Breaking News
Home / TRENDING / চিঠি… হেনরিসের বাবাকে

চিঠি… হেনরিসের বাবাকে

রীতা চট্টোপাধ্যায়ঃ

হেনরিসের বাবা,

আপনাকে বাবা বলতে ইচ্ছে হয়নি কোনোদিন আর এখন তো সে প্রশ্নই নেই… যে অধিকারে আপনাকে বাবা বলা… সেটা আর নেই… দৃশ্যপটের বদল.. সম্পর্কের বদল… কিন্তু জানেন সারাটা জীবন আপনি এত বেশি করে ছিলেন ফেলে আসা ঘরদুয়ারে… ফেলে আসা মানুষটির মধ্যে….
সেই ঘোর লাগানো দিনগুলোতে… সেই প্রথম শীতের কমলা আলোয় এ মেলা সে মেলা… কফির দোকান… রেস্তোরাঁ… দূরপাল্লার বাসে ট্রেনে… হাজারও লোকের মাঝে স্বর্গীয় নীল রং আলাদা করে দিত যেন ঢেকে দিত আমাকে আর হেনরিসকে…. ঠিক তখনও আপনি প্রবল যন্ত্রণার কালো ছায়া হয়ে ঘিরে থাকতেন… সদ্য কৈশোর পেরোনো হেনরিসকে… অঙ্গীকারের ভঙ্গিতে বলে যেত সে… আর মাত্র কদিন রোজগার একটু বাড়লেই মাকে নিয়ে আসব…. বুঝুক লোকটা….
২১এ সন্তান আপনার ..বৈবাহিক প্রথম সম্পর্কেই… হেনরিস চলে এলো.. নারী পুরুষের নানান সমীকরণ … ১৭র কিশোরীটিকে আবিষ্কারের আগেই আপনি শারীরিক ভাবে বাবা হয়ে গেলেন… কিন্তু মানসিক ভাবে যেন প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করলেন ওই শিশুটিকে….
আর পিতৃস্নেহ বঞ্চিত শিশুটির শৈশবের রঙ্গীন দিনের ফ্রেমে রয়ে গেলো সাদাকালোতে কিছু ছবি…. মাঝরাতে আপনার সুঠাম হাত ওকে পাঁজাকোলে মায়ের পাশ থেকে সড়িয়ে নিচ্ছে অন্য একা কোনো ঘরে.. যে ঘরের দেওয়ালে রাস্তার অল্প আলোগুলো তৈরি করছে নানান ভয়ের মুখ… ভয় পাচ্ছে ও… ভীষণ ভয়…. কিছুতেই ঘুম ভাঙ্গতে পারবে না ওর…. আপনি মারবেন… খুব মারবেন….
আপনার বন্ধুর বাগানের নতুন ফোটা গোলাপটা… ছেলেমানুষীতে ছিঁড়ে ফেলে…. কী ভীষণ শাস্তি আপনার…. হাতে জলন্ত সিগারেট চেপে ধরলেন….. এই সব কত ছবি সারা জীবন বহন করেছে হেনরিস…. বহন করেছি আমি…. বহন করে আমার সন্তান…..
রাতঅফিস শেষে বরফপরা ভোররাতে হেনরিস একা ডয়িং রুমে জান্তব শব্দ করে টেলিফোন করতো আপনাকে…. Do You love me papa? Love me or not? Please tell me.. I can’t accept your death before mine papa… just tell me if you love me or not…… ভয় পেতো ওর বাচ্চাটা…আধো ঘুমে উঠে আসত কাঁপতে কাঁপতে …বিধস্ত পিতৃস্নেহ কাঙাল বাবাকে .. তার জান্তব চিৎকারকে…
আপনাকে ঘেন্না করেছিলাম সেদিন…. বিয়ের পর প্রথম রাত ….আপনার বাড়িতে.. তাও কয়েকদিনের জন্য…. হেনরিস ওর বাড়ি আপনার থেকে আলাদা করেছিল অনেক আগেই…. আপনি মেনে নিতে পারেনি ওর যৌবনও …. মনে আছে আপনার? আপনি একটা ছোট্ট ঘরে আমায় একা ডেকে নিয়ে… বলতে শুরু করলেন হেনরিসের ছোট বেলা থেকে তখন পর্যন্ত যা যা অপছন্দ করেছেন আপনি… বললেন যে ছেলেটির সাথে জীবন শুরু করলাম সে ঠিক নয়….. এর সব দায়িত্ব আমার… বাবা হিসাবে আপনার কোনওই দায়িত্ব নেই… আর ব্যাঙ্ক এর বইটা নিয়ে আমার দেখিয়ে বললেন…. কত গরিব আপনি…. কেন এসব ওই দিনে… কেন ওই বিশেষ দিনে… 23/24 শের আমি কিছু বুঝতে পারিনি…. আসলে গরিব ছিলেন বড্ড মনে…. ব্যাঙ্কের বইতে নয়.. সেটা বুঝেছি সারা জীবন ধরে………

অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পেরিয়ে … পিতৃস্নহ পাগল…বাবা হয়েও বাবা না হতে পারা… সারা জীবন ঝটপট করা প্রৌঢ় হেনরিস আবার আবারও নিজের সব সঞ্চয় পায়ে দলে ওই ২১এর যুবকের পিতৃস্নহ চায়….. love him….. please love him….

. রোজি…. রোজি হফম্যান.

