দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় 
তৃণমূল কংগ্রেসে মুকুল রায় এখন একটা রহস্যের নাম। এমন রহস্য, যা সম্ভবত সোনার কেল্লাকেও হার মানাবে। সত্যজিৎ-এর সোনার কেল্লার বালক মুকুলকে নিয়ে তৈরি করা একটি ব্যাঙ্গচিত্র ফেসবুকে শেয়ার করে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র। তা নিয়ে সেসময় রাজনৈতিক মহলে জল ঘোলা হয়েছিল বিস্তর। ছবিটি ছিল এরকম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুল রায়কে সোনার কেল্লা দেখাছেন। সোনার কেল্লা বলতে এখানে বুঝতে হবে রেলমন্ত্রক। দীনেশ ত্রিবেদীকে উদ্দেশ্যে করে মুকুল রায় বলছেন ‘দুষ্টু লোক’। তারপর আবার মমতা বলছেন, ‘দুষ্টু লোক ভ্যানিশ’। এটিকে ব্যাঙ্গচিত্র না বলে ব্যাঙ্গাত্বক গ্রাফিক্স বলাই সম্ভবত ভাল। এই ব্যাঙ্গচিত্রটি যখন তৈরি হয়েছিল তখন মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসে অবিসংবাদি নেতা। মমতার পরেই দলে তাঁর গুরুত্ব। শোনা যায় দীনেশের রেলমন্ত্রীর ‘চাকরি’ যতটা না মমতার ইচ্ছেয় হয়েছিল তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল কংগ্রেসের। রাজীব-সনিয়া ঘনিষ্ঠ দীনেশ ত্রিবেদী কংগ্রেসের কাছে চিরকালই প্রিয় পাত্র, একইসঙ্গে রেলমন্ত্রীর পদের জন্য নিঃসন্দেহে যোগ্য ব্যক্তি। তাঁর করা রেল বাজেট এখনও পর্যন্ত ভারতীয় রেলের ইতিহাসে উদাহরণ স্বরূপ। হলে কী হবে! এই বাজেট তিনি যখন পেশ করছেন সংসদে তখনই তাঁর মন্ত্রিত্ব যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে গিয়েছে কালীঘাটে। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুল রায়কে রেলমন্ত্রীর চেয়ারে বসান। অভিজ্ঞ মুকুলও ভালভাবেই মন্ত্রক সামলান। এই ঘটনার পরেই ওই ব্যাঙ্গচিত্রের উদ্ভব অম্বিকেশ কর্তৃক শেয়ার এবং রাজনীতিতে জল ঘোলা। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি সংলগ্ন আদি গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। মুকুল রায় এখন তৃণমূলে ‘দুষ্টু’ কী না তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে তবে তিনি যে ‘মিষ্টি’ নন সে বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কারওর সংশয় নেই। তৃণমূল কংগ্রেসে এখন আর মুকুলের সেই অদৃশ্য সিংহাসনটি নেই। তবে সংগঠনে দক্ষ, স্থিতধী মুকুল রায় এরই মধ্যে নিজের একটা ভিন্ন জায়গা করে নিয়েছেন। মমতা-মুকুল-অভিষেক টানাপড়েন নিয়ে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের শেষ নেই। মুকুলের নিরবিচ্ছিন্ন নীরবতা তাঁকে নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলকে দিয়ে তিনি সেই জল্পনায় আরও হাওয়া দিয়েছেন। মুকুল কী করবেন আর করবেন না এমন হাজারও সম্ভাবনা রাজ্যের রাজনৈতিক বাতাসে তিনি ঘুরপাক খাইয়েছেন। সাম্প্রতিকতম সম্ভাবনাটি হল এই যে, বিজেপি বা নতুন দল নয় এবার রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান মুকুল রায়। প্রত্যাশিতভাবেই প্রশ্ন উঠেছে কেন? মুকুলমহলের যুক্তি ১৯৯৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি তুলেছিলেন, সব পেশার মতো রাজনীতিতেও অবসরের বয়স থাকা দরকার। কোনও রাজনীতিকের ৬০ বছর বয়স অবসরের বয়স হোক এমনটাই ছিল সেসময়ের দাবি। নতুন প্রজন্মকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য মমতা সেইসময় সরব হয়েছিলেন। মুকুলের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৭ই এপ্রিল। অর্থাৎ তাঁর বয়স এখন ৬৩। ফলে নিজেদের তোলা দাবি অনুযায়ী মুকুল অবসরের বয়স পেরিয়েছেন। তাই তিনি যদি অবসর নেন তাহলে ক্ষতি কী! প্রশ্ন তাঁরই ঘনিষ্ঠ মহলে। তবে এত অবধি থেমে থাকলে একরকম ছিল! আর একটু বেড়ে খেলে মুকুলমহল বলছে, মুখ্যমন্ত্রীর জন্ম ৫ই জানুয়ারি, ১৯৫৫। অর্থাৎ তাঁর বয়স এখন ৬২। মুকুল যদি সত্যিই অবসর নিয়ে ৯৭ সালে মানুষকে দেওয়া কথা রাখতে পারেন তাহলে মুখ্যমন্ত্রীই বা কেন অবসরের পথে হেঁটে তাঁর উত্তরসূরিকে চেয়ার ছেড়ে দেবেন না! সরকারে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর মতো নন্দীগ্রামের লড়াকু নেতাকে বেছে নেবেন নাকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ফিরহাদ হাকিমকে নাকি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্য রাজনীতিতে নিয়ে এসে তাঁর চেয়ারে বসাবেন সেটা তাঁর একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত, তবে অবসরের উদাহরণ যদি সত্যিই মুকুল রায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেন তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে এমন ‘ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করতেই পারেন সাধারণ মানুষ।
এমনটা যদি সত্যিই হয় তাহলে, তৃণমূল কংগ্রেসে অবসরের বয়স পেরিয়েছেন সিংহভাগ নেতা-নেত্রী। তাঁরা কী করবেন! বিজেপিতে এর একপ্রকার উদাহরণ আছে। যদিও বয়সসীমা সেখানে ৬০ নয়। তবুও আদবানি, যশবন্ত সিংহ-র মতো বয়ঃজ্যেষ্ঠ নেতাদের মার্গ-দর্শক কমিটিতে পাঠিয়ে বিজেপি দলে নতুন হাওয়া নিয়ে এসেছে।
মুকুল ঘনিষ্ঠদের সাম্প্রতিকতম তত্ত্ব রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই কৌতূহল জাগিয়েছে। এই তত্ত্বে আড়ালে মুকুলেরই অভিসন্ধি দেখছেন তৃণমূলের অনেকে। তবে কী সেই অভিসন্ধি! তা অবশ্য স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউই।
লাইক শেয়ার ও মন্তব্য করুন
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news