পার্থসারথি পাণ্ডা :
আজও আবার বন্ধুতার ব্যক্তিগত গল্পই শোনাব। সেসব গল্প, তাও ধরুন হল গিয়ে প্রায় কুড়ি কুড়ি বছর পারের কথা—
তখন আমাদের একটি তিরতিরে নদী ছিল। দুই ঠোঁটের ফাঁকে ফিনিক ফোটা হাসির মতন কলকল করে, পাড়া-মাতানো উচ্ছল কিশোরীটির মতো এক্কাদোক্কা পায়ে নুড়ি মাড়িয়ে বয়ে যেত সে। চাঁদের রাত আর রোদমাখা দিনের সাথে তার ছিল আদিম সখ্য, দেখা হলে চিকচিক করে উঠত তার গা-ভরা বালু, ঝিকমিক করে উঠত বুক-বাওয়া জল। তার এ-পারে ছিল আমাদের গাঁ, আর-পারে অন্য কারও। পরপারে দাঁড়িয়ে, এ-পারে তাকালে, ঠিক যেখানটায় একরাশ টগরের ঝাড় দেখা যেত, নদীর গা-ছুঁয়ে সেইখানে ছিল আমাদের প্রিয় পাঠশালা। সুযোগ বুঝে কতদিন কত ছুতোনাতায় পাঠশালে পাততাড়ি ফেলে পাড়াময় চরকি দিয়েছি, সেই তালে পন্ডিতমশাই অব্দি চেয়ারের হাতলে দুই পা তুলে ঢুলতে শিখে গেলেন; কিন্তু, টগরদের ভাই বলিহারি যাই, বারোমাস ডালে ডালে তাদের থোকা থোকা ফুল, ফাঁকিটা কিছুতেই আর শেখানো গেল না! মেয়েগুলো সব পুটুস পুটুস ফুল তুলে পটাপট মালা গাঁথতো যখন তখন—স্বয়ম্বরা হতে নয়, নিজেদের গায়ে-গলায় পরে আজব শখ মেটাতে। আমার মতো অলপ্পেয়েও তুলে আনত মুঠো মুঠো ফুল, জলভেজা ন্যাতা শুকিয়ে গেলে সেই ফুল রগড়ে শেলেট মুছত সারাদিন। আর যারা ঠিক আমার মতো নয়, তারা এই টগর দিয়ে সাক্ষী মেনে ঘটা করে একে অপরের স্যাঙাৎ হতো, ‘ফুল’ পাতাতো।
‘ফুল’ পাতাতে লাগত শুধুই ফুল, যে কোন ফুল। আমাদের ছিল অঢেল টগর। অল্পদিনেই পাঠশাল হয়ে উঠল ‘ফুলে’র কেয়ারিবাগ, এ-ওর ‘ফুল’, সে-তার। কেবল আমার পোড়া কপালে তখনও কোন ‘ফুল’ জোটেনি, হয়তো তেমন গা-করিনি বলে। কিন্তু পয়ার তো আর অমিল থাকে না, মিল খুঁজে নেয় ঠিক। আমারই এক সহপাঠী, ফাঁকিবাজিতে আমার চেয়ে এককাঠি। কোত্থেকে পাক্কা ঠাকুমা-ভাবের এক সহপাঠিনীকে খুঁজে পেতে ধরে আনল। ‘ফুল’ পাতিয়ে পাতিয়ে সে নাকি বুড়ি! তার কথাটুকুনিই শাস্তর বাক্যি, সুতরাং শিরোধার্য। তাই সে যেমন যেমন বলল, আমরা তেমন তেমন করলাম। সে আচার বড় সহজ—
আমরা দুই বন্ধু মুখোমুখি বসলাম, দুজনের দুই হাতে ফুল। ও আমার দুই কানে ফুল গুঁজে দিল, আমি দিলাম তার। তারপর আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলে তার ডান হাতের কড়ে আঙুল ছুঁইয়ে ও আমায় বলল, ‘ফুল’। আমি বললাম, ‘ফুল’। ব্যাস, এই। এতেই, আমরা দুজনে ‘ফুল’ হয়ে গেলাম।