একাকিত্ব …

একটা উষ্ণ দিনে ভোরের কফি বানাতে বানাতে রোজির মনে পড়ে কোনো ছায়া নয় ছায়াপথ নয় একটা সূর্যোদয় দেখতে গিয়েছিল সে প্রাগের চালস নদীর ওপর ব্রীজ থেকে, সঙ্গী বোরখা পরা আফ্রিকান মেয়েটি এদিক ওদিক সর্তকভাবে তাকিয়ে মাথায় ঢাকাটা খুলে ফেলছিল, একঢাল কালোপশমের মতোন চুলগুলো ওর ঘাড়ে পিঠে যখন ছড়িয়ে ঠিক তখনই পূর্ব আকাশে সেই আলোর ম্যাজিক।
এসব কথা আরও কতো মূহূর্তকথা হেনরিস কে বলা হলো না।

নির্বাসন, নির্বাসন সমস্ত জাগতিক বন্ধন মুক্তির সময়ও এ মেয়ে ভোলে না হেনরিসকে, ওইতো সেদিনের কথা যেন, এক নিঃশব্দ ট্রেন ,নিঃশব্দ কিছু মানুষজন ,শব্দহীন ট্রেনের দরজা দুপাশে সরে যায় নাকের ওপরে চশমাটা একটু উঠিয়ে দিয়ে রোজির কপালে বিদায় চুম্বন করে অভিমানী পিতৃভক্ত হেনরিস সুটকেসটা নিয়ে উঠে পরে ফ্রান্স থেকে জার্মানিগামী এক চলমান শব্দহীনতায় ,
You took the sun with you when you left Henris…
গ্রীষ্মের শেষে পাহাড়ের ঢালে প্রথম বৃষ্টিতে মাটির থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখে শীতলতার গন্ধ পায় রোজি.. orfanage এর বাচ্চাদের শেষ না করা টুপিগুলোর কথা মনে পড়ে যায় ।
উলবোনো তুমি একা রোজি, দক্ষিণ ফ্রান্সের তোমার একা আরাম কেদারা একটু একটু করে দুলুক স্মৃতিতে পরতের পর পরত ছাড়িয়ে ঢুকে পরো শৈশব কৈশোর থেকে যৌবনে হেনরিসে। রোজের মতোই অস্ফুটে প্রার্থনার মতো একই ভাবে বলো বলেই চলো
You are everywhere except right here and it hurts …it hurts me.
Redcross এর সাহায্যের গাড়িটি দিনের খাবার দরজার বাইরে রেখে বেল বাজিয়ে যাক । দ্রুত শেষ
করো তোমার অসমাপ্ত কাজগুলো, শীতের আর বেশি দেরি নেই ।
রাতের খাবারের বেল বাজলে দরজা খুলো রোজি, না হলে ওরা দুপুরের অভুক্ত খাবার দেখে এমারজেন্সিতে ফোন করবে ।
Go on ,open the door for the rest of life…

তোমাকে টুপি পরা বাচ্চারা ছবি পাঠাবেন Miss Hoffmann, একঝাঁক নতুনদের ছবি, বৃদ্ধঘোটকীর মতো দেখো রোজি পৃথিবী নতুনই থাকে, শরীর শুধু বৃদ্ধ হয়।

যুদ্ধ ….

উতল হাওয়া দক্ষিণ হাওয়ার মধ্যে বরফের কুচি। হেনরিসকে গরমজলে স্নান করিয়ে পরিপাটি করে জামাকাপড় পরিয়ে ওর জানলার সামনে সোফায় বসিয়ে ওঁর সাহায্যেকারী মনে করিয়ে দিলেন আজ এডভাইসার আসবার দিন ।
oldage home এর নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন একজন বয়স্কদের মানসিকতা নিয়ে পড়াশোনা করা বিশেষজ্ঞ কথাবার্তা বলে কিছুটা সহনীয় করে তোলে বৃদ্ধকাল .. এদের এডভাইসার বলে ।
লিন্ডা, সেই হাসিখুশি তরুণীর আসবার কথা শুনেই মন ভালো হয়ে যায় হেনরিসের।
লিন্ডা এসেই বলে
—- কী কথা দিয়ে যেন শেষ হয়ে ছিল আমাদের আগের দিনের আলোচনা হেনরিস?
—– যুদ্ধ, বিপ্লব, দেশটাকে বদলে স্বর্গরাজ্য করা ।
—–যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, তোমরা জিতে গেছো হেনরিস,সবার মাথায় ওপর ছাত ,খাদ্য, ঘরে ঘরে গরম জল ঠান্ডা জল ,আর কেন বিপ্লব কেন যুদ্ধ?
বাচ্চাদের পুতুল চাইবার ভঙ্গিতে বৃদ্ধ মাথা দোলায়…
——– না না আমার চাই ,চাই-ই যুদ্ধ ।
পেশাগত সহানুভূতি দেখিয়ে .. ধীরে ধীরে হেনরিসের শিরা ওঠা হাতে হাত বোলাতে বোলাতে লিন্ডা বলেন ..
——- তা কী চাইবে এবার যুদ্ধে? কীসের জন্য যুদ্ধ হবে?
হেনরিসের কোঁচকানো চোখ দিয়ে জলস্রোত গড়িয়ে পড়ে তার ঝুলে পরা গালে ….
——– বিশাল একটা কাঠের গামলায় অনেকটা জল তাতে আমরা তিন ভাই স্নান করবার পর ওই জলেই মা ঘরের সব কাজ সারবেন অমন একটা জল কষ্টের দিন …আর রোজি .. রোজির সাথে চাঁদের রাতে জঙ্গলে আদরে মাখামাখির রাতটা ,রাতগুলো ।

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

https://www.youtube.com/channelhindustan

https://www.facebook.com/channelhindustan

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *