সুমন ভট্টাচার্য :
জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার পরে কি শচীন পাইলট এবং শশী থারুর?
যদি তাই হয়, তাহলে সেটা বিশ্ব অর্থনীতির এই মন্দার বাজারে বিজেপির জন্য বা বলা ভালো নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য বোনাস। আর কংগ্রেসের জন্য করনা ভাইরাসের থেকেও সাংঘাতিক, ‘ধরোনা’ ভাইরাস। যে ভাইরাস কংগ্রেস নেতৃত্বকে কোনও সমস্যাকেই ধরতে দেয় না, বরং সবকিছু থেকেই এক নিরাপদ দূরত্বে রেখে দেয়।
অর্থনীতির বেহাল দশা, দিল্লির দাঙ্গা যখন নরেন্দ্র মোদির সরকারকে গভীর অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল, ঠিক তখনই জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার দলত্যাগ যেন গেরুয়া শিবিরের কাছে একঝলক সু-বাতাস। মধ্যপ্রদেশে কমলনাথের সরকার বাঁচবে কি মরবে, তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে কংগ্রেস হাইকমান্ড কেন সিন্ধিয়া, পাইলট, থারুরদের মন বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে, যেখানে এই তরুন নেতারাই একের পর এক নির্বাচনে কংগ্রেসকে জিতিয়েছে, এমনকি ঝাড়খন্ডেও তরুন হেমন্ত সোরেন বিজেপি বিরোধী সরকারকে মসনদে নিয়ে এসেছে সেখানে কংগ্রেসে কেন এখনও বৃদ্ধতন্ত্রের জয়!
আমাদের মনে রাখতে হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ-র সঙ্গে দেখা করে দল ছাড়ার আগে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া সোমবার সন্ধায় যার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তিনি রাজস্থানে কংগ্রেসের বিক্ষুদ্ধ নেতা শচীন পাইলট। রাজস্থানে দলকে জিতিয়ে এনেও যাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে প্রবীন অশোক গেহলটকে। সিন্ধিয়ার পরে যদি শচীন পাইলটও কংগ্রেস ছাড়ার পথে হাঁটেন, তাহলে দলের তথাকথিত তরুন তূর্কিরা আর কেউই ‘হাত’-এর সঙ্গে থাকছেন না, এটাই ধরে নিতে হবে।
জন্মদিনে শশী থারুরকে মালয়ালিতে চিঠি লিখে এবং প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রীর দেশ সেবার প্রশংসা করে নরেন্দ্র মোদি পরিষ্কার করে দিয়েছেন তিনি কাদের কাছে টানতে চান এবং কেন টানতে চান। শশী থারুর শুধু কংগ্রেস সভাপতি পদে বসার দৌড়ে ছিলেন না, লোকসভাতে কংগ্রেসের দলনেতাও হতে চেয়েছিলেন। ১০ নং জনপথ তাঁকে কোনকিছুই দেয়নি। স্বভাবতই ক্ষুদ্ধ বিরক্ত থারুর কংগ্রেসে আছেন বটে, কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে যথেষ্ঠই বেসুরোয় বাজেন। ঠিক যেমন বিভিন্ন ইস্যুতে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া কংগ্রেসের ঘোষিত লাইনের বিরোধিতা করেছিলেন। যেমন বালাকোটের বিমান হানা বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কিরকম হবে তাই নিয়ে সিন্ধিয়ার বক্তব্য ১০ নং জনপথের সঙ্গে মেলেনি।
জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার কংগ্রেসত্যাগ বা শশী থারুরকে নরেন্দ্র মোদির নিজের চিঠি লেখা যদি কংগ্রেসের জন্য অশনি সংকেত হয়, তবে নরেন্দ্র মোদি কি চাইছেন তারও একটা ইঙ্গিত আমরা পেয়ে যেতে পারি। আমরা ধরে নিতেই পারি, কপিল মিশ্র কিংবা গিরিরাজ সিংহ নন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভা সাজাতে চান সিন্ধিয়া কিংবা থারুরের মতো শিক্ষিত, অসাম্প্রদায়িক, শুধুমাত্র হিন্দুত্বে নিজেদের বেঁধে না রেখে জাতীয়তাবাদী পরিচয় স্বচ্ছন্দ এমনতর তরুন ঝকঝকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চরিত্রদের দিয়ে।
মধ্যপ্রদেশে সিন্ধিয়া, রাজস্থানে শচীন পাইলট বা কেরালায় শশী থারুর তো এই ধরনের রাজনীতিবিদদের দিকেই ইঙ্গিত করে। মাথায় রাখবেন এরা কেউ নিজেদের হিন্দু পরিচয় নিয়ে কুন্ঠিত নয়, কিন্তু মুসলিমদের সঙ্গে সহাবস্থানের তত্ত্বেও বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ যে ধরনের নেতাদের জন্য নরেন্দ্র মোদিকে মাঝেমাঝেই বিব্রত হতে হয়, সিন্ধিয়া বা থারুর সেই গোত্রে পড়েন না, অথচ একইসঙ্গে সিন্ধিয়া বা থারুর প্রবলভাবে নিজেদের জাতীয়তাবাদী বা নতুন প্রজন্মের ভারতীয় নেতা হিসাবে প্রমাণ করতে তৎপর। হয়তো নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি নিজেকে শুধু হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের নেতার তকমা থেকে বার করে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে নতুন ধারার সূচনা করতে চাইছেন, তাতে সিন্ধিয়ারা যোগ্য সঙ্গত দেবেন।
আসাম, গোয়া, কর্ণাটক থেকে হালফিলের মধ্যপ্রদেশ : যদি বিজেপির কৌশলকে শুধু দলভাঙানোর খেলা হিসাবে না দেখে ‘ট্যালেন্টহান্ট’ বা প্রতিভার অন্বেষণ হিসাবে মনে করেন, তাহলে সিন্ধিয়ারা কেন ‘অ্যাসেট’, সেটা আমরা বুঝতে পারবো। এবং সেই বিশ্লেষনের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও অনেককিছু অপেক্ষা করে থাকবে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news