ডঃ তমাল দাশগুপ্ত :
গত ষোলোই সেপ্টেম্বর দুহাজার সতেরো তারিখে পূর্বঘোষণামত শ্রী তপন ঘোষ পদত্যাগ করেছেন হিন্দু সংহতির সভাপতির পদ থেকে। এবং নতুন সভাপতির নামও সেইসঙ্গে ঘোষণা করেছেন, দেবতনু ভট্টাচার্য হয়েছেন নতুন সভাপতি। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আমরা খুঁজে দেখব এই ঘটনার অভিঘাত, এই ঘটনার গুরুত্ব এবং এই ঘটনার ফলে ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহ কিভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
তপনবাবু প্রথম যখন পদত্যাগ করার বলেছিলেন সপ্তাহখানেক আগে, সেটি অত্যন্ত অকস্মাৎ। ২০০৮ সালে সংহতি তৈরি হয়েছিল। এই সংগঠনটি তপন ঘোষের হাতে তৈরি, তপন ঘোষই এর স্থপতি, সারা পৃথিবীতে এই সংগঠনটির অল্পবিস্তর যা পরিচয়, বিশেষ করে যারা হিন্দুত্ববাদী তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সংগঠনটির যথেষ্ট ভালো গুড উইল আছে, তো তার পুরোটাই তপন ঘোষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
যাঁরা হিন্দুত্ববাদী নন, তাঁদের মধ্যে তপন ঘোষ সম্পর্কে সম্যক ধারণা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই, হিন্দু সংহতি বাংলার সিভিল সোসাইটির মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে পরিচিত নয়। তপন ঘোষ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ থেকে বেরিয়ে এসে হিন্দু সংহতি তৈরি করেছিলেন দুহাজার সাত আট সাল নাগাদ। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্ক তপন ঘোষ আজও ব্যবহার করেন, সেখানে আর এস এস এর সঙ্গে তাঁর তেমন সঙ্ঘাত নেই। সঙ্ঘাত না থাকলেও খুব একটা সখ্যতাও নেই, কারণ প্রধানত দুটি। তপন ঘোষ বাংলায় ইসলামিক সমস্যার র্যা ডিক্যাল সমাধান চান, যেটা আর এস এস এর অনেকের কাছে উগ্রতা। দ্বিতীয়ত, বাংলার বিজেপি বা বাংলার সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে তপন ঘোষের সম্পর্ক বেশ তিক্ত। তপন ঘোষের অভিযোগ, বাংলার বিজেপি শুধুমাত্র লিপ সার্ভিস দেয়। হিন্দুরা যখন ইসলামিস্টদের হাতে আক্রান্ত তখন পথে নামে না, বা পাশে দাঁড়ায় না, সাহায্যও করে না। বাংলার বিজেপির অভিযোগ, তপন ঘোষ তৃণমূলের হয়ে কাজ করছেন, তৃণমূলকে সাহায্য করছেন।
দুপক্ষের দুটো অভিযোগেই সত্যতা আছে।
তপন ঘোষও একটা সময় অন্যান্য হিন্দুত্ববাদীদের মতই মমতার তোষণনীতির বিরোধিতা করতেন। কিন্তু অন্যান্য হিন্দুত্ববাদীর সঙ্গে এক জায়গায় তপন ঘোষের পার্থক্য হল, তিনি রাজনীতির রঙ দিয়ে বিচার না করে, ইসলামের হাতে আক্রান্ত হিন্দুর স্বার্থ যারাই দেখবে, যে-ই দেখবে, তাদের সঙ্গেই কো-অর্ডিনেট করায় বিশ্বাসী। একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, যে কংগ্রেস, তৃণমূল, কমিউনিস্ট – দল নির্বিশেষে যে অঞ্চলে যারাই লড়ছেন ইসলামিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তাদের সবার সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রেখে কাজ করতে তিনি আগ্রহী। ফলে যখন তপন ঘোষ তৃণমূলকে সমর্থন করেন, দুহাজার ষোলোর নির্বাচনে, তখন সেই একই স্ট্র্যাটেজিক কনভিকশন থেকে কাজ করছেন। হিন্দুত্ববাদের দেং জিয়াওপিং তপন ঘোষ বেড়ালের রঙ দেখায় বিশ্বাসী নন, বেড়াল ইঁদুর ধরছে কি না, সেটা দেখতেই আগ্রহী।
