পার্থসারথি পাণ্ডা :
আচ্ছা কংস কতটা খারাপ লোক ছিলেন, যে জন্য ভগবান বিষ্ণুকে তড়িঘড়ি অবতার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হল তাঁকে বধ করার জন্য?
বিষ্ণু পুরাণে জানানো হচ্ছে যে, আসলে শিশুপালকে বধ করে তাঁকে উদ্ধার করার জন্যই বিষ্ণুর কৃষ্ণঅবতার। এই অবতার নেওয়ার পথটিকে আরও প্রশস্ত করলেন পৃথিবী। তিনি পৃথিবীবাসীদের পাপভারে জর্জরিত হয়ে যখন একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেন, তখন দেবতাদের নিয়ে ক্ষীর সাগরের তীরে গেলেন বিষ্ণুর কাছে। প্রার্থনা জানালেন এই অবস্থা থেকে তাঁকে উদ্ধারের জন্য । সেখানেই তাঁর মুখ থেকে জানা গেল রামায়ণের যুগে দুষ্ট অসুর কালনেমি এইসময় কংস রূপে জন্মেছে, সে একেবারে সবাইকে জ্বালিয়ে মারছে। তাকে সহ্য করা যাচ্ছে না। ফলে সব দেবতার অনুরোধে পৃথিবীর ত্রাতা হয়ে বিষ্ণু কৃষ্ণ অবতারে পৃথিবীর বুকে নেমে আসতে রাজি হলেন।
যে যাই বলু, মথুরার রাজপুত্র কংস, নেহাত ভালমানুষ এই লোকটাকে একটা দৈববাণীই নষ্টপথের দিকে এগিয়ে দিল। আমরা লোকটাকে প্রথম দেখলাম তাঁর বোনের বিয়েতে। বোনের নাম দেবকী। ঘটনার দিন সবে তাঁর বিয়ে হয়েছে বসুদেবের সঙ্গে। বিয়ের পর কংস নিজে রথ চালিয়ে বোনকে প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। সে এক মহা আনন্দের কাল। সেই মুহূর্তে কারো মনে দ্বেষ বা বিষন্নতার লেশ মাত্র নেই, সমস্তই অানন্দময়, সকলেই অানন্দিত । তখন কংসের রথের পাশে পাশে নানান রঙের সাজে সেজে নর্তকীরা চলেছে নাচতে নাচতে, গায়কেরা গান গাইছে, বাদ্যযন্ত্রীরা বাদ্য বাজাচ্ছে। এমন সময় সেই কুখ্যাত দৈববাণী শোনা গেল– ‘হে মুর্খ কংস, তুমি যাকে আজ আনন্দের মধ্য দিয়ে নতুন সংসারে পৌঁছে দিতে চলেছ, তার অষ্টম গর্ভের সন্তানই তোমাকে হত্যা করবে!’ এ তো দৈববাণী নয়, যেন একসঙ্গে হাজারটা বজ্রপাত! সমস্ত আনন্দগান এক নিমেষে থেমে গেল। চরাচর ছেয়ে গেল যেন এক চরম নিস্তব্ধতায়। কংসের বুকের ভেতরে ভয়ের তুফান উঠল। দৈববাণী তো মিথ্যে হয় না, কিন্তু নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যৎবাণী তো কংস শুনতে চাননি। তাহলে কেন তাঁকে শোনানো হল? নিজের মৃত্যুর কথা শুনলে ক’জন মানুষ পারেন মাথা ঠিক রাখতে? এক্ষেত্রেও কংস বিচার বুদ্ধি হারিয়ে ফেললেন। হত্যা করতে গেলেন নিজের বোনকে। যার গর্ভে জন্ম নেবে তাঁর হত্যাকারী, সেই গর্ভধারিণীই যদি না থাকে তাহলে সে ব্যাটাচ্ছেলে জন্ম নেবে কী করে! মৃত্যু-সমস্যার মূলচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন তিনি। আর এটা করতে গিয়েই আমরা সাক্ষী হলাম তাঁর প্রথম অন্যায়ের। তারপর বসুদেব তাঁর কাছে দেবকীর প্রানভিক্ষা চাইলেন, বন্দী করে রাখতে বললেন তাঁদের, পরিবর্তে গর্ভের সব সন্তানকেই কংসের হাতে তুলে দিতে চাইলেন– কংস তাঁর কথা মেনে নিলেন এবং তার পরের ঘটনা তো সবারই জানা।
দৈববাণীর আগে কংসের কোন অন্যায়ের কথা আমরা কোন পুরাণ বা গল্প থেকে জানতে পারি না। পৃথিবীর কথায় তিনি যে অন্যায় করছেন — এই উল্লেখটুকু ছাড়া তাঁর অন্যায় ও অত্যাচারের কোন বিবরণ আমরা পাই না। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁর আসুরিক প্রবৃত্তিকে এখানে জাগিয়ে তোলা হল, তাঁকে সর্বনাশের পথে ঠেলে দেওয়া হল। সেকি কেবল ঈশ্বরের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য? এ জন্মের নিয়তি আগেভাগেই জানিয়ে দিয়ে লোকটাকে যেন গ্রিক নাটকের নায়কের মতো বিধাতার হাতের পুতুল করে দেওয়া হয়েছে। আবার সেক্সপিয়ারের নাটকের নায়কের মতো নিজের ভুল দিয়ে নিজের ট্রাজিক পরিণতিকেই যেন ডেকে এনেছেন তিনি। দৈববাণী ছিল একটা ফাঁদ মাত্র, যেখানে একটি চরিত্রের আত্মিক মৃত্যু ঘটেছ।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news