনে করতেন ‘বিশ্বস্ত বন্ধু হচ্ছে প্রাণরক্ষাকারী ছায়ার মতো। যে তা খুঁজে পেল, সে একটি গুপ্তধন পেল।’
সুনীলের (গঙ্গোপাধ্যায়) যেমন ‘গুপ্তধন’ ছিল শক্তি (চট্টোপাধ্যায়), শক্তির সুনীল। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় আর নজরুল ইসলামের মধ্যে যেমন মহান বন্ধুত্ব ছিল। বারীন ঘোষাল ও কমল চক্রবর্তীর বন্ধুত্ব ছিল প্রবাদপ্রতিম। খেলার মাঠে কৃশানু-বিকাশ আর বিজয়ন-আনচেরির মধ্যে যে সম্পর্ক দেখেছি আমরা তা কি খুব বেশি হয়? হওয়া সম্ভব? ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেট ক্যাপ্টেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনির জীবনে বন্ধুরা কতখানি তা বলিউডের অপূর্ব বায়োপিকটির মাধ্যমে এতদিনে জেনে গেছে গোটা ভারত। তবে জয়-বীরু টাইপ বন্ধুত্ব সব সময় হয় না। আবার অনেক সময় হয়ও। যে সব বিখ্যাত বন্ধুদের কথা তোলা গেল এই লেখায় তার বাইরে সাধারণ জীবনে কত এমন অপূর্ব বন্ধুত্বের গল্প-হলেও-সত্যি আছে যা আমি আপনি জানি, চোখের সামনে দেখেছি। হয়তো স্কুলে বা কলেজে কিংবা পাড়ার ফুটবল মাঠে অথবা স্থানীয় চায়ের দোকানে রোপণ হয়েছিল সেই বন্ধুত্বের বীজ। শেষ হয়েছিল দুই বন্ধুর দেহ নিমতলা ঘাটে ছাই হওয়ার পর। কত গরিব বন্ধুর রোগা হাত ধরে টেনে তুলেছে তুলনায় ক্ষমতাবান বন্ধু। রাজদ্বারে যেমন পাশে থেকেছে শ্মশান-পরিস্থিতিতেও সঙ্গ ছাড়েনি। কিন্তু তেমন বন্ধুত্ব কি এ যুগেও সম্ভব?
ইঁদুরদৌড় যখন বাপ-মা’র কথাও ভুলিয়ে দিচ্ছে তখন বন্ধুত্ব কোন ছাড়! তবে বন্ধুত্ব দিবসকে ঘটা করে মানি আমরা। কারণ তা বাজার অর্থনীতির মোহময় দান, হাওয়া ভরা রঙিন বেলুন। মনে রাখতে হবে ১৯১৯ সালে হলমার্ক নামের এক গ্রিটিংস কার্ড কোম্পানি আগস্টের প্রথম রবিবারে বন্ধুত্ব দিবস চালু করে। সে কালে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে দূরের বন্ধুকে কার্ড পাঠানোর রেওয়াজ চালু হয়। যদিও এর সবটাই ইউরোপ আমেরিকার কাণ্ড। দেখা যাচ্ছে ১৯৩৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস আগস্ট মাসের প্রথম রবিবারটিকে বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এবং তা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়। যদিও ২০১১ সালে রাষ্ট্রসংঘ ৩০ জুলাইকে ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ ডে হিসেবে ঘোষণা করেছিল। যদিও আর পাঁচটা বিষয়ের মতো এক্ষেত্রেও তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভারত মার্কিনদের বন্ধুত্ব দিবসকেই মেনে নিয়েছে। ফলে আগামী রবিবার হোয়াটসঅ্যাপে, ফেসবুকে হুলিয়ে বন্ধুত্ব দেখাব আমরা। তরুণ-তরুণীরা ফ্রেন্ডস ব্যান্ড কিনে ‘বন্ধু’র হাতে বেঁধে দেবে। কিন্তু তাতে করে কি সত্যিকারের বন্ধুত্ব গজাবে হৃদয়ে? মনে হয় না। অতএব, বন্ধুত্ব প্রসঙ্গে খুব ভুল বলেননি হর্ষবর্ধন গোবর্ধনের স্রষ্টা জিনিয়াস শিবরাম (চক্রবর্তী)।
‘বন্ধু পাওয়া যায় সেই ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজেই। প্রাণের বন্ধু। তারপর আর না। আর না? সারা জীবনে আর না? জীবন জুড়ে যারা থাকে তারা কেউ কারও বন্ধু নয়। তারা দু’রকমের। এনিমি আর নন-এনিমি। নন-এনিমিদেরই বন্ধু বলে ধরতে হয়।’
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news