সমস্যা হল, হিন্দু এবং হ্যান চাইনিজ তো এক নয়, ওদের সঙ্গে আমাদের ভাবনাচিন্তার স্তরে প্রচুর ফারাক আছে। তপনবাবুর এই মমতাকে ইশুভিত্তিক সমর্থন দেওয়ার রাজনীতি, বা তৃণমূলের ভেতরে হিন্দুত্ববাদী লবি তৈরির প্রয়াস খুব একটা ভালোভাবে নেয় নি গড়পড়তা হিন্দুত্ববাদী। তৃণমূল মানেই জেহাদীদের দল, এই পারসেপশন নানাভাবে বিক্ষোভ সৃষ্টি করছে সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে, এবং সেটাকে উস্কে দেওয়ার জন্য ইন্টারনেটে বিজেপির বিশাল বাহিনীও সর্বদাই তৎপর।
তপনবাবুর পদত্যাগের পেছনে প্রধানতম কারণ এটাই সম্ভবত। হিন্দু সংহতির সভাপতি হিসেবে এই বিক্ষোভ তাঁকেই সামলাতে হচ্ছিল, পদত্যাগ করার পরে সে দায় আর তাঁর নেই। তৃণমূলের সরাসরি বিরোধিতা করার রাজনীতি নানা কারণে কাউন্টারপ্রোডাক্টিভ হতে পারে কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য থাকছেই। একে তো এই দলটার হাতে রাজ্যের শাসন আগামী দুহাজার একুশ পর্যন্ত। এই দলটির ওপরে ইসলামিস্টদের মারাত্মক প্রভাব, সেই ইসলামিস্টদের হাতেই এ দলটিকে আল্লার নামে ছেড়ে দিলে পশ্চিমবঙ্গ একটি রানঅ্যাওয়ে ট্রেনের মত এগিয়ে যেতে পারে অনিবার্য খাদের দিকে। অন্যদিকে এই দলের কিছু নেতার সঙ্গে নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে, তৃণমূলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার সুবিধা যে হিন্দু সংহতির নিচুতলার কর্মীরা, যারা মাঠে ঘাটে কাজ করেন, তারা পাচ্ছিলেন না, তা তো নয়। সরকারী দলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করার ফলে হিন্দু সংহতি বিভিন্নভাবে নিজের প্রভাব বিস্তারে সক্ষমও হয়েছে। যেহেতু হিন্দু সংহতি গ্রাউন্ড লেভেলে সক্রিয়, পুলিসের সঙ্গে নিয়মিত তাদের ডিল করতে হয়, সেটা সরকারী দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সহজে করা যায়।
কিন্তু বিক্ষোভটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হিন্দু সংহতির যে পেট্রন চাঁদা দেন, যে মধ্যবিত্ত ফেসবুকে সমর্থন করেন, এদের সকলের সামনে মমতা ব্যানার্জি বললেই হিজাব পরিহিত একটি মুখ ভেসে ওঠে, ভাসানে নিষেধাজ্ঞা ভেসে ওঠে, কবীর সুমনের মত বাংলাদেশি ইসলামিস্টদের এজেন্টদের মুখ ভেসে ওঠে। এবং স্ট্র্যাটেজি হিসেবেও যে সবসময় হিন্দু সংহতির সঙ্গে তৃণমূলের আঁতাত সফল, তাও নয়। তৃণমূলে সিদ্দিকুল্লা থেকে রেজ্জাক মোল্লা, ববি হাকিম থেকে সদ্যপ্রয়াত সুলতান আহমেদ – ইসলামিস্ট নেতার ছড়াছড়ি। হিন্দুদের কথা বলার জন্য, ইসলামিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলার জন্য কে আছেন? তৃণমূল কি আদৌ কোনওদিন শ্রী ঘোষকে তাদের মন্ত্রীসভায় নেবে?
এখানে তপন ঘোষের পদত্যাগের অন্য একটি ব্যঞ্জনা খুঁজে পাওয়া সম্ভবত প্রিম্যাচিওর, কিন্তু হিন্দু সংহতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পেছনে কি তৃণমূলে যাওয়ার বা মমতার মন্ত্রীসভায় যোগ দেওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে?
