সঞ্জয় সরকার :
পঞ্চায়েত নির্বাচন সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রীম কোর্টের বক্তব্য শুনে মুখ্যমন্ত্রীর মুখে হাসি ফুটেছিল। পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করতে গিয়ে প্রায় সারা রাজ্য থেকে নিজ দলের যে প্রকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খবর আসছে তাতে সোমবারের বিকেলে দৃশ্যতই বিষন্ন মমতা।
একটু ফ্ল্যাসব্যাকে যাওয়া যাক…
শুরু হয়েছিল পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্ব থেকে। সেই সময় প্রায় মাস দুয়েক ধরে সারা রাজ্য জুড়ে বিরোধীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া এবং সেই সূত্রেই গণ্ডগোল হয়েছিল গোটা রাজ্যে। সরকারি দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধীদের বেশ কয়েকজন কর্মী সমর্থককে খুন হতে হয় এই মনোনয়ন পর্বেই। শুধু মনোনয়ন পর্ব কেন, খুনোখুনি জারি ছিল নির্বাচনের দিন গুলিতেও। নির্বাচন মিটে যাওয়ার পর আপাত শান্ত হয় রাজ্য। মাঝখানে মাস তিনেকের বিরতি। পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতেই আবার শুরু হয়েছে রাজ্যে খুনোখুনির রাজনীতি। তবে এবার একটা অন্য বিষয় দেখা যাচ্ছে এই খুনোখুনির রাজনীতিতে। পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করা নিয়ে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই কমবেশি গন্ডগোলের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর এই গণ্ডগোলের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ শাসক ও বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়। বরং এই গণ্ডগোল তৃণমূল বনাম তৃণমূল। তৃণমূলের বোমা ও গুলির আঘাতে আহত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন তৃণমূলেরই অন্য গোষ্ঠীর কর্মী-সমর্থকরা। যদু বংশের মতো মরণ খেলায় নেমেছে কোচবিহার থেকে মালদা, নদীয়া থেকে পুরুলিয়া জেলার তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা। শুধু সোমবার দিন রাজ্যের দুই জেলায় এই ক্ষমতা দখলের রাজনীতির বলি হলেন ৩ জন। যার মধ্যে পুরুলিয়ায় মৃত একজনকে নিজেদের দলীয় কর্মী বলে দাবি করলেন বিজেপি নেতৃত্ব। তবে নিরঙ্কুশ ভাবে জেলা পরিষদের ক্ষমতা দখল করার পরেও শুধুমাত্র পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করতে গিয়ে যেভাবে একের পর এক জায়গা থেকে গণ্ডগোলের খবর আসছে তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নিয়ে নিজের ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন তিনি।
এত রক্ত ঝরানো, এত কাঠ খড় পোড়ানো পঞ্চায়েত, অনুব্রতর ভাষ্য আর শঙ্খ ঘোষের কবিতার পঞ্চায়েত, শীর্ষ আদালত ঘুরে আসা পঞ্চায়েতে তৃণমূলের তরী কী তীরে এসে ডুবতে বসেছে! শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ডুবে না যাক কাদায় যে আটকেছে তা বলে দিল সোমবার বিকেলের মুখ্যমন্ত্রীর শরীরী ভাষা। সোমবার নবান্ন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অপেক্ষমান সাংবাদিকদের সামনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় জানান, “পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন হবে এটাতো স্বাভাবিক, তবে একটা বোর্ড গঠনের জন্য এত প্রতিযোগিতার কি আছে? যে ঘটনা ঘটছে তা দুঃখের। যে দলের লোক মারা যাক না কেন আমি সেটাকে সমর্থন করি না। আমি সবাইকে শান্তি বজায় রাখতে অনুরোধ করছি।”
দলের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠে গেছে রাজ্য জোড়া এমন গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেহাতই স্বাভাবিক ঘটনা নাকি বিরোধী কোনও নেতার গেমপ্ল্যানের ফল! অভিষেকের দায়িত্বে থাকা ঝাড়গ্রাম কিংবা শুভেন্দুর দায়িত্বে থাকা পশ্চিম মেদিনীপুর কোথাও স্বস্তিতে নেই তৃণমূল। অশনি সংকেত নদিয়া-মালদা সহ আরও বহু জেলায়। কোথাও বোর্ড গঠন করে ফেলছে বিজেপি, কোথাও আবার বিজেপির সমর্থনে প্রধান হয়ে বসছেন তৃণমূলেরই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর নেতা। রাজ্য জুড়ে বিক্ষুব্ধ এই গোষ্ঠী কী কারও অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে সংগঠিত হচ্ছে! এই সংশয় আপাতত তৃণমূলের অন্দরেই।
এমন সংশয় মমতাও যে করছেন না তা নিশ্চিতভাবে কে বলতে পারে!
যদি তাই হয় তাহলে কে সেই মেঘনাদ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য কোনও পুরস্কার নেই তৃণমূলে! তৃণমূল যখন আড় চোখে দেখছে মুকুল রায়কে, মুকুল তখন বাজপেয়ীর স্মরণে হুগলিতে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের ঘটনার পিছনেও বাইরের রাজ্যের দুষ্কৃতীদের হাত দেখছেন বা দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গের সীমানা লাগোয়া বেশ কিছু জায়গায় বাইরে থেকে লোক এসে এই গণ্ডগোল করছে।” উদাহরন স্বরূপ মুখ্যমন্ত্রী কোচবিহার, মালদহ ও মেদিনীপুরের কথা বলেন। বাইরের রাজ্য থেকে দুষ্কৃতীরা এরাজ্যে আসছে, গণ্ডগোল করছে, আবার চলেও যাচ্ছে!
তাহলে এ রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন করছেটা কী! অবশ্য রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী নিজের দলের গণ্ডগোলের রাশ টানতে পারছেন না তাই বাইরের রাজ্যের দুষ্কৃতীদের কথা বলে নিজের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে পাশ কাটাচ্ছেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news