Home / TRENDING / পাতাল পথে গৌরকিশোর, মেরুদণ্ডী সাংবাদিকতার পথ খোলা রাখছেন তো মুখ্যমন্ত্রী!

পাতাল পথে গৌরকিশোর, মেরুদণ্ডী সাংবাদিকতার পথ খোলা রাখছেন তো মুখ্যমন্ত্রী!

 

 

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়  :

 

একটি কারা কাহিনি। ঋণসূত্র- প্রয়াত লেখক, সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ। স্বকর্ণে শোনা এ কাহিনির সারমর্মের সঙ্গে আজকের দিনের একটি বিষাদ গাথার প্রচ্ছন্ন সম্পর্ক আছে বলেই এই কাহিনির বর্ণনা।

জরুরি অবস্থা। গৌরকিশোর তখন মিসায় আটক। জেলখানায় একদিন ফিসফাস থেকে হইচই। কেন? না বন্দিদের বক্তব্য, যে খাবার পরিবেশিত হচ্ছে, তা অখাদ্য। মাঝে মধ্যে খাবারে এক-আধখানা মাছের টুকরো মিললেও তা একেবারেই দুর্গন্ধযুক্ত। জেলের বন্দিদের অভিযোগ শুনে, স্টোরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি অত্যন্ত চোটপাট করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বন্দিদের বক্তব্য মোটেই ঠিক নয়। এই কথা কানে আসায় গৌরকিশোর জেল সুপারের কাছে একটি চিঠি পাঠালেন, যা মোটামুটি নিম্নরূপ।

মাননীয় জেলসুপার মহাশয়,

আমি আপনার কারাগারের বিচারাধীন বন্দী। প্রতিদিন দ্বিপ্রাহরিক আহারের সময় আমার পার্শ্বে একটি মার্জার আসিয়া বসিয়া থাকে। মৎস্যখণ্ডের আঁশটা, কাঁটাটা সে প্রত্যাশা করে। কিন্তু কয়েকদিন হইল, মৎস্যের কিঞ্চিত টুকরা তাহার মুখের সামনে দেওয়া হইলে সে তাহার গন্ধ শুঁকিয়া, খাইতে প্রত্যাখ্যান করিয়া সেল হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়। এই কথা কর্ণগোচর হইবা মাত্র, আপনার স্টোরকিপার নাকি অগ্নিশর্মা হইয়াছেন এবং চিৎকার করিয়াছেন। এইখানেই আপনার কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, পোয়াতি মায়ের ব্যথ্যা উঠিলে তাহার চিৎকারে পড়শিদের ঘুম মাথায় ওঠে। আমার প্রশ্ন ঠিক এখানেই। মৎস্য অখাদ্য হইলে তো সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের ব্যথা উঠিবার কথা, অথচ লক্ষ্য করিতেছি, ব্যথা উঠিতেছে আপনার স্টোরকিপারের। কেন এমন হইল? এই সংশয়ের উত্তর পাইতেছি না। আপনি যদি আমার সংশয় নিরসন করেন তাহলে বাধিত হই, ইত্যাদি ইত্যাদি………

কাহিনির ক্ল্যাইম্যক্স এখানে নয়।

পরদিন সকালে নিজের সেল-এ মেঝেতে বসে যখন গৌরকিশোর সংবাদপত্র পড়ছেন অথবা কিছু লিখছেন (এই অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়েছিল), তখন দেখলেন এক পদযুগল ধীরে ধীরে তাঁর কাছে এসে থামল। তাকিয়ে দেখলেন, মূহ্যমান এক বাঙালি বাবু দাঁড়িয়ে আছেন। বলুন, বলুন- গৌরকিশোরের সপ্রশ্ন চাহনি। বাঙালি বাবুর মুখে কথা ফুটল- গৌরবাবু, কাল আপনি যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তা সুপার সাহেব সমস্ত কয়েদির সামনে পাঠ করে শুনিয়েছেন। তারপর থেকে কয়েদিরা আমাকে ‘পোয়াতিবাবু’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। আমার তো বাইরে বেরনোই বন্ধ হয়ে গেছে।