সময় বলবে।
আপাতত যে দুয়েকটি বিষয় স্পষ্ট তা হল এই। এক, হিন্দু সংহতির নতুন নেতৃত্ব তপনবাবুর ছত্রছায়াতে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে, প্রশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাবে। চাঁদা তো পৃষ্ঠপোষকরা সবাই তপন ঘোষের নামেই দেন, নতুন সভাপতির পক্ষে কাজেই তপন ঘোষের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা ছাড়া গতি নেই, এবং হিন্দু সংহতিতে তপন ঘোষের অবস্থান অনেকটা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যেভাবে কংগ্রেসের কোনও পদে না থেকেই কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রিত করতেন, সেরকম হতে চলেছে। যদিও মডারেট রাজনীতিতে গান্ধী মডেল যেভাবে সফল, র্যা ডিক্যাল হিন্দু জাতীয়তাবাদে সেই মডেল কাজ করবে কি না, সে প্রশ্ন থাকছে। কারণ র্যাকডিক্যাল হিন্দুত্বের ডিসকোর্সে বাল ঠাকরে মডেলই সাধারণত কাজ করে, গান্ধী মডেল নয়। বাল ঠাকরে শিবসেনার সুপ্রিমো ছিলেন, ছিলেন শিবসেনা প্রমুখ। হিন্দু সংহতি সেক্ষেত্রে সভাপতির ওপরে সেরকম কোনও পদ সৃষ্টি করবে কি না আগামী দিনে, সেটা এক্ষুনি বলা সম্ভব নয়।
দুই, নতুন কোনও রাজনৈতিক দল যদি তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে তপনবাবু সেখানে সময় দিতে পারবেন, যেহেতু হিন্দু সংহতিতে অন্য একজন সর্বক্ষণের সভাপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিন, তৃণমূলবিরোধী মনোভাব হিন্দু সংহতির সমর্থকদের মধ্যে এভাবেই মাথাচাড়া দিলে, এবং তৃণমূলের দিক থেকে যথেষ্ট পরিমাণে সদর্থক সাড়া না পেলে সেক্ষেত্রে আগামী দিনে নতুন সভাপতি হিন্দু সংহতির নতুন নীতি নির্ধারণ করতে পারবেন। দেবতনু ভট্টাচার্য তপন ঘোষের মতই পুরোনো সঙ্ঘী, কিন্তু তৃণমূলের প্রতি খুব একটা নরম নন বলেই সাধারণ পারসেপশন।
আগেই বলেছি, তপন ঘোষ হলেন বাংলার হিন্দুত্ববাদের দেং জিয়াওপিং। দল নির্বিশেষে, রঙ নির্বিশেষে, মতাদর্শ নির্বিশেষে বাংলায় যারাই ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান করছেন কোনও না কোনও ভাবে, তাদের এক জায়গায় আনার ব্যাপারে তপন ঘোষের ফরমুলাটির যুগান্তকারী গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আগামীর ইতিহাস বলবে, শ্রী ঘোষের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বাংলায় ইসলামিস্ট আগ্রাসন আটকাতে কতটা কাজে আসবে। কিন্তু সন্দেহ নেই, এর ফলে তপনবাবুর রাজনৈতিক কেরিয়ারে নতুন ইনিংস শুরু হওয়ার যথেষ্টই সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, সেই সঙ্গে হিন্দু সংহতির কর্মকাণ্ডের একটি কোর্স কারেকশনের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে, লোকে ভাবছে যে এরপরে সংহতি হয়ত তৃণমূলের সঙ্গ ত্যাগও করতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি যদি বিজেপি আগামী দিনে বাংলায় ক্ষমতায় আসতে চায়, তপন ঘোষের ফর্মুলা মেনেই কাজ করতে হবে। কে খাঁটি গেরুয়া, কে খানদানি সঙ্ঘী, সেসব রঙ দেখে বেছে বেছে রাজনীতি করলে সে জিনিস বাংলায় চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির মধ্যে বেশিরভাগ ট্যালেন্টকেই কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির আবর্ত টেনে নিয়েছিল, আজকে সেখান থেকেই তাদেরকে বেছে বেছে আনতে হবে, যারা কেরিয়ারের জন্য বিজেপি করবেন না, বরং বাংলায় ক্রমবর্ধমান ইসলামের আগ্রাসন ঠেকাতে যারা সদর্থক ভূমিকা পালন করবেন।
(লেখক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির অধ্যাপক)
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউবচ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
আরও পড়ুন :-
আপনাদের ভালো থাকার উপায় নিয়ে এল স্কিন ও হেয়ার স্পেশালিস্ট ড: দিপঙ্কর পোদ্দার, দেখুন ভিডিও
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news