পার্থসারথি পাণ্ডাঃ
নিছক একটি ঘরানা তৈরি করে তার মধ্যে নিজেকে বেঁধে ফেলায় বিশ্বাসী নন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত। ঘরানার চেয়ে বাহিরানায় তাঁর আগ্রহ বেশি। একটি সাক্ষাৎকারে কবি নিজেই বলেছেন, ‘আমি বার বার বদলাতে চেয়েছি। পাশ ফিরেছি, চিৎ হয়েছি, উপুড় হয়েছি।’ সেই পাশ-পরিবর্তনের ধারা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপাই কাঠের এস্রাজ’ হয়ে দূর-সাম্প্রতিক ‘ধান খেত থেকে’-এর যাত্রাপথে বার বার কুশলী পাঠকের চোখে পড়ে। অনুসন্ধানী মন আর নির্মাণের অতৃপ্তিই কবির এই ধারাপথের অমূল্য সম্পদ। কারণ, নির্মাণের স্থায়ী তৃপ্তি, কবিকে স্থাণু করে দেয়, ঘরানায় বেঁধে দেয়, শৈলীর বেড়ি পরায়, প্রবাদময় উচ্চারণের দিকে প্রলুব্ধ করে। সেদিক থেকে মৃদুল এক মুক্ত কবি। আকাশ থেকে ঝরে পড়া উল্কা খণ্ডের মতো, ঝরে পড়া তারার পাপড়ির মতো উজ্জ্বল পেলব ও রুদ্র পঙক্তিমালা নেমে আসে তাঁর পারিপার্শ্বে, ধাতার মতো তিনি তাদের সাজিয়ে দেন কবিতার অঙ্গে। শুধু তাঁর অমোঘ এক আকর্ষণ থেকে যায় অক্ষরবৃত্তের প্রতি, তার মধ্যে থাকে কবিতাকে নিরমেদ অবয়বে দেখার বাসনা।

ঠাকুমা ও বড় ঠাকুমার কন্ঠে মনসামঙ্গলের ধ্রুপদী পয়ারের সুর তাঁর মনে দোলা দিয়েছিল বাল্যেই। অক্ষরবৃত্তের সেই লিরিক্যাল শরীর ছেঁচেই তখন তাঁর কবিতা রচনার শুরু। মনসা আর চাঁদের দ্বান্দ্বিক দর্শনও কি তাঁর মনে জাগিয়েছিল প্রশ্ন, তখন? তাই কি সত্তরের সূর্য আর বজ্রময় দিনে যখন নকশালী ধানের ক্ষেতে ঢেউ উঠেছিল, তরুণেরা অন্ধকারে যখন গুম হচ্ছিল, নির্বিচারে রক্ত ঝরছিল, তখন তাঁর গেরিলা কলম সোচ্চারে উচ্চারণ করেছিল,–
‘আমার ভাইকে তুমি লুকোলে কোথায় বলো, বলো, বলো—
ফণাটনা উঁচিও না আর, ঢোঁড়া সাপকে মানায় না হে, তাছাড়া
আমি বাখরগঞ্জ, গৈলাগ্রামের, আমার পূর্বপুরুষ স্বপ্নাদেশে
লিখেছিলেন মনসামঙ্গল,
গরল আমি ডরাই না হে
বিষে আমি ভয় পাই না
আমি মৃদুল দাশগুপ্ত, আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি’
(‘মুক্ত মানুষের পদ্য’ কবিতা)
সত্তরের দশককে মুক্তির দশক বলে, তার জয়গান গেয়েছেন অনেকেই। অনেকেই লিখেছেন তার চিত্ররূপময় প্রতিবেদন। তাতে কিছু সমবেদনা ছিল, ছিল কিছু ধিক্কার। কিন্তু বুক ঠুকে এমনভাবে বিপ্লবীদের দলে নিজেকে সামিল করতে পেরেছেন ক’জন? উত্থানপর্ব পেরিয়ে ভাঙা পথে সেই বিপ্লব কোন দিকে গিয়েছিল কালের স্রোতে আজ সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা ছিল একটা স্বপ্নের। মৃদুল সেই স্বপ্নের আঙিনায় দুই পা শক্ত করে দুই মুঠি শক্ত করে দাঁড়িয়েছিলেন। একদিন পরাধীন দেশের বিপ্লবীদের ‘বিদ্রোহী’ মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’(১৯২২), আর স্বাধীন দেশে অসাম্যের আগল ভাঙার গানে মৃদুল শুনিয়েছিলেন ‘জলপাই কাঠের এস্রাজ’(১৯৮০)।

তবে, সময়ের ঘ্রানে স্বপ্নেরও কিছু ক্ষয় হয়। সাংবাদিকতার সূত্রে কবি নিয়ত ঘটনার নিকটে গিয়ে ঘটমান সময়কে দেখেছেন, প্রান্তিক জীবনের কাছাকাছি পৌঁছেছেন, ফলে তাঁর কবিতার দেহে সততার সঙ্গে সেই সময়ের স্বপ্নভঙ্গ আর ভাঙা সমাজের ছাপও তিনি নির্মমভাবে রেখেছেন। কিন্তু নির্লিপ্তভাবে নয়। তাই ‘১৯৭৪’ কবিতায় বলেছেন—
‘না দিন না রাত, থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে কবি ভাবছে
এখনই উঠবে চাঁদ সূর্য যা হোক একটা কিছু
কিন্তু কোন দিকে?’
