কিশোর ঘোষ
ছিল শিল্পের উৎসব, হয়ে গেল বিনোদনের ফুলঝুরি। ফলে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনের সন্ধ্যায় সমকালীন বিশ্ব সিনেমার কিংবদন্তি পরিচালক মাজিদিকে মনে হচ্ছিল এলিয়েন! লোকটা যেন অভিতাভ, শাহরুখ, শ্রাবন্তী, কোয়েলদের ফিল্ম ফেস্টিভেলে ভুল করে ঢুকে পড়েছে! কিন্তু আপনি যদি প্রকৃত সিনেমাপ্রেমী হন তাহলে নিশ্চয়ই ‘চিলড্রেনস অফ হেভেন’ দেখেছেন। সমমানের আরও সিনেমা আছে ইরানের ক্ষণজন্মা পরিচালক মাজিদ মাজিদির, তবে চিলড্রেনস হেভেনটা হল সত্যজিৎ-এর পথের পাঁচালি বা ঋত্বিকের অযান্ত্রিক কিংবা মৃণাল সেনের ভূবন সোম-এর মতো। যাকে বলে কাল্ট সিনেমা। এই দেখুন, ভুল করে পৃথিবী বিখ্যাত বাঙালি পরিচালকদের নাম তুলে ফেললাম! যাঁদের সঙ্গে আজকের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সম্ভবত কোনওরকম যোগাযোগ নেই। এই উৎসব ‘জামাইবাবু’ অভিতাভ আর ডিডিএলজে বয় শাহরুখ খানের। তাঁরাই বর্তমান চলচ্চিত্র উৎসবের বক্সঅফিস। তাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে মঞ্চে তোলা হলেও, দুটো কথা বলবার সুযোগ দেওয়া হলেও, সবার শেষে থাকেন সুপারস্টার এসআরকে অ্যান্ড মেগাস্টার বিগ বি।
আসলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তোলা উদ্দেশ্য এই গদ্যের। এক, এই কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনের সন্ধ্যাটির সঙ্গে গোটা চলচ্চিত্র উৎসবের চরিত্রগত কোনও মিল নেই। (উদ্বোধন দেখার পর লোকে ভাবতেই পারে, যে এই ফেস্টিভেলে বুঝি কুছকুছ হোতা হ্যায়, দিওয়ার, শাহেনশা, চেন্নাই এক্সপ্রেস কিংবা ‘পাগলু’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’, ‘বস ২’, ‘অমরসঙ্গী’ জাতীয় ছবি দেখানো হবে। কিন্তু তা তো নয়। অতএব প্রথম দিন হল বিভ্রান্তিকর ফুর্তির দিন।) এবং দুই, সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক-তপন-বুদ্ধদেবের বাংলা ছবি, যে সিনেমা বিশ্বের দরবারে ভারতীয় সিনেমার মুখ, তারা বলিউডের তারকা ধার করে উৎসবের গ্ল্যামার বাড়ানোর প্রাণপন চেষ্টায় মেতে উঠেছে! এ বড় আশ্চর্যের! কারণ আমরা জানি, শিল্পের গ্ল্যামার মানে মেধার, মননের গ্ল্যামার। তারপরেও! যেখানে বলিউডের তারকাও নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন।
এবারের উৎসবে নিজের বক্তব্যে শাহরুখ যেমন বললেন, তিনি এ ধরণের উৎসবের লোক নন। ‘অভিনেতা’ হিসেবে ফিল্ম ফেয়ার কমিটি ছাড়া তাঁকে কেউ পাত্তা দেয় না, দেয়নি। নির্দ্বিধায় জানান, তাঁর একটিও সিনেমা এমন সম্ভ্রান্ত আন্তর্জাতিক উৎসবে কখনওই জায়গা পায়নি। এরপরই শাহরুখ ‘দিদি’কে কৃতজ্ঞতা জানান তাঁকে চান্স পাইয়ে দেওয়ার জন্য। অতএব সৎ এন্টেরটেইনার শাহরুখ ভালো করেই জানেন, কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বার বার তাঁর ডাক পাওয়াটা আসলে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। তবে ‘দিদি’ বলে দিয়েছেন, আগামী বছর ২৫তম বর্ষ পা দেবে উৎসব, তোমাকে আসতেই হবে।
ঠিক, আসতেই হবে। কারণ আমিতাভ, শাহরুখ, জয়া বচ্চন, ওয়াহিদা রহমানরা আসলে বিলিতি বিস্কুট, বিলিতি আমড়া, বিলিতি মদের মতো জিনিস। পরাধীন কলোনির মনস্তত্ব—কোটি কোটি টাকার ইণ্ডাস্ট্রি মুম্বাই থেকে বিলাসবহুল বিমানে উড়ে আসে যাঁরা, তাঁরা পাবলিকের কাছে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’, যাঁদের কাছে পেলে পাবলিকের আনন্দের শেষ থাকে না। কিন্তু এই ‘পাবলিক’-এর জন্য কি চলচ্চিত্র উৎসব?
‘দাবাং’-এর দর্শক আর চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শক কি এক? এই প্রশ্নের উত্তরে আজকাল অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে চলচ্চিত্র উৎসব সব মানুষের উৎসব হয়ে উঠেছে। আগে কোটি টাকা খরচ করা হত চারজন গম্ভীর দর্শকের জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। হায়! চলচ্চিত্র উৎসব তো হাতে গোণা ওই দর্শকের জন্যই!
সেই দর্শকের জন্য যে মাজিদির সিনেমাটা ফেস্টিভেলে এলে দেখবে বলে বসে থাকে গোটা বছর। যে সিনেমা এ শহরে, এদেশের মুক্তি পায় না। হয়তো কিউবার কোনও এক পরিচালকের অসামান্য এক চলচ্চিত্র শিল্প, যা দেখার সুযোগ মিলবে বচ্ছরকার ফেস্টিভেলে। বলুন তো, দূর দেশের সেই অচেনা পরিচালকের অজানা সিনেমা দেখতে চায় কজন? যে লাখ লাখ দর্শক শাহরুখের ‘জিরো’ দেখতে হলে ভিড় করবে তারা দেখতে চাইবে?
কখনই না। ‘বই’ দেখা আর ‘ছবি’ দেখার দর্শক আলাদা। ‘ছবি’র দর্শকের সংখ্যা সারা পৃথিবীতেই কম। মনে রাখতে হবে, তাঁদের জন্যই ফিল্ম ফেস্টিভেলের আয়োজন। অতএব প্রশ্ন উঠবেই সেই ফেস্টিভেল-এ কেন আমিতাভ, শাহরুখ প্রধান অতিথি, অভ্যাগত হবেন? কেন মাজিদিকে এলিয়েন মনে হবে? কেন বিশ্ব সিনেমার ঘোষিত একমাত্র বাঙালি জীবিত ‘মাস্টার’ পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত থাকবেন না স্টেজে? যে বলিউড অন্যায় ভাবে সত্যজিৎকে নয় রাজ কাপুরকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের মুখ বানিয়েছে তাঁদের আমরা বাঙালিরা পাত্তা দেব কেন?
এখানেও কি সঙ্কীর্ণ ভোটের রাজনীতিই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে উঠল? উত্তর দিন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর ফেস্টিভেল কমিটি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news