পার্থসারথি পাণ্ডা

পরিচালক-অভিনেতা কামাল হাসান বরাবর সঙ্গীত পরিচালক ইলাইয়ারাজার সঙ্গে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু ব্যস্ত ইলাইয়ারাজা সময় দিতে পারেননি বলে তিনি একবার অন্য এক সঙ্গীত পরিচালককে নিতে বাধ্য হলেন তাঁর ছবিতে। ছবির গান রেকর্ডিং হল, শ্যুটিংও হয়ে গেল। তারপর সিনেমা এডিট হওয়ার পর পুরোটা দেখতে গিয়ে কামালের মনে হল, গানের মেজাজ কিছুতেই সিকোয়েন্সের সঙ্গে যাচ্ছে না। তখন তিনি শরণাপন্ন হলেন তাঁর প্রিয় ইলাইয়ারাজার। তাঁকে নতুন একটা গান বানিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন এবং এও জানালেন যে, গানটা তিনি রি-শ্যুট করবেন। শুনে কি-যেন ভাবলেন ইলাইয়ারাজা। তারপর এডিট করা গানের দৃশ্যটা একবার দেখতে চাইলেন। দেখে কামালকে সটান বলে দিলেন, গানটা রি-শ্যুট করতে হবে না। রি-শ্যুট মানেই তো, আরও বাড়তি কয়েক লাখ টাকার ইনভেস্টমেন্ট। তিনি গানের লিপ, ডান্স স্টেপ, এডিটিং রিদম, লেংথ সবটা মাথায় রেখে একটা আনকোরা গান তৈরি করে দিলেন এবং আশ্চর্যের বিষয়, গানটা এমনভাবে সিকোয়েন্সের সঙ্গে সিঙ্ক করে গেল যে, কেউ বুঝতেই পারল না এক গানের লিপে একেবারেই অন্য একটি গান বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতদিন সিনেমার গান আগে রেকর্ডিং হয়েছে, পরে শ্যুটিং। কিন্তু এবার হল ঠিক উল্টোটা। সিনেমার ইতিহাসে এতকাল যেটা করার সাহস কেউ করেননি, তাই করে দেখিয়েছেন ইলাইয়ারাজা।

তিনি একাধারে সঙ্গীত পরিচালক, গায়ক, বাদ্যযন্ত্রশিল্পী ও গীতিকার। তামিলনাড়ুর পন্নিপুরমে মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ছোটবেলায় তামিল লোকগানের তালিম নিয়েছেন। তারপর ইন্ডিয়ান ও ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যালের তালিম নিয়েছেন। তাই তাঁর সঙ্গীতে ফোক ও ক্লাসিক্যালের আশ্চর্য মেলবন্ধন দেখা যায়। সলিল চৌধুরী তাঁকে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর পরিচালিত সঙ্গীতে ইলাইয়ারাজা বিভিন্ন সময়ে অর্গান, গিটার ও কি-বোর্ড বাজিয়েছেন।

তামিল ছবি ‘আন্নাকিলি’(১৯৭৬)-তে মিউজিক দিয়ে চলচ্চিত্রে এককভাবে তাঁর সঙ্গীত পরিচালনা শুরু। তারপর আজ অব্দি তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড় ও হিন্দিতে ফিল্ম ও বেসিক অ্যালবাম মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ছ’হাজার গানে সুর দিয়েছেন এবং হাজারের ওপর ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করেছেন। পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার।
ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিকে সিম্ফনির যে ঐতিহ্য, সেখানেও রয়েছে ইলাইয়ারাজার প্রতিভার স্বাক্ষর। লন্ডনের বিখ্যাত রেকডিং সংস্থা পিরামিড ইন্টারন্যাশনাল ১৯৯৩ সালে তাঁর কাছে একটি সিম্ফনি রচনার প্রস্তাব নিয়ে আসে। সিম্ফনি রচনা করতে অনেকের দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু ইলাইয়ারাজা মাত্র একমাসেই রচনা করলেন ‘সিম্ফনি ওয়ান’। তারপর লন্ডনের রয়্যাল ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা-র ঠাসা অডিটোরিয়ামে কয়েকশো বাদ্যযন্ত্রী নিয়ে তাঁর সেই সিম্ফনির সুরের জাদু ছড়িয়ে দিলেন। সিম্ফনি শেষ হতেই মুগ্ধ শ্রোতাদের হাততালিতে মুখরিত হল গোটা অডিটোরিয়াম। সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। সেদিন লন্ডনের মাটিতে দেশ তো বটেই, মহাদেশের নামও উজ্জ্বল করলেন ইলাইয়ারাজা। ভারত ও এশিয়ার প্রথম সিম্ফনি রচয়িতা হিসেবে সঙ্গীতের ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিলেন।

সরস্বতীর বরপুত্র সাদামাঠা এই মানুষটি ভারতবাসীর কাছে ‘ইসাইগনানি’ বা ‘মিউজিক্যাল জিনিয়াস’, বিশ্ববাসীর কাছে ‘মায়েস্ত্রো’। এ-বার প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভলগ্নে ভারত সরকার এই গুণী মানুষটিকেই দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ পুরস্কারে সম্মানিত করলেন।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news