পার্থসারথি পাণ্ডা:
কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে খাপরার চালের দুই চিলতে ঘর। ঘরের একদিকে বিনোদিনীর দিদিমা থাকতেন, অন্যদিকটা ভাড়া দিয়েছিলেন সেকালের থিয়েটার অভিনেত্রী গঙ্গামণি বাঈকে। এই ভাড়ার টাকাতেই কোনরকমে দিদিমার মাসকাবারির খরচ চলত, আর কোন তাঁর আয় ছিল না, আয় করবার লোকও ছিল না কেউ। এই অবস্থায় ছোট্ট বিনোদিনীর লালনপালনের দায় এসে পড়ল তাঁর ওপর। কারণ, হঠাৎ করে বিনোদিনীর মা-বাবা দুজনেই মারা গেলেন। একে মেয়েজামাইয়ের শোক, তার ওপর অভাবের সংসারে চাপল নাতনিকে মানুষ করার দায়। দিন যেন আর চলতে চাইল না কিছুতেই।
ছোট্ট বিনোদিনীর সঙ্গে সারাদিন খেলাধুলো করত তার থেকে বছর দু’য়েকের একটি ছেলে। ছেলেটি তার মাসির কাছে থাকত। মাসি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল বিনোদিনীদের পাশেই। মাসির অবস্থা ভালো। দিদিমার বয়স হয়েছিল, কবে আছেন কবে নেই। তাই নাতনির একটা সচ্ছল ঘরে গতি করে যেতে সেই ছেলের সঙ্গেই অনেক ধরাধরি করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিনোদিনীর বয়স তখন সবে পাঁচ। কিন্তু বিয়ে ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই কি যে হল, ছেলের মাসি ছেলেকে নিয়ে কোথায় চলে গেল, আর তার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। অবশ্য খোঁজ যে একেবারেই পাওয়া গেল না, তা না, পাওয়া গিয়েছিল অনেক পরে, বিনোদিনীই পেয়েছিলেন। ছেলেটি তখন বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করে রীতিমতো সংসারী। বিনোদিনী তার বিবাহিত জীবনে কাঁটা হতে চাননি, আবার প্রথম বিয়ের সেই ছোটবেলার ঝড়ো স্মৃতি ভুলতেও পারেননি।
মাত্র এগারো-বারো বছর বয়সে বিনোদিনী এসেছিলেন থিয়েটারের অভিনয় জগতে। সেটাও কিন্তু ওই দু’বেলা দুমুঠো অন্ন জোগানোর দুর্ভাবনার হাল খুঁজতে খুঁজতেই। ব্যাপারটা হয়েছিল এভাবে– ভাড়াটে গঙ্গামণি বাঈ নিজে থিয়েটারে অভিনয় করতেন, গান করতেন। ছোট থেকেই বিনোদিনী তাঁর কাছে গান শিখতেন। এঁদের অভাব দেখে গঙ্গামনিই প্রথম দিদিমাকে বললেন যে, বিনোদিনীকে যদি তিনি থিয়েটারে দেন, তাহলে প্রথম প্রথম সে জলপানির টাকা পাবে, কাজকর্ম শিখলে পরে মাইনেও পাবে। তাঁর কথা শুনে দিদিমা বিনোদিনীকে থিয়েটারে পাঠাতে আনন্দের সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেন। ভাবলেন, আর কিছু না হোক দুবেলার অন্নের চিন্তা তো ঘুচবে।
শেষ পর্যন্ত মাসিক দশটাকা বেতনে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে যোগ দিলেন বিনোদিনী। অভিনয় প্রতিভা আর সৌন্দর্য দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সকলের মন জয় করে ফেললেন। সাকুল্যে মাত্র বারো বছর তিনি রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করেছিলেন। এ ক’বছরে ষাটটিরও বেশি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এই সময় নতুন করে জীবন শুরুর স্বপ্নে প্রেমে পড়লেন বিনোদিনী। প্রেমিক এক জমিদারের ছেলে। জমিদারপুত্রটি আগাগোড়া তাঁর সাথে প্রেমের অভিনয় করে গেল, শুধু শরীরটুকু পাওয়ার লালসায়, কিন্তু বিনোদিনী তাকে সত্যিকারের ভালবাসলেন। তাই সুযোগ নিয়ে তাঁকে ঠকিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করল ছেলেটি। বিনোদিনীকে রক্ষিতায় পরিণত করে পালিয়ে গেল।