একবার ‘ফুল’ পাতানো হয়ে গেলে আর একে অপরের নাম ধরে ডাকা চলে না। সে আমায় ডাকে ‘ফুল’, আমিও তাকে তাই ডাকি। এরপর পাঠশালে দুজনে পাশাপাশি বসা, একসঙ্গে ঘোরা, জলে-জঙ্গলে-ডাঙ্গায় পিছুটি ছাড়ার নাম নেই। দুজনের বুকের সিন্দুকে জমতে লাগল এক একটি করে দুজনের গোপন প্রাণের কথা, বাইরের আর পাঁচ জন সেসব টেরটিও পেল না।
কিন্তু, তখন কি আর জানতাম কিশোরীর মতন উচ্ছল আমাদের সেই নদীটার পেটে পেটে এত! সে কুল ভেঙে বেমালুম গিলে ফেলবে আমাদের প্রিয় টগরের গাছ, পাঠশালার ঘরদোর; আর তার স্রোতের আবর্তে পাক দিতে দিতে বয়ঃসন্ধি পার দুজনকে দুই কিনারায় এনে ফেলবে! হায়, নদী যে কারও কথা শোনে না!
পাঠশালার পাড় ভাঙল, টগরের বাগান হারিয়ে গেল। আর তারই মাঝে এই নদীরই পাড় ঘেঁষে আমাদের যে বাড়ি, সেখানে বসন্তের আকাল হল না। সেখানে ‘ফুলে’র ছড়াছড়ি। বাঁকুড়ার সেই বাড়িটাকে তখন যদি কেউ ‘ফুলবাড়ি’ বলতে চাইত, বলতেই পারতো। কারণ, আমার মা-বাবা-জেঠা-জেঠি-দাদা-দিদিদের সকলেরই ‘ফুল’ ছিল। মায়ের ‘ফুল’কে আমরা ‘ফুলমা’ বলতাম। জেঠার ফুলকে বলতাম ‘ফুল জেঠা’ আর জেঠিমার ফুলকে ‘ফুল জেঠি’। কেবল দাদা-দিদিদের ফুলেদের সঙ্গে ‘ফুল’-ঘটিত কোন সম্পর্ক হতো না।
যদিও স্ত্রীপুরুষে ‘ফুল’ পাতাতে সচরাচর দেখা যেত না, কিন্তু আমার বাবা ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তাঁর ‘ফুল’কে আমরা বলতাম ‘ফুলকাকি’। বাবা একবার পুরী গিয়েছিলেন, সহযাত্রী ছিলেন আমার ফুলকাকি। পথে বিপদে পড়ে বাবার কাছে সাহায্য পেয়ে ফুলকাকি ইচ্ছে জানিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে ‘ফুল’ পাতানোর। তখন তাঁরা সাক্ষী গোপালে। দুজন দুজনের হাতে ফুল দিয়েছিলেন, বলেছিলেন—
‘সাক্ষী গোপাল তুমি সাক্ষী,
আমরা দুজন ফুল পাতাচ্ছি।’
বিয়ে বা রক্ত সম্পর্কের বাইরে এমনতর বন্ধুত্ব পাতানোর মধ্য দিয়ে এভাবেই আবহমান কাল ধরে গড়ে উঠত এক নতুন সামাজিক বন্ধন। উৎসব অনুষ্ঠানে সপরিবারে আসাযাওয়া চলত, উপহার দেওয়া-নেওয়া হতো। এমনি করে লোক-লৌকিকতার মধ্য দিয়ে নিছক ব্যক্তি ছাড়িয়ে পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হতো। লোকে সেই সম্পর্কের নাম দিত—‘ফুল পরাণ’।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news