কিশোর ঘোষ

পুরস্কার দেওয়া শুরু হতেই যে মুষলধারা নামল, তা যেন ৪২ লক্ষ ক্রোয়েশিয়ানের কান্না। ফলে ওই বৃষ্টিতে ভিজলেন ক্রোয়েশিয়ার সুন্দরী রাষ্ট্রপতিও। সেইসঙ্গে কাকভেজা হলেন ফিফা সভাপতি, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপ্রধান, এমনকী ভ্লাদিমির পুতিন পর্যন্ত। যদিও বৃষ্টি বা কান্না আগেই শুরু হয়ে গেছিল। প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেও চাম্পিয়ান হতে না পারার বেদনায় নির্ধারিত সময়ের বাঁশি বাজতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন লুকা মদ্রিচ, র্যাকিটিচ, পেরিসিচ, ভিদারা। কারণ ফুটবলের মতো নির্মম খেলা দুটো হয় না। কারণ ফ্রান্সের মেধাবী ফুটবলের কাছে হেরে গেল ক্রোয়েশিয়ান আবেগ।
নব্বই মিনিটের রুদ্ধশ্বাস খেলায় ৬৫% বল নিজেদের দখলে রেখেও ৪-২ গোলে হারতে হল ক্রোয়েশিয়াকে। মারিও মাঞ্জউকিচ যা করলেন তা ক্ষমার অযোগ্য। বিশ্বকাপ ফাইনালে আত্মঘাতী গোল করে ফেলার মতো অন্যায় ভাবাই যায় না! যদিও সমানে সমানে খেলা হচ্ছিল। এমনকী প্রথমার্ধ দেখে বোঝার উপায় ছিল কারা জিতবে। সে কথাই প্রমাণ করে ইভান পেরিসিচের সমতা ফেরানোর গোল। যদিও হাফটাইমের বাঁশি বাজার আগে ফ্রান্সের তারকা ক্যাপ্টেন গ্রিজম্যান পেনাল্টিতে গোল করে ২-১-এ এগিয়ে দেয় ফ্রান্সকে। এরপর রুদ্ধশ্বাস ফার্স্ট হাফের মতোই সেকেন্ড হাফেও ফ্রান্সের ট্যাকটিকাল ফুটবলের সঙ্গে ক্রোয়াশিয়ার সোনালি প্রজন্মের দুর্দান্ত লড়াই দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল স্টেডিয়ামের এবং টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা গোটা পৃথিবীর ফুটবল ‘পাগল’ দর্শক। কিন্তু সেকেন্ড হাফে ভিদার নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়ান রক্ষণ একের এক ভুল করতে থাকে। এবং সেই সুযোগে প্রথমে পোগবা, পরে আগামী দিনের তারকা এমবাপে গোল করে ব্যবধান বাড়িয়ে দিল। বলতেই হয় পোগবা ও এমবাপে চমৎকার গোল করলেও তা আসলে ক্রোয়েশিয়ান রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মুহূর্তের গা ছাড়া মনভাবের ফসল। দুই ক্ষেত্রেই ঠিক মতো ব্লক করা হল না। যদিও উল্টো দিকে মদ্রিচের নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ, দুটো ইউং দুর্দান্ত খেলে চলেছে তখনও। একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়ছে ফ্রান্সের রক্ষণে। গোলার মতো একটা শটে কোনওরকমে বাঁচালেন ফ্রান্সের গোলকিপার। কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮-এর ফাইনাল শেষ হয়ে গেছিল ৭০ মিনিটেই।

যখন এমবাপে ৪-১ গোলে এগিয়ে দেয় জিনেদান জিদানের দেশকে। এরপর ফ্রান্সের গোলকিপারের ভুলে ক্রয়েশিয়া ৪-২ করলেও জেতা প্রায় অসম্ভব ছিল। হলও তাই। এবং ১৯৯৮-এর পর ফ্রান্স ফের কাপ প্যারিসে নিয়ে গেল। কুড়ি বছর পর তাঁরা ফের বুঝিয়ে দিল কেন ফ্রান্স বিশ্বের সেরা ফুটবল শক্তিগুলোর অন্যতম। আর আধুনিক ট্যাকটিকাল ফুটবল বুঝিয়ে দিল—এই খেলাটা একজন লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নয়। বরং যে দেশ দল হিসেবে ভালো তারাই আসলে ভালো। তাই অঘটনের বিশ্বকাপে একে একে ছিটকে যেতে দেখেছি জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের মতো বড় শক্তিগুলোকে। অপরপক্ষে নজর কেড়েছে বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়া। যাঁদের দলে একাধিক বড় খেলোয়াড় আছে কিন্তু একজন তারকার উপর নির্ভরশীল ছিল না যাঁরা। তবু প্রথমবার ফাইনালে উঠে যদি বিশ্বকাপটা হাতে নিতে পারতেন লুকা মদ্রিচ তাহলে বোধ হয় অঘটনের চরম হত।
কিন্তু তা হল না। কারণ ‘অঘটন’ আসলে অঘটন ছিল না। কারণ যে ‘বড়’ দলগুলো কাপ জয়ের রেস থেকে ফুটে গেছে তাদের ফুটবল ঐতিহ্য থাকলেও দলগত সংহতি ছিল না এবার। যাক গে, ক্রোয়েশিয়ান কিংবদন্তী দাভর সুকের হয়তো অতি দুঃখেও কিছুটা আনন্দ পেয়েছেন। কিছুদিন আগেই যে তিনি বলেছিলেন, লুকা এই পৃথিবীর অন্যতম সেরা প্লেয়ার। ব্যালেন ডিওর পাওয়ার যোগ্য। সুকেরের স্নেহের লুকাই রাশিয়া বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ায় সুকের নিশ্চই খুশি হয়েছেন। আহা, বৃষ্টিভেজা রাতে গোল্ডেন বল হাতে লুকা মদ্রিচ যেন পোয়েটিক জাস্টিস।
কান্নার মুষলধারায় এক টুকরো ক্রোয়েশিয়ান আনন্দ।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news