
অঙ্কন দত্ত
রাজ্যের শাসক ঘনিষ্ঠ মহল বা মোটের ওপর যাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় তুফান তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ধনখড়ের একটি বাংলা শব্দের ব্যবহার নিয়ে। শুধুমাত্র সাধারণ নেটিজেনরা নয় নামী কবি সাহিত্যিকও এই তুফানে নিজেদের কাব্য-গদ্যের বাতাস মিলিয়েছেন। কেউ সুখপাঠ্য কবিতায় রাজ্যপালের ব্যবহৃত শব্দের চাপা মস্করা করেছেন, কেউ আবার শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছেন। যদিও অশ্লীলতা যখন এই গোত্রের বুদ্ধিজীবীদের কলমে উঠে আসে তখন যে সেটা আর অশ্লীলতা থাকে না, বৌদ্ধিকতায় পরিণত হয়, তা এতদিনে সাধারণ মানুষ জেনে গিয়েছেন, সম্ভবত মেনেও নিয়েছেন।
কি লিখেছেন রাজ্যপাল?
তা এতদিনে সকলে জেনে গিয়েছেন। জানলেও বোঝার মধ্যে কোনও খামতি আছে কি? থাকার নয়। সোজা কথা সোজা ভাবেই বলা। তবে তাঁর টুইটের মূল ভাব ও সম্পূর্ণ বক্তব্য টি এড়িয়ে গিয়ে, একটি মাত্র শব্দ বেছে নিয়ে, বক্তব্যটিকে খণ্ডিত ভাবে বোঝার বা বোঝানোর কোনও দায় কারও কারও থাকতে পারে।
এ হেন হল্লা ব্রিগেডের অভিযোগ তিনি নাকি ট্যুইটারে বলেছেন, আমফানের ফলে ‘ন্যূনতম’ ক্ষতি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের। এমন একটা কাণ্ড রাজ্যপাল করলেন জনমানসে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। বিক্ষোভ প্রদর্শনও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ঠিক কী বলেছেন রাজ্যপাল?
“আমি গত কয়েকদিন ধরে ক্রমাগত বিভিন্ন এজেন্সির সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছিলাম। তাদের দায়িত্ববোধ ফলে ন্যূনতম ক্ষতি হয়েছে।” ~ এই হল মহামহিম রাজ্যপালের বক্তব্য।
সাফ বোঝা যাচ্ছে, উঁনি কখনওই বোঝাতে চান নি যে আমফানের ফলে সামান্য ক্ষতি হয়েছে ; বরং কেন্দ্র ও রাজ্যের যে সমস্ত সংস্থাসমূহ বিপর্যয় মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের দায়িত্ববোধ এবং সক্রিয়তার ফলে ন্যূনতম অর্থাৎ যতটা সম্ভব কম ক্ষতি হয়েছে, নাহলে আরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারত, এই কথাটি বোঝাতে চেয়েছেন রাজ্যপাল। ইংরেজি শব্দ প্রয়োগ করে বলা যেতে পারে, এজেন্সিগুলোর তৎপরতার ফলে ক্যাজুয়াল্টি যতটা সম্ভব মিনিমাইজ করা সম্ভব হয়েছে। এখন, ন্যূনতম শব্দের অর্থ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে এই বিতর্ক হয়ত হত না। যাই হোক, একটা উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে। যেমন, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ৫ লক্ষ মানুষকে প্রশাসন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বিপজ্জনক স্থান থেকে সরিয়ে এনেছিল আমফানের ল্যান্ডফল হওয়ার আগে। এদের তৎপরতা এবং দায়িত্বজ্ঞানের ফলে অনেক নিরীহ প্রাণ বেঁচে যায়! দুর্যোগ মাথায় নিয়ে এমন অজস্র সরকারি এবং বেসরকারি এজেন্সি কাজ করে চলেছে। এবার রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে এইসমস্ত কাজে যুক্ত এজেন্সিগুলোর মনোবল বাড়ানোর জন্য তাঁদের উদ্দেশ্যে উঁনি এই কথা বলতেই পারেন।
তাঁর পরবর্তী ট্যুইট-এ পরিষ্কার উল্লেখ করা আছে, “এটি ( আমফান ) একটি বিনাশকারী ছাপ রেখে গেছে যা বহু দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ।” অর্থাৎ স্পষ্টতই তিনি সাইক্লোনের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষয় রাজ্যপাল ছোট করে দেখেন নি, বরং যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়েছেন।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে তাঁর ‘ন্যূনতম’-শব্দবিশিষ্ট ট্যুইটটির রাজনীতিকরণ এবং অপব্যাখ্যা হতে খুব একটা সময় লাগেনি। প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক লড়াই লড়তে গিয়ে রাজনৈতিক বাঙালির কাছে বাঙালির ভাষাজ্ঞান আজ পরাজিত হল কি? রাজনৈতিক বিরোধিতার চশমা পরে সবকিছু বিচার করলে বাঙালির বাংলাজ্ঞানও লোপ পেতে পারে, তেমন ছবিই কি উঠে এল আজ?
নাকি একটি শব্দ তুলে নিয়ে, তার অপব্যখ্যা করে, হলুদ সাংবাদিকতাকেও লজ্জা দিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁদের মতামতের গুরুত্ব আছে তাঁরা?
যাঁরা যে কোনও নামী কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকদের যে কোনও পোস্টের তলায় কখনও ‘চাবুক’, কখনও ‘অসাধারণ’, কিংবা ‘মেরুদণ্ডের তফাৎ’, এই ধরনের প্রশস্তিমূলক শব্দ বা বাক্য লিখে বাহবা দেন, তারা সাধারণত তাঁদের মত করে ভাবেন, বোঝেন। কিন্তু যাঁরা ভাবান বা বোঝান? তাঁদের থেকে আর একটু দায়িত্ববোধের পরিচয় পেলে হয়ত ভাল হত।
রাজভবন কালীঘাট নয়, রাজনীতির কেষ্টবিষ্টুদের আখড়াও নয়, তাই সেখান থেকে আশঙ্কার কিছু নেই বলে কি রাজ্যপালকে শব্দ জব্দ করতে এত সহজে মেতে উঠলেন নেটিজেনরা? উঠছে প্রশ্ন। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে তাঁদের বাংলা ভাষার বোঝাপড়া নিয়েও। একথা ঠিক, রাজভবন থেকে রাজ্যপালের তরফে যিনি এটি লিখেছেন তিনি ন্যূনতম শব্দটি ঠিক জায়গায় ব্যবহার করেন নি। তাই বলে ন্যূনতম শব্দের অর্থ যে সামান্য নয় সেটা বুঝতে পারা তেমন কঠিনও নয়। অন্তত বাংলাভাষার ন্যূনতম বোধটুকু থাকলে। একই সঙ্গে অন্য কোনও অভিপ্রায় বা অভিসন্ধি না থাকলে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news