নিজস্ব সংবাদদাতাঃ
সন্ত্রাস যারা করে আর সেই সন্ত্রাসকে যাঁরা সমর্থন করেন তাঁরা কি আলাদা? কোথায় আলাদা? কিভাবে আলাদা? তাঁদের কি কোনও দোষ নেই?
কথা হচ্ছে মাওবাদীদের নিয়ে। আজকের ভারতে যাঁরা অন্যতম সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। এই প্রসঙ্গে ‘বিপ্লব’ শব্দটিকে টানতেই হয়। এবং প্রশ্ন উঠবে, বিপ্লবী আর সন্ত্রাসবাদীর মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? আদৌ কি পার্থক্য আছে? মাওবাদকে শহরের যে বিশিষ্টজনেরা সমর্থন করেন তাঁদের কাছে আমাদের অনেকেরই জিজ্ঞাসা—তবে কি বিন লাদেনকেও, আইএস জঙ্গিদেরও বিপ্লবী বলবেন আপনারা? যারা নির্দ্বিধায় হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে খুন করেন। ‘পান সিং তোমার’ ছবিতে পান সিং যেমন বার বার মনে করিয়েছিল, আমি ডাকাত না, আমি ‘বাগি’। যে ‘বাগি’ বা বিপ্লবীকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল। মোদ্দা কথা, এ এক অতি জটিল প্রসঙ্গ। তবে এ বিষয়ে কলকাতা শহরে যিনি খুব ভালো বলতে পারবেন বলে ধরে নেওয়া যায় সেই কবীর সুমনের কাছে প্রশ্ন করেছিল চ্যানেল হিন্দুস্থান—সম্প্রতি রাজ্যকে নাগরিক নকশালদের উপর নজর রাখতে বলেছে কেন্দ্র। বিশেষ বিশেষ সংগঠনগুলি কি করছে, করছে না— তা খেয়াল রাখতে বলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন?
উত্তরে ‘নাগরিক কবিয়াল’ বললেন, ‘এই যা শুরু হয়েছে তা এক ধরনের কতৃত্বপরায়ণতা, একনায়কতন্ত্র। প্রথমে ভারভারা রাও সহ বিশিষ্টজনদের গ্রেফতার করা হল। তারপর এই নজরদারি। সবটাই ভারতবিরোধী চক্রান্ত। চিরকালীন ভারতআত্মাকে খুন করার পরিকল্পনা করছে বিজেপি সরকার।’ আরও সরাসরি সুমন বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের কথা যদি ওঠে তবে মাওবাদীদের থেকে বড় সন্ত্রাসবাদী আরএসএস, বিজেপি। মুসলমানদের উপর, দলিতদের উপর যেভাবে অত্যাচার চালান হচ্ছে দেশে! যেভাবে তাদের খুন করা হচ্ছে তা সন্ত্রাস নয়? গোরক্ষকরা, গরুভক্তরা একের এক খুন করছেন সাধারণ নাগরিকদের। ‘লাভ জেহাদের’ নামে রাজ্যের এক শ্রমিককে পুড়িয়ে মারা হল। সেই খুনের ভিডিও প্রকাশ্যে আনা হল। এই তো অবস্থা। অতএব আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, মাওবাদীদের থেকে বড় সন্ত্রাসবাদী বিজেপি, আরএসএস।’
বাংলা গানের যুগান্তকারী গায়ক যা বললেন, তারপরেও কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল—কে বিপ্লবী আর কে সন্ত্রাসবাদী? খুন তো সব তরফেই খুন। রাম করলেও খুন, শ্যাম করলেও। গো-রক্ষার নামে হলেও, মাওবাদী বিপ্লবের নামে হলেও। তবে সন্ত্রাস যখন কোনও একটি সংগঠন করে তখন তা আরও ভয়নক হয়ে ওঠে বলা বাহুল্য। আর সেই সন্ত্রাসকর্ম যিনি সমর্থন করেন তিনিও কি সমান দোষী না? প্রশ্ন করা গেল বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সঙ্ঘপন্থী বুদ্ধিজীবী রন্তিদেব সেনগুপ্তকে।
রন্তিদেব পরিসংখ্যান দিয়ে বললেন, ‘২০১০ সালে পার্থ আর সৌম্যজিৎ নামের দুই যুবক ঘুরতে গেছিল অযোধ্যা পাহাড়ে। মাওবাদীরা ওদের খুন করে পুঁতে দেয়। কিছুদিন আগেও জঙ্গলমহলে বিচারসভা বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে মাওবাদীরা। ছত্তিশগড়ে ২৫ জন কংগ্রেস কর্মীকে খুন করা হল। যার মধ্যে ছিলেন বিদ্যাচরণ শুক্লা। এখন প্রশ্ন হল, খুনি মাওবাদীদের মানবাধিকার আছে কিন্তু নিরীহ সাধরণ মানুষের মানবাধিকার নেই?’ রন্তিদেব প্রশ্ন তুললেন, ‘যারা খুনি আর যারা সেই খুনিদের সমর্থন করেন দুজনেই কি সমান অপরাধি নয়? কিষানজির মৃত্যুর পর ভারভারা রাও তার মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে উত্তেজক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বিষয়টা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের। কাশ্মীরের জেহাদিদের সঙ্গে যোগ রয়েছে মাওবাদীদের। এমনকি বেশ কিছু উদ্যোগপতি, বহুজাতিক সংস্থা মাওবাদীদের নিয়মিত অর্থ সাহায্য করে থাকে। কমিউনিস্টরা চিরকাল খুনের রাজনীতি করেছে। রাশিয়ায়, চিনে, বলিভিয়ায়। জঙ্গলে লুকিয়ে খুন করেছে, আতঙ্ক তৈরি করেছে জনমানসে। আরেক দল শহরে থেকে খুনিদের জন্য সমর্থন জোগাড় করেছে। সহানুভূতি আদায়ের জন্য। এবার বলুন, এইসব শহুরে মাওবাদীদের উপর নজরদারির প্রয়োজন আছে কি নেই?’
এই প্রশ্ন কী এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে! কোনও ভাবেই যদি খুনের রাজনীতি সমর্থনযোগ্য মনে করা না হয় তাহলে এই প্রশ্ন আসবেই। যে সিআরপিএফ জওয়ানরা দিনের পর দিন যুদ্ধ করছেন সন্ত্রাসবাদীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে, যারা মাওবাদীদের পাতা ল্যান্ড মাইনে প্রাণ দিচ্ছেন দেশের জন্য, তাঁদের জীবনদানকে তাহলে অপমান করা হয়।
সুস্থ বুদ্ধি সম্পন্ন দেশের সাধারণ মানুষকেই বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news