সুমন ভট্টাচার্য:

ইতিহাস কখনও নাকি পিছু ছাড়ে না!
শনিবার ভারতীয় জনতা পার্টির যুব মোর্চার সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে কামান দাগা বহর দেখে ইতিহাসের কথাই মনে পড়ে গেল। বিজেপি যুব শাখার এই রাজনৈতিক সমাবেশে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের পরে যদি কোনও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা থেকে থাকেন, তাহলে তিনি যুব মোর্চার সর্বভারতীয় সভানেত্রী পুনম মহাজন। প্রমোদ মহাজনের কন্যা, বর্তমানে মহারাষ্ট্র থেকে দলের সাংসদ। পুনম যখন শানিত বাক্যবাণে তৃণমূলকে বিঁধছিলেন, তখন রাজ্যের শাসক দলের কারও কি মনে পড়ছিল প্রমোদ মহাজনের কথা? তৃণমূল যখন এনডিএ-র শরিক, তখন প্রমোদ মহাজনই বিজেপির হয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এবং অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও।
ঠিক কুড়ি বছর আগে, তৃণমূলের ডাকা ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর তরফে প্রধান বক্তা ছিলেন ওই প্রমোদ মহাজন-ই। ব্রিগেডের উপছানো ভিড়ে সেদিন প্রমোদ মহাজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তৃণমূলের চাহিদা অনুযায়ী ‘বেঙ্গল প্যাকেজ’ কে বাস্তবায়িত করবে বাজপেয়ীর সরকার। আসলে তখন বেঙ্গল প্যাকেজ নিয়ে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন চলছিল। তৃণমূল মনে করছিল, বাজপেয়ী সরকার ‘বেঙ্গল প্যাকেজ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না দিলে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের পায়ের তলার জমি কেড়ে নেওয়া যাবে না। এই নিয়ে দু’পক্ষের স্নায়ুর লড়াইয়ের মধ্যেই তৃণমূলের তরফে ব্রিগেড সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছিলেন, বাজপেয়ী সরকারের কোনও হেভিওয়েট নেতা এসে ব্রিগেডে দাঁড়িয়ে বেঙ্গল প্যাকেজ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করুক।
প্রমোদ তখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা, কিন্তু শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত রূপায়নে প্রধান ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’। সেই অনুযায়ী ঠিক হয়, প্রমোদই আসবেন তৃণমূলের ব্রিগেড সমাবেশে। কিন্তু তৃণমূল নেত্রীর দাবি ছিল, ব্রিগেডের আগের দিনই এসে প্রমোদ মহাজনকে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। ব্রিগেডের আগের দিন গভীর রাতে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি প্রমোদ মহাজন আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে। কালীঘাটের বাড়িতে হওয়া সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কথা এখনও আমার মনে আছে। পরের দিন তুখর বক্তা প্রমোদই ব্রিগেডে জনতার হাততালি কুড়িয়ে নেন একের পর এক প্রতিশ্রুতির কথা ঘোষণা করে। মনে রাখবেন, কংগ্রেসের তরফে যেমন প্রয়াত প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, তেমনই বিজেপির হয়েও চিরকাল কঠিন সময়ে বক্তৃতা দেওয়ার ভার পড়তো প্রমোদ মহাজনের কাঁধে। এমনকি রাম মন্দির ইস্যুতে যেদিন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের সরকারের ওপর থেকে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছিল, সে দিনও লোকসভায় দলের তরফে মুখ্য বক্তা ছিলেন মহারাষ্ট্রের এই কুশলী নেতা।
শনিবার যখন সেই কলকাতায় প্রমোদের কন্যা পুনম মহাজন বিজেপির যুব মোর্চার হয়ে উল্টো ভূমিকায় ছিলেন, অর্থাৎ তৃণমূলের পক্ষে নয়, বিপক্ষে ব্যাট করতে নেমে ছিলেন, তখন কারও কি প্রমোদ মহাজনের কথা মনে পড়েছিল? মনে পড়েছিল তৃণমূলের সেই ঐতিহাসিক ব্রিগেডে পুনমের বাবার দেওয়া দুরন্ত বক্তৃতার কথা? কলকাতায় আসার আগে দিল্লিতে পুনম মহাজন নাকি ঘনিষ্ঠ মহলে ‘বিস সাল পহলে’ দেওয়া বাবার বক্তৃতার স্মৃতি রোমন্থন করে এসেছেন। এবং বলেছেন, তার বাবা তৃণমূলের শুরুর দিকে এবং তৃণমূলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে সাহায্য করেছিলেন, সেই ‘ঋণ’ শোধ করতেই এবার কলকাতায় যুব মোর্চার সভানেত্রী হিসেবে আক্রমণ শানাবেন তিনি।
আর এক জনেরও হয়তো ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ ইতিহাসের এই আশ্চর্য সমাপতনকে মনে আছে। কুড়ি বছর আগে তিনিই তো এয়ারপোর্ট থেকে প্রমোদ মহাজনকে কালীঘাটের বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। বাবার পরিবর্তে মেয়ে, আজও পুনম মহাজনের সভার জন্য যদি কেউ জান লড়িয়ে দিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি মঞ্চে থাকা মুকুল রায়। সেদিন তৃণমূলের ব্রিগেড সমাবেশেও মমতা-মহাজন যুগলবন্দিতে তিনি সঙ্গত করেছিলেন, শনিবারও মমতা-মহাজন দ্বৈরথে তিনি ঐতিহাসিক ভাবে উপস্থিত।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news