কাব্যজীবনে নিজের অবস্থান ঘোষণায় তাঁর কোন দ্বিধা ছিল না কোনদিন। আজও নেই। তাই তিনি কোন ধূসর অবস্থানের অনুসন্ধান করেন না। গ্রামীণ জীবনের সুদীর্ঘ সঙ্গ তাঁকে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ আর অধিগ্রহণের পন্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার করেছিল। তিনি তখনও শুনিয়েছিলেন, দশক পুরনো ‘জলপাই কাঠের এস্রাজের’ সেই সুতীব্র সুর। বলেছিলেন,–
‘সেই যুগ যদি এই যুগে আসে
গ্রামগুলি কাঁপে খাঁকি সন্ত্রাসে
ঘোরতর সেই সর্বনাশে
কৃষিজমি যায় নগরের গ্রাসে
আমি বলবোই—সেটা অন্যায়।’
(‘বর্গি হানা ২০০৬’-কবিতা)
কিম্বা, ‘ক্রন্দনরতা জননীর পাশে’ কবিতায়—
‘নিহত ভাইয়ের শবদেহ দেখে
যদি না-ই হয় ক্রোধ
কেন ভালোবাসা, কেন বা সমাজ
কিসের মূল্যবোধ!’
এই যে তীব্র শ্লেষ আর প্রতিবাদ, এও কিন্তু জাগিয়ে তোলার মন্ত্র। সেই মন্ত্রে জেগে ওঠে মুহূর্তেই ‘তিনশো তরুণ’। তাদের মাঝে থেকে কবি জানেন চুক্তি অথবা সমঝোতায় না-পাওয়া/আধ-পাওয়ার খাপছাড়া পথে সব লড়াই একদিন শেষ হয়ে যায়, তখন, ‘তুমিও মরবে, আমাদের কথা ভুলে যাবে এই দেশটি।’ তবু, মানবতার অস্তিত্ব রক্ষায় সমতার দ্বান্দ্বিক দর্শনে সংগ্রাম জারি রাখতে হয়। প্রতিবাদী সত্তাটিকে জিইয়ে রাখতে হয়। কবিতায় এই যে মোক্ষম প্রতিবাদী উচ্চারণ, এও আসলে মৃদুলের কবি সত্তার বহুমুখীনতা আর মানবতার দায়বদ্ধতার একটি দিক। তাঁর কাব্যের অন্তর্লীন ধারা আসলে বহুধা বিস্তৃত, ব্যাপক গভীর। কবিতা থেকে কবিতায় তা প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলেছে আরও মিতকথনের দিকে, চাইছে কুশলী পাঠকের সুগভীর অনুধ্যান। তাই এই বক্ষ্যমান খন্ডদর্শনের পথ পেরিয়ে তাঁকে ছুঁতে গেলে চাই আরও কিছু সাধনার অবসর। সেই সাধনার সূত্র তিনিই দিয়েছেন, ‘আমার কবিতার বই’ নামের কবিতায়—
‘ভাঙা অক্ষর, হরফের খাঁজে
আঁশ।
অশুচিপত্রে নরকের ডাকছাপ।
বোবা ও বধির।
কালো ফুল মুখে ডানা মেলে দেওয়া
সাপ।
স্বাধীন, অসুন্দর।’
সেই সূদুর ছয়ের দশকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ‘তারুণ্যের স্পর্ধা’র দীক্ষা পেয়েছিলেন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত। সেই স্পর্ধায় শান দিয়ে গত ৩ এপ্রিল তিনি তেষট্টি পূর্ণ করে চৌষট্টির তারুণ্যে পা রেখেছেন। একটু দেরি হলেও, কবিকে আমরা জানাই জন্মদিনোত্তর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা…
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news