চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো ।
বলিউডের বাদশা শাহরুখ খানকে (Shahrukh Khan) পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। এমনকি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দ্বারা আয়োজিত ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনও করেন কিং খান। এবার তাঁর জনপ্রিয় সিনেমার নামেই দিদির প্রচার কৌশল সাজিয়েছেন ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোর। বৃহস্পতিবার চমকে দেওয়া পোস্টার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। পোস্টারে দেখা যাচ্ছে, আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সামনে রয়েছে জনতা। আর সেই পোস্টারের মাথার উপর লেখা ‘ম্যায় হুঁ না।’ শাহরুখ পত্নী গৌরী খান প্রযোজিত ছবি ‘ম্যায় হুঁ না’ মুক্তি পেয়েছিল ২০০৪ সালে। সেই ছবিতে শাহরুখ অভিনয় করেছিলেন মেজর রাম প্রসাদ শর্মার ভূমিকায়। ভারত ও পাকিস্তানের সন্ত্রাবাদীদের যৌথ প্রচেষ্টায় ভেস্তে যেতে বসেছিল দু’দেশের বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার প্রকল্প ‘প্রজেক্ট মিলাপ’। নাশকতার সেই ছক ভেস্তে দিয়েছিলেন মেজর রামরুপী শাহরুখ!

২০২১ সালের সাধারণ বিধানসভার নির্বাচনে শাহরুখ খানের মতোই তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যুদ্ধ জয়ের সংকল্প ভরে দিতে দিদিই যে তাঁর একমাত্র অস্ত্র তা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝে গিয়েছেন প্রশান্ত কিশোর। আর যেই কারনে প্রথমে ‘দিদিকে বলো’ ও ‘বাংলার গর্ব মমতা’ প্রকল্প নিয়ে বাংলার ভোট বাজারে নিজের ইনিংস শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও আমফান ঘুর্ণিঝড়, এই দুই উদ্যোগকে ধূলোয় মিশেছে। এমতাবস্থায় দিদির ‘পরিযায়ী সহোদর’ শাহরুখ খানের ছবির থেকেই নাম ধার করে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আবারও তৃণমূলের কর্মীমহলে ঝাঁকুনি দিতে চেয়েছেন পিকে স্যার। কিন্তু, হিন্দু ভোটদাতাদের মন পেতে এখানে হিন্দি স্লোগান কেন? এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। কারণ, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা স্লোগান তুলেছেন ‘জয় বাংলা’। বাঙালি ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়েই আপাতত গেরুয়া শিবিরের মোকাবিলা করতে চাইছেন তিনি। এমতাবস্থায় ফের হিন্দী স্লোগানে নির্ভরতা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংসদ ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যতই নিজেকে ব্র্যান্ডিংয়ের মোড়কে নতুন প্রজন্মের নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন না কেন, তৃণমূলের আসল পুঁজি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি, তা ইতিমধ্যে টের পেয়েছেন পিকে। তাই তিনি বারংবার চেষ্টা করে চলেছেন যাতে যে কোনওভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তিকেই নতুন মোড়কে পেশ করে একুশের ভোটে বাজিমাৎ করা যায়। তাই এই ‘ম্যায় হুঁ না’ (Main Hoon Naa) স্লোগান রাজ্য রাজনীতির বাজারে ছাড়া হয়েছে। কারণ, তৃণমূলকে ক্ষমতায় ফেরানোর অন্য কোনও উপায় পিকে স্যারের মস্তিষ্কে স্থান পায়নি। এ প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এক মুখপাত্র বলেছেন, “তৃণমূল কংগ্রেসে যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নামে ভোট হয় এটা জানতে গেলে প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishore) হতে লাগে না। ১৯৯৮ সাল থেকেছিলেন এখনও পর্যন্ত যতগুলো ভোটে জোড়া ফুল প্রতীক নিয়ে প্রার্থীরা দাঁড়িয়েছেন সবাই তাঁর নামে ভোট চেয়েছেন, তাঁর নামেই ভোট চাইবেন। এর জন্য কোনও পৃথক স্লোগান বা কর্পোরেট কর্মসূচির প্রয়োজন হয় না।”
প্রসঙ্গত, তৃণমূলের এই মুখপাত্রের কথা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ২০১১ সালে মমতা নিজেকে সামগ্রিক সিপিএম বিরোধিতার (বাম নয়, সিপিএম ) সমাবেশ বিন্দুতে পরিণত করেছিলেন আর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনসমক্ষে এই বলে ভোট চেয়েছিলেন যে, “২৯৪টি কেন্দ্রেই প্রার্থী আমি। আমাকে দেখে ভোট দিন।”

২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের সময় যখন নারদা কেলেঙ্কারি সামনে আসে, বেজায় অস্বস্তিতে পড়েছিল রাজ্যের শাসক দল। কারণ, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শোভন চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, শুভেন্দু অধিকারীদের মতো প্রার্থীদের টিভি চ্যানেলগুলিতে হাতেনাতে টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল। এরপরেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই সমস্ত কেন্দ্রেও নিজের নামেই ভোট চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষ ভরসা রেখেছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরেই। তাই এই সমস্ত অভিজ্ঞতার দিকে তাকিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখেই ‘ম্যায় হুঁ না’ স্লোগান দিয়ে ভোট বৈতরণী পারের চেষ্টা করছেন এই ভোট কৌশলী।

কিন্তু একুশের ভোটে ২০১১ ও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা নামের ব্র্যান্ড ভ্যালুর সুফল পেয়েছে তৃণমূল। কিন্তু, বর্তমানে তৃণমূল সুপ্রিমো নামের ব্র্যান্ড ভ্যালু কি আর আগের মত আছে? ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের খারাপ ফলাফল দেখে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, যে সমস্ত লোকসভা আসন গুলোতে তৃণমূল নেত্রী তুলনামূলকভাবে বেশি সময় দিয়েছেন, সেখানেই তাঁর প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন লক্ষাধিক ভোটে। তাই এমন ফলাফলের পর পিকে স্যারের মমতা নির্ভর ‘ম্যায় হুঁ না’ স্লোগান কতটা কার্যকরী হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। এ প্রসঙ্গে ওই তৃণমূল মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা ভোট পাই দিদির নামে। এটা জানতে অতি বড় রাজনীতিক না হলেও চলে। কিন্তু, দলের একাংশ দুর্নীতি ও দাদাগিরি করায় এখন ভাড়াটে লোকজন আনতে হচ্ছে। আর এইসব মুখরোচক স্লোগান তৈরি করে কয়েক শো কোটি টাকা লুঠ করে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন প্রশান্ত কিশোর।”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news