পার্থসারথি পাণ্ডা:
অষ্টম গর্ভ ও অষ্টমী তিথিতেই শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হল কেন? অষ্টম গর্ভ আসলে মথুরার রাজা কংসের নিয়তি। দৈববানী অজুহাত মাত্র। কেন? তাহলে, জানা গল্পটাই আর একবার বলি, একটু অন্যভাবে।
যে সময়ের কথা বলছি, তখন ভারতবর্ষের বুকে ভোজ, বৃষণী, অন্ধক প্রভৃতি নানান প্রতাপশালী বংশের রাজত্ব। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। চলে একে অপরের রাজ্য ছলে-বলে-কৌশলে অধিকার করে নেওয়ার চেষ্টা। এই কৌশলের একটি রূপ হল, প্রতিদ্বন্দ্বী বংশের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। বৃষণী বংশের রাজা বসুদেবের এক স্ত্রী রোহিনী বর্তমান থাকতেও দ্বিতীয়পক্ষ হিসেবে গ্রহণ করলেন ভোজ বংশের কন্যা দেবকীকে। দেবকী ভোজ বংশের রাজা উগ্রসেনের ভাইঝি। উগ্রসেন তখন মথুরা গোকুলসহ বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ গো-বলয়ের রাজা। ফলে, সবারই এই রাজ্যের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি। কিন্তু ক্ষমতায় বীর উগ্রসেন বা তাঁর পুত্র কংসের সঙ্গে পেরে উঠার মতো বুকের পাটা সেইসময় কারও ছিল না। এখানেই কৌশলে সবাইকে টেক্কা দিলেন বসুদেব। তিনি বলপ্রয়োগের ধার দিয়েই গেলেন না, স্বভাবে সরল উগ্রসেনের কাছে দূত পাঠিয়ে, তাঁকে ভজিয়ে কৌশলে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে ভোজ বংশের অন্দরে ঢুকে পড়লেন। পরের খেলা সময়ের অপেক্ষা। পরম ঘোড়েল কংস যথারীতি সেই কৌশল বুঝে ফেললেন। তিনি বোনের বিয়ের আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন, তাকে নিজে রথ চালিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দিতে গেলেন। যেন এক আদর্শ দাদা। এসবের মাঝেই কংস মনে মনে ভেঁজে চলেছেন বসুদেবকে মাত দেওয়ার নিখুঁত পরিকল্পনা। নববধূ ও বরকে নিয়ে শোভাযাত্রা যখন নগর ছাড়িয়ে নির্জন প্রান্তরে উপস্থিত হল, তিনি সকলকে ছাড়িয়ে রথ নিয়ে এগিয়ে গেলেন এবং হঠাৎ করেই রথ থামিয়ে ঘোষণা করলেন, তিনি এক নিষ্ঠুর দৈববানী শুনেছেন– দেবকীর অষ্টমগর্ভের সন্তান তাঁকে নাকি হত্যা করবেন। ব্যস, তিনি দেবকীকে হত্যা করতে গেলেন, যাঁকে বিয়ে করে এ বংশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন বসুদেব, তাঁকেই শেষ করে দেবেন। দৈববানী ঘোষণার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর, বোনকে হত্যার একটা অজুহাত চাই এবং এমন একটা অজুহাত যেখানে বাবাকে এবং প্রজাদের ভুল বুঝিয়ে শান্ত রাখা যায়। কিন্তু যতই হোক বোন তো, দেবকীর আকুতির কাছে তিনি কিছুটা নত হলেন। তাঁকে প্রাণে মারলেন না। বন্দী করলেন বসুদেবসহ। এবার স্পষ্ট হল তাঁর দ্বিতীয় কৌশল। হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে, বন্দী করে রাখবেন। অষ্টম গর্ভের সন্তান হত্যা করবে রটালে দীর্ঘদিন বন্দী রাখা যাবে। তাই অষ্টমগর্ভ।
অষ্টম গর্ভই যদি শুধু কংসের দৈববানী নির্ধারিত নিয়তি হত, তাহলে তিনি অন্য সন্তানদের হত্যা করলেন কেন? নিছক রাগ বা ক্রুরতা থেকে? না। আসলে, নিজের রাজ্য এবং সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করতে এটা বৃষণী বংশকে ঝাড় সমেত শেষ করে দেওয়ার একটা প্রকৃষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। তা নইলে, অষ্টম গর্ভে মেয়ের জন্ম হয়েছে জেনেও তাকে হত্যা করতেন না। তাই বসুদেবকে বন্দী করেন তিনি। রোহিনী যদি নন্দের ঘরে এসে না লুকোতেন, তাহলে তাঁকেও হয়তো হত্যা করতেন কংস। সুতরাং, এসমস্তকেই কংসের এক নিষ্ঠুর রাজনৈতিক পরিকল্পনা বলা যায়।
অষ্টম গর্ভের সন্তান হয়ে শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নিলেন। মায়ায় বলুন, রক্ষীদের গোপন সাহায্যে বলুন, বসুদেব তাঁকে গোকুলে রেখে এলেন, কংসের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নিয়ে এলেন নন্দের সদ্যোজাত কন্যাকে। তখনও তাহলে পুত্রসন্তানকে বাঁচাতে কন্যাসন্তান বিসর্জন দেওয়া যেত নির্দ্বিধায়? নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যেত? তারা তখনও তাহলে ফেলনা ছিল! যাই হোক, রোহিনী নক্ষত্রে অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নিলেন কেন? উৎস কোথায়? বেদে রোহিনী নক্ষত্রকে বন্দনা করে বলা হয়েছে— রোহিনী সৃষ্টিতে নতুন প্রানের সঞ্চার করে, জীবন কর্ষণ করে তাতে চেতনার সঞ্চার করে। সেখানে ‘কর্ষণ’ বোঝাতে ‘কৃষ্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সেই বেদের যুগে, তখনও কৃষ্ণকথার আবির্ভাব ঘটেনি। কিন্তু পুরানের যুগে যখন লোকচর্চা থেকে কৃষ্ণকাহিনী গড়ে উঠল, তখন বেদের রোহিনীবন্দনার ‘কৃষ্ণ’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলেন অবতার শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর জন্মক্ষণের সঙ্গে জুড়ে গেল রোহিনী নক্ষত্র। অষ্টমী তিথি। স্মৃতিকারেরা তাতে মান্যতার মোহর লাগলেন। কালক্রমে কৃষ্ণ আমাদের কাছে মহাভারতের হাত ধরে পরম কূটনীতিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেন। সপ্তম শতাব্দী থেকে মহারাষ্ট্রের কবি হাল-এর লেখা ‘গাহাসপ্তসতী’ কাব্যের প্রভাবে রাধা জুড়ে গেলেন কৃষ্ণের সঙ্গে। দুজনে হয়ে উঠলেন শাশ্বত প্রেমের প্রতীক। আর ভাগবত বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলায় ভক্তজন পেলেন বাৎসল্য রসের স্বাদ। তাঁর মধ্যে একদিকে দেখতে পেলেন নিজের সন্তানের ছায়া, অন্যদিকে এক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী অবতারকে, ভগবানকে। ফলে, তাঁর জন্মদিন ধীরে ধীরে হয়ে উঠল জাতীয় মহোৎসব। পার্বণ। জন্মাষ্টমী পর্ব।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news