পার্থসারথি পাণ্ডা :
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে খুব স্নেহ করতেন বারদীর ব্রহ্মচারী সাধক লোকনাথ। ডাকতেন জীবনকৃষ্ণ বলে।
বিজয়কৃষ্ণ তখন দ্বারভাঙ্গায়। গুরুতর অসুস্থ। কোবরেজ, সাহেব ডাক্তার সবাই এসে জবাব দিয়ে গেছে। আর কিচ্ছু করার নেই। একে একে সমস্ত অর্গান ফেল করতে শুরু করেছে, এখন তখন অবস্থা। শয্যায় শুয়ে বিজয়কৃষ্ণ, বেহুঁশ। চারিদিকে বসে আছেন করুণ মুখে শিষ্যের দল। জীবনের এই শেষ সময়টায় কেউ তাঁর পদসেবা করছেন, কেউ তাঁকে বাতাস করছেন। দেশের সমস্ত আশ্রমে টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে গুরুদেব বিজয়কৃষ্ণের শেষ অবস্থার কথা।
ঢাকার আশ্রমের দায়িত্ব ছিল বিজয়কৃষ্ণের প্রিয় শিষ্য শ্যামাচরণের ওপর। তিনি এই মর্মান্তিক টেলিগ্রাম পেয়ে একেবারে দিশাহারা হয়ে উঠলেন। কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারলেন না! দ্বারভাঙ্গা তো অনেক দূরের পথ, গুরুর জীবনসংকটের মুহূর্তে কোন কাজেই কি তিনি লাগবেন না! হঠাৎ তাঁর মনে এলো বারদীর বাবা লোকনাথের কথা। তিনি তো সাক্ষাৎ শিব, চাইলে তিনি সব পারেন। ঢাকা থেকে এসে পৌঁছলেন বারদীর আশ্রমে। পায়ে এসে পড়লেন বাবা লোকনাথের। হাতজোড় করে বললেন, বাবা, আমি জানি আপনি চাইলে সব পারেন, আমার গুরু বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর জীবন বড় সংকটে প্রভু, আপনি তাঁকে জীবন দান করুন। দয়া করুন বাবা।
লোকনাথ বললেন, তিনি যেমন তোমার গুরু, তেমনি সে আমারও বড় স্নেহের পাত্র, ভালোবাসার সাধক। তার অন্তিম সময়ে তোমার যেমন অন্তরে কষ্ট হচ্ছে, আমারও হচ্ছে। কিন্তু বাপু, বিধির বিধানে তার যাবার সময় হয়েছে, তাকে যেতে দাও, সময় হলে যেমন গাছের পাতা খসে যায়, এই জীবনও তেমনি, শরীরও তেমনি…তার আয়ু যে শেষ হয়েছে…
শ্যামাচরণ লোকনাথের পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তাহলে আমার আয়ু দিয়ে আমার গুরুর আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দিন প্রভু, গুরুর চরণে যদি এই অকিঞ্চিৎকর জীবন না অর্পণ করতে পারি, তাহলে এই জীবনের আর প্রয়োজন কি প্রভু! গুরুর চরণ ছাড়া আর তো কিছুই জানিনা…
শ্যামাচরণের কথায় লোকনাথ একদিকে যেমন চমকিত হলেন, তেমনি আনন্দিতও হলেন। ধন্য বিজয়কৃষ্ণ, ধন্য তাঁর গুরুপদ। কলিযুগেও তিনি পেয়েছেন অরণি, আয়োধৌম্যের মতো শিষ্য। ধন্য ধন্য। বললেন, আমি বড় খুশি হয়েছি তোমার গুরুভক্তি দেখে। বেশ, তুমি ঢাকায় ফিরে যাও, শিগগির পাবে সুসংবাদ…
শ্যমাচরণকে আশ্রমে পাঠিয়ে সুক্ষ্ম দেহে লোকনাথ তক্ষুনি হাজির হলেন দ্বারভাঙ্গায়। বিজয়কৃষ্ণের শয্যার ঠিক পাশটিতে। ডাক দিলেন, জীবন! জীবন! উঠে বস, আমি এসেছি!
সুপ্তির অসংখ্য স্তর পেরিয়ে যেন জেগে উঠলেন বিজয়কৃষ্ণ। বিছানায় উঠে বসলেন। চোখে তবুও যেন একটা কীসের ঘোর। সামনে দেখলেন এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। তাঁকে বললেন, তুমি এসেছ? প্রণাম হে বরেণ্য ব্রহ্মচারী!
ভক্ত শিষ্যরা অবাক হয়ে গেলেন। দেখলেন কোন এক অলৌকিক কারণে গুরুদেব সুস্থ হয়ে উঠেছেন। দেব-প্রেরিত কারও সঙ্গে যেন কথা বলছেন, কিন্তু সেই দেবদূতকে দেখা যাচ্ছে না…তবু এই অলৌকিক সাক্ষাৎকারের সাক্ষী থাকলেন সবাই। লোকনাথ বিজয়কে বললেন, এই তো তুই ভালো হয়ে গেছিস জীবন, আশীর্বাদ করি শ্যামাচরণের মতো শিষ্যরা তোর কাছে দীক্ষা নিক, সঠিক শিক্ষার পথ খুঁজে পাক…তুই দীর্ঘজীবী হ…
বলেই বিজয়কৃষ্ণকে একবার বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে অন্তরের আশিষ দিয়ে লোকনাথ যেন হাওয়ায় বিলীন হয়ে গেলেন। তখন যেন বাহ্যজ্ঞান ফিরে পেলেন বিজয়কৃষ্ণ। ভক্তেরা গুরুকে সুস্থ দেহে ফিরে পেয়ে আনন্দে বিহ্বল হয়ে উঠলেন। তাঁদের আনন্দের মাঝে বিজয়কৃষ্ণ করজোড় কপালে ঠেকিয়ে বললেন, জয় বাবা পরমপুরুষ শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জয়…
আজ, ৩ সেপ্টেম্বর, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মহান আবির্ভাবের দিন…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news