বিনোদিনীর রূপে পাগল ছিল অনেকেই। তাদের মধ্যে সত্যিকারের পাগল ছিল একজনই। তার নাম গুরমুখ রায়। মাড়োয়ারি বখাটে ছেলে। বিনোদিনীকে পাওয়ার জন্য সবকিছু করার জন্য সে তৈরি। কিন্তু বিনোদিনী কাছে সে কিছুতেই হালে পানি পায় না। তখন সে বিনোদিনীর গুরু গিরিশচন্দ্রের কাছে গিয়ে টোপ দিল যে, বিনোদিনীকে সে যদি পায়, তাহলে গিরিশচন্দ্রের নাট্যদলের জন্য একটি নতুন থিয়েটার মঞ্চ তৈরি করে দেবে। একটি নতুন মঞ্চের আশায় দল ও গিরিশচন্দ্র বিনোদিনীকে গুরমুখ রায়ের রক্ষিতা হওয়ার জন্য চাপ দিতে লাগল। বিনোদিনী জমিদারের ছেলেটিকে সত্যিকারের ভালবেসেছিলেন, তাই জানিয়ে দিলেন তাকে ভুলে কিছুতেই অন্যকারও রক্ষিতা হতে তিনি পারবেন না। চাপ দিয়ে তাঁকে নোয়াতে না পেরে গিরিশবাবুরা ছাড়লেন মোক্ষম অস্ত্র, বাংলার নাট্যচর্চার, দলের উন্নতির, নিজস্ব মঞ্চের দোহাই দিলেন, মঞ্চের নাম বিনোদিনীর নামে করে দেওয়ার লোভ দেখালেন। তখন অনেক দোলাচলতা পেরিয়ে বিনোদিনী শেষে গুরুমুখ রায়ের আশ্রয়ে আসতে রাজি হলেন। নাট্যমঞ্চও তৈরি হল। কিন্তু মঞ্চের নাম দেওয়া হল ‘স্টার থিয়েটার’। গিরিশচন্দ্র ও দলের এই মিথ্যাচারিতায় বিনোদিনী খুব আঘাত পেলেন, সারাজীবন সেই আঘাতের কথা কখনই ভুলতে পারলেন না।
ভগবৎলীলা দেখবেন বলে একদিন স্টারে বিনোদিনীর অভিনীত ‘চৈতন্য লীলা’ নাটক দেখতে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। অভিনয় দেখে তিনি অত্যন্ত আপ্লুত হয়ে বিনোদিনীকে আশীর্বাদ করলেন। বিনোদিনী তাঁর পায়ে আশ্রয় চাইলেন। ঠাকুর বললেন, ‘তোর চৈতন্য হোক’। আর দিলেন কানে ইষ্টমন্ত্র।
গুরমুখ বিনোদিনীকে সত্যিকারের ভালবেসেছিলেন। কিন্তু বাবামায়ের প্রবল চাপে বিনোদিনীকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেন, বিয়ে করলেন। কিন্তু সংসার করতে পারলেন না । অল্পদিনেই তাঁর মস্তিস্কের বিকার ঘটল, মন ভরল বিচ্ছেদ বিষাদে। একটু শান্তির আশায় কাশীতে গিয়ে সাধুসঙ্গ করলেন, সেখানেই মাত্র বাইশ বছর বয়সে হঠাত করে মারা গেলেন।
গুরমুখের মৃত্যু বিনোদিনীকে বড় আঘাত দিয়ে গেল। তিনি তখন খ্যাতির মধ্যগগনে, হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন আর অভিনয় করবেন না। চলে গেলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তার দীর্ঘকাল পর মন যখন শান্ত হল, আঘাতের ঘা খানিক শুকিয়ে এলো, তখন একাকীত্বময় জীবনে একটু শান্তির আশায়, নির্ভরতার প্রত্যাশায় বিয়ে করে সংসার পাতলেন একজনের সঙ্গে। কিন্তু সেও সুখের হল না। এলো অকাল বৈধব্য। তখন ঠাকুর রামকৃষ্ণের দেওয়া গুরুমন্ত্র সম্বল করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কাটাতে লাগলেন সাধিকার জীবন। এভাবেই আটাত্তর বছর বয়সে ১৯৪১সালে তিনি মারা গেলেন। যে সংবাদপত্র তাঁকে এককালে ‘ফ্লাওয়ার অব নেটিভ স্টেজ’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করত, সেই তারাই তাঁর মৃত্যুর খবর জাননোর জন্য একটিও পঙক্তি খরচ করল না…
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news