আজ যখন একদিকে এই নিরপেক্ষ সাংবাদিকের নামে সরকার মেট্রো স্টেশনের নামকরণ করতে যাচ্ছে তখন বাংলার সাংবাদিকদের অবস্থা ক্রমাগতই শোচনীয়। দিল্লির সরকারও যেমন ফতোয়া দিচ্ছে এ রাজ্যও তাই। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও অপ্রকাশ্যে। সাংবাদিকরা কী করবেন, কী লিখবেন, তাদের সাধের কাজ থাকবে কিনা, সমস্ত বিষয়ে সরকারের অঙ্গুলি হেলনের ওপরেই ভরসা করে থাকতে হচ্ছে। সাংবাদিকতার অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সংবাদ মাধ্যমও নিরুত্তাপ, নিরুত্তেজ। একদিকে সরকার, অন্যদিকে সংবাদ মাধ্যমের মালিক-দুইয়ের মাঝে পড়ে সাংবাদিকতা আজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের অপেক্ষায়। অথচ যার ব্যথা হওয়ার কথা তারই  ব্যথা ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অধিকার হরণের পরেও সাংবাদিকরা আজ অস্বাভাবিকরকম নীরব। এই মুহূর্তে তাহলে ‘পোয়াতি বাবুর’ ভূমিকাটি ঠিক যে কার, সে সংশয়ে আমিও তাড়িত হচ্ছি।

আজ গৌরকিশোর বেঁচে থাকলে কী করতেন, একটু আন্দাজ করা যাক। পাহাড় যখন অগ্নিগর্ভ তখন তিনি অবশ্যই পাহাড়ে পৌঁছে সমস্যার সম্যক রূপটি বোঝার চেষ্টা করতেন। হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে কালি ছেটানো হত, হয়তো তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হত, কিন্তু সাধারণ মানুষ এটুকু জানতে পারতেন, মোর্চার মিছিলে কেন গুলি চলেছিল। সে সব গুলি সমতলজাত নাকি পাহাড়জাত সেকথাও তিনি জানিয়ে দিতেন খোলসা করে। তাতে তাঁর নামে হয়তো মেট্রো স্টেশনের নামকরণ অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যেত। তবু, তিনি সেটাই করতেন। জোর দিয়ে এ কথাটা যে বলতে পারছি, তার কারণ, তিনি নিজেই এরকম অনাগত ভবিষ্যতের কথা আগাম জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বলছেন, ‘আমার বিষাদের বড় কারণটি হচ্ছে এই, সংবাদপত্রে প্রতিদিনের প্রতিভা ব্যয় করে আমরা যে জগৎটা পরিবেশন করছি, তার সঙ্গে পঞ্চভূতে নির্মিত যে জগতে নিয়ত আমরা বাস করি তার সম্পর্ক খুবই কম। আমাদের পরিবেশিত জগৎ এবং বাস্তব জগতের ব্যবধান গত পঁচিশ বছরে আমরা কমিয়ে আনতে পারিনি। দেশের যে ছবিটা আমরা ফুটিয়ে তুলি, তা আংশিক, বড় অংশটাই আমাদের ক্রিয়াকর্মের বাইরে পড়ে থাকে।’

এরপর আরও নির্মমভাবে বলছেন, ‘আমরা সাংবাদিকরা কখনও জ্যোতিবাবুর ঢাকের বাঁয়া হব, কখনও বা সিদ্ধার্থশঙ্করের, কখনও বা শ্রীমতি গান্ধীর? অথবা অন্য কোনও অনাগত বিধাতার? কখনও চেষ্টা করব না তার বাইরে বেরিয়ে আসার? কেননা তাতে ঝুঁকি আছে? অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে? প্রতিষ্ঠা খর্ব হতে পারে?

নাকি দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার যোগ্যতার অভাব আছে আমাদের?’

হায় রে গৌরকিশোর!

Spread the love

Check Also

আপনারা সরকারের মুখ বলে আধিকারিক দের বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর।

চ্যানেল হিন্দুস্থান ডেস্ক: রাজ্যের আমলাদের উজাড় করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার প্রথমে নতুন করে সংস্কার হওয়া …

WBCS দের সভা থেকে কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

চ্যানেল হিন্দুস্থান ডেস্ক: WBCS দের সঙ্গে বৈঠক, আর সেখান থেকেই করা বার্তা রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের। …

বন্ধ ব্যান্ডেল জংশন

চ্যানেল হিন্দুস্থান ডেস্কঃ রুট রিলে ইন্টারলকিং কেবিন স্থানান্তর ও থার্ড লাইন সম্প্রসারণের জন্য হাওড়া-বর্ধমান মেইন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *