কিশোর ঘোষ:
কার্তিক মাসের এই কৃষ্ণপক্ষে পাহাড়ে শুরু হয়ে গেছে কাক, কুকুর ও গো-মাতার পুজো।
যে সময় গোটা ভারত মেতে ওঠে দিওয়ালির আনন্দে, যখন আমরা বাঙালিরা মা-কালীর আরাধনায় নতজানু হই, সেই সময় দার্জিলিং-এ হয় সেখানকার নিজস্ব রীতির ‘তিহার’ (তেওহার বা ফেস্টিভেল)। যে তিহারের শুরু অবশ্যই দুর্গাপুজোতে, চলবে ভাইটিকা (ভাইফোটা) অবধি। ‘কাগ তিহার’, ‘কুকুর তিহার’ ও ‘গাই তিহার’ আসলে নেপালি হিন্দুদের দীপাবলি উৎসবের অংশ। ‘ভারতীয় রীতি’ রেওয়াজের সঙ্গে তার বিরাট পার্থক্য নেই, আবার স্বতন্ত্র কিছু নিয়ম নিষ্ঠা রয়েছে। দার্জিলিং ছাড়াও পক্ষী ও পশুদেবতাদের এই পুজো হয়ে থাকে ভারতের সিকিমে ও হরিয়ানার কিছু অংশে। পড়শি দেশ নেপালে হয় তো বটেই। কিন্তু বেছে বেছে কাক, কুকুর আর গরুকে পুজো করা কেন?

কাগ তিহার: আসলে কাককে মনে করা হয় মৃত্যুর দেবতা যমরাজের দূত। অতএব পরিবারের সদস্যদের মঙ্গলকামনায় কাকের পুজো আবশ্যক। পাহাড়ের মানুষ কার্তিকের অমবস্যায় বাড়ির ছাদে পবিত্র মনে কাকের জন্য মিষ্টি প্রসাদের পাত্র সাজিয়ে রাখেন। কাক সেই খাবার খেলে পুজো সার্থক হয়।

কুকুর তিহার: দীপাবলি উৎসবের দ্বিতীয় দিন হয় কুকুরের পুজো। মালা পরানো হয় কুকুরকে, কপালে পরানো হয় লাল তিলক। প্রসাদ হিসেবে কুকুরের পছন্দের খাবার। মনে রাখতে হবে, হিন্দু পুরাণে কুকুর ফিরে ফিরে এসেছে। মহাভারতের অন্তিম পর্বে রয়েছে সারমেয় দেবতা। হিন্দু পুরাণ মতে কুকুর হল যমরাজের বাহন। বলা হয় মৃত্যুর দেবতার সঙ্গে দুটি পাহারাদার কুকুর থাকে সব সময়। যাদের রয়েছে ৪টি করে চোখ। এও মনে করা হয় যে নরকের পাহারাদার হল ওই দুটি কুকুর। ফলে ‘কুকুর তিহার’-এর দিনটিকে একইসঙ্গে ‘নরক চতুর্দশী’ হিসেবেও পালন করা হয় অনেক জায়গায়। অতএব কুকুরকে পুজো করাটা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য অতি স্বাভাবিক ঘটনা।

গাই তিহার: তৃতীয় দিন হয় এই উৎসব। সকলেরই জানা হিন্দু মতে গরু হল গৃহস্থের সম্পদ ও স্বাচ্ছন্দের প্রতিক। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ এককালে একটি গরু নানাভাবে একজন গৃহস্থের জীবনে প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ এনে দিত। গরুর দুধ পানের জন্য, গরুর বিষ্ঠা বা গোবর সহকারী দাহ্য পদার্থ হিসেবে উনুন ধরানোর কাজে লাগত। সেইসঙ্গে মাটির ঘর, দাওয়া ও উঠোন পরিচ্ছন্নের কাজে লাগত গোবর। হয়তো গরু আজ আর সকল গৃহস্থের সম্পদের প্রতিক নয়। বাড়িতে বাড়িতে গরু রয়েছে এমনও নয়। কিন্তু তথাপি দিওয়ালির সময় পাহাড়ের মানুষ পালন করেন সনাতন সঙ্কল্প। গো-মাতার গলায় পরানো হয় মালা, ব্যবস্থা হয় ভালো গো-খাদ্যের। এমনকী গোটা বাড়ির ফুল দিয়ে সাজানো হয় এদিন। আরেকটা কথা, ফুল মানে গাদাফুল। যে কোনও কারণেই হোক পাহাড়ে হাজার ফুল মিললেও দিওয়ালিতে কাঞ্চনজঙ্গার দেশ সেজে ওঠে হলুদ গাদাফুলে। যা দিয়ে দেবতার মালাও তৈরি হয়।
গাই তিহারের সন্ধেবেলা হয় লক্ষ্মীপুজো। রাতে হয় ‘ভাইলো’ নামের একটি রেওয়াজ। তরুণীদের গান ও নাচের উৎসব। এদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় আতসবাজি পোড়ানোর পালা।

সে অবশ্য সবখানেই হয়। গোটা ভারতের আকাশ দিওয়ালির রাতে রঙিন ওয়ে ওঠে থেকে থেকে। কিন্তু দার্জিলিং পাহাড়ের ‘কাগ তিহার’, ‘কুকুর তিহার’ ও ‘গাই তিহার’ তার থেকে অনেকটাই আলাদা পার্বণ। আরেকটা জরুরি কথা— পুরাণ, পুজোআচ্চা ইত্যদির পাশাপাশি মানুষ ও মনুষ্যতর প্রাণীর সম্পর্কও গড়ে তোলে এই উৎসব। যা আজ, এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং যুগে হয়তো খুব খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news