পার্থসারথি পাণ্ডা:
কালীঘাটের মন্দির নিয়ে কিংবদন্তী অনেক। তার মধ্যেই কিছু কিংবদন্তীর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি না-থাকলেও, তাদের কিন্তু লোকমনকে প্রভাবিত করার যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। এই যেমন, ব্রাহ্মণ ভবানীর কালীঘাটে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠার কিংবদন্তীই ধরুন না…।
কলকাতা তখন নেহাতই এক গণ্ডগ্রাম। তার গায়ে গা ঘেঁষে আরও দুখানি গ্রাম– সুতানুটি ও গোবিন্দপুর। এখনকার কালীঘাট অঞ্চল তখন ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে যেত বুড়ি গঙ্গার স্বচ্ছ স্রোত। তাতে নৌকো চলত, ছোটখাটো সেকেলে জাহাজও চলত। এসব অঞ্চল তখন সাবর্ণ চৌধুরীদের জমিদারীর মধ্যে। সাবর্ণরা থাকতেন বড়িশায়। বামুনের ছেলে ভবানী সেইসময় এসব গাঁয়ে শাঁখা বিক্রি করে দিন গুজরান করত।
একদিন ভবানী কলকাতা-গোবিন্দপুরে বিক্রিবাট্টা সেরে গঙ্গার ধার ধরে বড়িশার দিকে যাচ্ছিল। তখন তো আর বড় রাস্তা বলে কিছু ছিল না, কেবল ছিল গঙ্গার ধার ঘেঁষে পায়ে চলা পথ। সেই পথ ধরে, এখন যে পুকুরটিকে আমরা ‘কালীকুণ্ড’ বলি, সেটা তখন গঙ্গারই বিচ্ছিন্ন একটি দহ ছিল; সেই দহের কাছে ভবানী আসতেই একটি কালোপানা অল্পবয়সী সধবা মেয়ে তাকে থামিয়ে শাঁখা পরতে চাইলো। জঙ্গলের ভেতর থেকে দুম করে একা একটি মেয়েকে বেরুতে দেখে ভবানী অবাক হয়ে গেল। ভাবল, জঙ্গলে কোন আদিবাসী পরিবার এসে হয়তো বাসা বেঁধেছে, এ হয়তো তাদেরই মেয়ে। আগে বেসাতিটা তো হোক, তারপর কথায় কথায় কোত্থেকে এলো, কাদের মেয়ে সব জেনে নেবে সে ঠিক—আলাপ জমাতে ভবানী ভারি ওস্তাদ। তাই সে মুটুরি খুলে মেয়েটির হাতে পরিয়ে দিলো এক জোড়া নতুন শাঁখা। কিন্তু মেয়েটি তাকে আলাপ জমানোর ফুরসতই দিলো না। ‘চানটুকুনি সেরে এসে দাম দিচ্ছি হে শাঁখারি’ বলে ফুরুৎ করে যেন পাখির মতোই উড়তে উড়তে নদীতে নেমে ডুব দিলো বাঁও বিশদ জলে। খানিক সময় কেটে গেল, মেয়েটি তবু জল থেকে আর ওঠে না। ভবানী এবার ভয় পেল, মেয়েটা তলিয়ে গেল না তো! এই ভেবে সে তড়িঘড়ি যেই না নামতে গেছে জলে, অমনি জলের ওপর ভেসে উঠল শাঁখা পরা দুই খানি হাত। হাত দুটি আলতায় রাঙা। কালোর মধ্যে লাল, তায় আবার সাদা শাঁখা। সে যে কী অপূর্ব শোভা! ভবানীর মন তখন শোভাতে মোহিত হবে কি, সে তখন বিস্ময় বিহবল। এমন সময় চমক দিয়ে আকাশ থেকে ভেসে এলো দৈববাণী, দেবী কালিকা তাকে আদেশ দিলেন দহের তীরে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজো করার। ভবানীর বাড়ির একটা খুঙ্গির মধ্যে সতীর পায়ের আঙুল আছে, সেই আঙুল যেন এখানে এনে সে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা করে। পুজো করে।
ভবানী ছুটল বাড়ির দিকে। কুলুঙ্গিতে খুঙ্গির মধ্যে সত্যিই সে দেবীর জ্যোতিরময় আঙুল পেলো। প্রস্তুরময় তিনখানি আঙুল থেকে বেরুচ্ছে দিব্য জ্যোতি! সেই আঙুল মাথায় নিয়ে সে কালীকুণ্ডের তীরে এসে পেলো দেবীর মুখমন্ডল। দেবীর আঙুল আর মুখমন্ডল কুণ্ডের পশ্চিম তীরে স্থাপন করে সে শুরু করল পুজো করতে। তৈরি করল পর্ণপত্রে দেবীর প্রথম মন্দির। ধীরে ধীরে সেখানে শুরু হল দেবীর পুজো অর্চনায় সাধারণ মানুষের আনাগোনা। তারপর ধীরে ধীরে সেখানে সাবর্ণ চৌধুরীদের পৃষ্ঠপোষকতায় দেবীর পাকা মন্দির তৈরি হল, প্রচারিত হল দেবী মাহাত্ম্য।
এই কিংবদন্তীর জন্যই এক সময় হয়তো লোকমানসে এই বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল যে, যেখানে মা কালিকা স্বয়ং শাঁখা পরেছেন, সেই পুণ্যভূমিতে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিলে তাদের দাম্পত্য জীবন দৈব-আনন্দময় ও অটুট হবে। নববধূর হাতের শাঁখা ও সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় হবে, দেবীর মতোই। সেই ভাবনারই বিস্তার ঘটেছে ধীরে ধীরে কালের স্রোতে। পরে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, অল্প খরচে শাস্ত্র মতে বিয়ে করে ফেলার সুবিধেও। সেজন্যেই কলকাতায় এত এত মন্দির থাকতে, মানুষ বিয়ের মতো শুভকাজ সম্পন্ন করতে ছুটে আসেন কালীঘাটের মন্দিরেই।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news