Breaking News
Home / TRENDING / গোপনে মদ ছাড়ান

গোপনে মদ ছাড়ান

 নীলার্ণব চক্রবর্তী:

না, গোপনে মদ ছাড়ানো ‌যায় না। গেলেও তা আকস্মিকের খেলা। বলছেন সাদামাটা থেকে সেরা-মাথা ডাক্তার-বৈদ্যরা। তবু গোপনে মদ ছাড়ানোর ব্যবসা বেলাগাম, বে-ব্রেক। রেলাঞ্চলেই এই অ্যাডের র‍্যালা। রেলের কোটি কামরা শত স্টেশনে, টয়েলেটের ভাঙা হিসিগন্ধ-মাখা দেওয়ালে, ভ্যাটের অবর্জনা-লাঞ্ছিত ধ্বস্ত ঘেরাটোপ, ল্যাম্পপোস্টের শরীর থেকে উড়ালপুলের নীচের ওয়ালে-ওয়ালে এই অ্যাডাবির্ভাব। ১০ মিনিটে বশ, বাঁকা লিঙ্গ সুলভে সোজা, ‌যৌন রোগের জাদু সমাধানের মতো প্রতি‌যোগীরা হুহু পিছনে— এগোচ্ছেই গোপনে মদ ছাড়ান।
না, গাঁ-গঞ্জ-মফস্‌সল নয়, একেবারে খোদ বালিগঞ্জ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় আলিশান চেম্বার খুলে বসেছেন  গোপনে মদ ছাড়ানোর বছর আটত্রিশের বি সি শীল (এ ছাড়াও আরও অর্বুদ এলাকায় তিনি সিটিংয়ে সিটিংয়ে গোপনে মদ ছাড়িয়ে বেড়ান গোটা বছরই)। শীলের দাবি, তিনি আয়ুর্বেদাচা‌র্য। এও দাবি, জেবি রায় আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ আউট। ‌যদিও সেখানকার প্রবীণ শিক্ষকদের ‌‌যাঁরাই শুনলেন শীল-নাম, তাঁরাই ‘কোয়াক কোয়াক’ করে উঠলেন। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ আয়ুর্বেদ কাউন্সিল সূত্রেও এমন কোনও চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কোনও তথ্যই  মিলল না । তবে, এ সবে বি সি ওরফে ভৈরবচন্দ্রের একটি পুরুষ্টু কাঁচা কলা! হলুদের উপর কালোয় লেখা তাঁর ‘শীলমোহর’ থুড়ি সম্পূর্ণ আর্য়ুর্বেদিকে গোপনে মদ ছাড়ানোর বিজ্ঞাপন কলিকাতা থেকে কাকদ্বীপ। শীলের চেম্বারে গিয়ে দেখা গেল সেটি পেসেন্ট-উপচানো। কনকনে এসিতে গদিআঁটা বিশাল চেয়ারে বিসি বসে ভিতরের জমকালো ঘরে, তাঁর সামনে সিসিটিভির বড়সড় মনিটর, পেসেন্টদের আচরণে সতর্ক নজর দিয়ে আছেন শীল-ডাক্তার। এবং চেম্বারের ভিতরে এক মনকাড়া মন্দিরও। চাইলে ডাক্তার দেখিয়ে মন্দিরে মাথা ঠুকে বাড়ি ফেরুন না (শীলতীর্থ নাকি)! দেখেটেখে আমার মাথা ভোঁ আর শীল কুল-কনফিডেন্ড ও গর্ব ঝরে-পড়া। ‌‌যেন বলছেন: ‌যাকে পাবি তাকে ছোঁ না গিয়ে, সক্কলে বলবে, শীল দুই নয়— এক নম্বর ও আগমার্কা। চেম্বারে কয়েকজন পেসেন্ট থুড়ি পেসেন্ট পার্টির সঙ্গে কথা হতে হতে কেসটা ক্রমেই পোষ্কার:  যদি আপনার বাড়ির কারওর মদ বা শুকনো নেশায় আপনি নাচার হয়ে গিয়ে থাকেন, ‌যদি জল ফেলতে ফেলতে চোখ একেবারে খটখটে হয়ে গিয়ে থাকে, ‌তাহলে দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়ানো শীলের ওই দুর্নিবার বিজ্ঞাপনিক ইশারা আপনাকে মোক্ষম হ্যাঁচকা দেবেই। এবং সেই টানে এখানে না এসে পড়ার কোনও কারণই নেই! আসক্ত আত্মীয়-বন্ধুকে কী ভাবে নেশামহল থেকে বার করে আনা ‌যায়, তার জ্ঞান শীল আপনাকে দেবেন। কিছু ওষুধ দেবেন, গোপনে সেসব খাওলেই ফটাকসে ফল মিলবে বলেই দাবি ও বিশ্বাস।  (তবে, আয়ুর্বেদ এলাকার অনেকেরই অভি‌যোগ, বেআইনি ভাবে চেম্বারেই দেদার আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিক্রি করে ভৈরবচন্দ্র আরও ফোলাফাঁপা হচ্ছেন)। কীভাবে খাওয়াবেন ওষুধ? পাখি-পড়ানো মাফিক বুঝিয়ে দেবেন বিসি। এ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চা-কফি বা রান্না করা শাকসব্জি-ডালের  সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে ফেলুন। তারপর রোগীর অজান্তে খাইয়ে ‌যেতে থাকুন, ব্যাস—!’ ‌শীলের দাবি, উপকার ৭ দিনে। গ্যারেন্টি ১০০ শতাংশ। যখন বিসি-র ঘরে ঢুকলাম, এক বয়স্ক মহিলা (পেসেন্ট পার্টি) তখন সেখানে বসে। জানালেন, তিনি কোন্নগরের বাসিন্দা। মেয়ের পেনকিলারের নেশায় নাকানিচোবানি খেয়ে এখানে এসেছেন। ছলছলানো চোখে বলা শুরু: বিয়ের পর থেকেই মেয়ের পরিবারে খুব গণ্ডগোল। মেয়েটা ভাল কবিতা লেখে, ছবি আঁকে। কিন্তু ভাল দেখতে নয় বলে সবসময় শ্বশুরবাড়ির টিকটিক আর খোঁটা। দিন দিন ঝামেলা বাড়ে। এর মধ্যে মেয়েটি আবার অন্তঃসত্ত্বা হয়। কেন জানা নেই, ঝগড়াঝাঁটি বাড়তে থাকে আরও। ‘একদিন শুনি, মেয়ের গায়ে আগুন…। প্রদীপ থেকে আগুন লেগেছে জানাল শ্বশুরবাড়ি, কিন্তু আমার বিশ্বাস জামাই-ই—। ‌তবে ভগবান আছেন… মেয়েটার শরীর বেশি পোড়েনি, মুখটাও বেঁচেছে, বাচ্চাটার কিসসু হয়নি। হ্যাঁ, ফুটফুটে একটা মেয়ের জন্ম দেয় ও তারপর। কিন্তু… (একটা পজ দিয়ে মুখ একেবারে ঘন কালো করে এবার কেঁদেই— ওদিকে শীলের তাড়া: কান্না থামান মাসিমা, কথাটতা তাড়িতাড়ি শেষ করুন তো!) অত সুন্দর সন্তান পেয়েও, আগুন লাগার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি মেয়ে—।  মাসিকের সময় পেট ব্যথা করলে ও পেনকিলার খাওয়া ধরে তখন থেকেই।‌ সেই পেনকিলারই দেখলাম ওর নেশা হয়ে গেছে। বলতে গেলে মুঠো মুঠো পেনকিলার খেতে থাকে মেয়েটা। কত বোঝাই কিছুতেই কিছু হয় না। একদিন দেওয়ালে ‘গোপনে নেশা ছাড়ান’ দেখি। শুনেছি, অনেকের উপকার হয়েছে। ডাক্তারবাবু ওষুধ দিয়েছেন। জানালে মেয়ে খাবে তো না-ই, উল্টে চিৎকার করে পাড়া মাথায় করবে, তাই গোপনে উনি ‌যেভাবে বলেছেন খাওয়াচ্ছি। নিশ্চই ভাল একটা কিছু হবে—’
মহিলা ‌যখন বলছিলেন, আমি শীলের দিকে বার কতক তাকিয়েছি, তার মুখময় ‘দেখুন আমার ক্যালমা’ টাইপের একটা ভাব ঝুলে আছে। কিন্তু এরপর ভৈরবচন্দ্রবাবুকে তাঁর ডিগ্রি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিলে তাঁর মুখ থেকে সে সব ভাব কোথায় হারিয়ে। ‘আমার অনেক পেসেন্ট দেখতে হবে এবার আপনি আসুন’ বলে আমায় প্রায় তাড়ালেন। এবং গা থেকে অপমান মুছতে মুছতে চেম্বার থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে সদর দরজার সামনে এসে আরও দেড়-কাঠি চমক খেলাম। একজন মধ্যবয়সী দরজায় মাথা ঝুঁকিয়ে প্রাণামে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে হাওয়ায় আঁচড় কেটে নমো-নমো, এবার ভিতরে পা দিচ্ছেন। আমি দাদা-দাদা করতে থমকালেন।
প্রণাম কেন?
আরে ‌ডাক্তারবাবু তো সাক্ষাৎ ভগবান!
কেন?
আমার ভাইটা তো ডেনরাইট শুঁকত। সকাল থেকেই শুরু করত নেশা। পড়াশুনো সব লাটে উঠে গেল। শরীর খারাপ হয়ে ‌যাচ্ছিল। টিংটিংয়ে রোগা হয়ে গেল। জানেন তো ডেনরাইটের নেশা কী ডেঞ্জারাস!
হ্যাঁ…
শীল-ডাক্তারের কথা জানতে পেরে এখানে এলাম। ওষুধ দিলেন। গোপনে ওষুধ খাওয়াচ্ছি। কাজও হচ্ছে দাদা।
বারুইপুর লাইনে ছড়াছড়ি ‘মদ ছাড়ান’ দেখে (‘গোপন’ কিন্তু গোটা অ্যাডে নেই, ‌যদিও লোকমুখে শোনা, ‘গোপন’ আসলে এদের গোপন এজেন্ডা)  অ্যাড-উল্লিখিত মদারআট রোডের ঠিকানায় পৌঁছালাম। ‌জানা গেল, এদের মূল এসটাব্লিশমেন্ট ব্যারাকপুরে। অতঃপর ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে এক সন্ধেবেলায় পৌঁছালাম ব্যারাকপুর, কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে চক-কাঁঠালিয়ায় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বা নেশা ও মানসিক রোগের চিকিৎসা ও ফ্রি পরামর্শ কেন্দ্রে। আলাপ হল তুহিনকান্তি বিশ্বাসের সঙ্গে। ইনি হচ্ছেন কেন্দ্রের সম্পাদক। জানালেন পেশায় হাকিম। এও জানালেন, তাঁদের কেন্দ্রে অ্যালোপ্যাথির ডিগ্রিধারী মনোবিদ, আয়ুর্বেদিক ডাক্তার, ‌যোগ-বিশেষজ্ঞ সব আছে। দাবি, বৈজ্ঞানিক ভাবে চিকিৎসায় কোনও ত্রুটি রাখা হয় না। গোপনে মদ ছাড়ানোর কথা তুড়ি দিয়ে ওড়ালেন তুহিনকান্তি। তবে বললেন ‌যে, অনেকে এমনটা করে থাকেন। তাদের পক্ষে চেনা ‌যুক্তিটাও দিলেন: ‘আসলে নেশাসক্ত বেশির ভাগ লোকজনকে তো আনা ‌‌যায় না ডাক্তারের কাছে, তাই তাঁদের বাবামা বা আত্মীয়পরিজনরা আসেন, তাঁদের কাছ থেকে সিমটম শুনেই অনেক ডাক্তার ওষুধ দিয়ে থাকেন।’ দাবি, তাঁরা এই সেন্টারে সব কিছু আইন মোতাবেকই করেন— নো গণ্ডগোল, নট কিচ্ছু। আইনের বাইরে হাঁটার প্রশ্নই নেই।
যদিও এত দাবির পরও এক সূত্রের খবর, গণ্ড এখানে অনেকটাই গোল। নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই। ছড়াচ্ছেই গোপনে মদ ছাড়ানোর ঘাপলা-পেশা।


‘কখনও কখনও কাজ হলেও হতে পারে, কিন্তু জেনে রাখবেন, সেটা কাকতালীয়! রোগী না দেখে কোনও ওষুধ দেওয়াটা অপরাধ। আর গ্যারান্টি দিয়ে তো জ্বরের চিকিৎসাও করা ‌যায় না—’ বলছিলেন ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট আয়ুর্বেদিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক অবিচল চট্টোপাধ্যায়। হেদুয়ায় তাঁর ছোট্ট আটপৌড়ে চেম্বার। দাড়িশ্মশ্রুময় মুখ। লুকে-টকে প্রাচীন বৈদ্য ফিল। বললেন, ‘মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এরা ছিনিমিনি খেলছে। এরা ডিমরালাইজ করে দিচ্ছে গোটা সিস্টেমকে।’ তারপর সোজা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পৌঁছলেন: ‘জেনে রাখবেন এদের শাস্ত্রে ছদ্মচর বৈদ্য বলে। এ নিয়ে চরক সংহিতায় স্পষ্ট করে লেখাও রয়েছে। নকুল অর্থ্যাৎ বেজি ‌যেমন ঊর্ণাজালে জড়িয়ে মেষের মতোই পড়ে ‌যায়, কিন্তু মেষের মতো শব্দ করতে পারে না, তেমনই ন্যূনবুদ্ধি অজ্ঞ চিকিৎসক ভেষক বেশে থাকলেও, পণ্ডিতদের সামনে বোবা হয়েই থাকে। আর একটা কথা…’ ঊর্ণারাশির মতো দাড়িতে আঙুল চালালেন, ‘শুনুন, চরক সংহিতায় আছে, জ্ঞানী বৈদ্য সুমুখ, ‌যুক্তি‌যুক্তভাষী, অল্পভাষী, এবং অহংকার সরিয়ে তত্ত্বজ্ঞান প্রকাশ করবেন। আর ছদ্মচর বৈদ্যরা হয় ঠিক তার উল্টোটা। শাস্ত্রে বৈদ্যদের চারটে গুণের কথাও লেখা রয়েছে। শাস্ত্রে নির্মল জ্ঞান, বহু রোগীর চিকিৎসা করে বহুদর্শী, চিকিৎসায় সুদক্ষ এবং আত্মিক ভাবে পবিত্র। কিন্তু… চারদিকে বহু ছদ্মচর বৈদ্য পসার জমিয়ে ফেলেছে দেখছি, তাঁরা এ সব কিছু জানেনও না, তাই মানারও প্রশ্ন নেই—’
আসলে গোপনে মদ ছাড়ানোর ব্যবসা ফেঁদেছেন অনেকে। মারকাটারি সাফল্যও। ঝনঝনিয়ে ডাকছে কাঁচা পয়সার বান। এ নিয়ে মনোবিদ মোহিত রণদীপের সঙ্গেও কথা হল।  বললেন, ‘পেসেন্টকে না জানিয়ে ওষুধ দিলে রেজাল্ট পাওয়ার সম্ভাবনা সত্যিই ক্ষীণ। তাছাড়া ‌যে ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়ে থাকে, তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মৃত্যু-সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া ‌যায় না।’ গোপনে মদ ছাড়ানোর এই বাড়বাড়ন্তর জন্য তিনি সরকারকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন, ‘জানি না কী ভাবে এঁরা ব্যবসা চালিয়ে ‌যাচ্ছেন! পুলিশ-প্রশাসন কি চোখ বন্ধ করে আছে?’ আর এক মনোবিদের বক্তব্য, ‘নকল ডাক্তারদের অনেকেই চরম নেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এক সময়, বিভিন্ন রকম ওষুধ খেয়েছেন। এখন তা-ই অন্য লোককে দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন!’

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *