Breaking News
Home / সম্পাদকীয় / রাজীব কুমার: অন্তর্ধান না অপহরণ? ফেলুদার কপালে ভাঁজ

রাজীব কুমার: অন্তর্ধান না অপহরণ? ফেলুদার কপালে ভাঁজ

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:

আচ্ছা ফেলুবাবু মিত্র কাফের মিত্ররা কি আপনাদের আত্মীয়?
প্রশ্নকর্তা আর কেউ নন, রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলি। ফেলুদা সংক্ষেপে জবাব দিল, ‘না।’
এই ধরনের প্রশ্ন লালমোহন বাবুর কাছ থেকে অভিপ্রেত। কিন্তু পরের প্রশ্নটার জন্যে ফেলুদা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। জটায়ু জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে আর্মহাস্ট স্ট্রিটের মিত্ররা? মানে সোমেন মিত্র?
ফেলুদা খানিকক্ষণ জটায়ুর দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত ভাবে বলল, কোনও বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে দু’জন অপরিচিত ব্যক্তির একই রকম মতামত থাকতেই পারে এবং সেটা কোনওরূপ আত্মীয়তা ছাড়াই।
উত্তর শুনে জটায়ু বেশ নিশ্চিন্ত হলেন বলে মনে হল। বললেন, খবরটা তাহলে আপনিও পড়েছেন। আমি তো পড়েই ভাবলাম আপনাকে ফোন করব। তারপর ঘড়ি দেখে মনে হল এটা আপনার যোগাসনের সময়। তাই আর বিরক্ত করলাম না।
তাই সোজা আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন। বলল ফেলুদা।
লালমোহন বাবু একটু লজ্জিত হয়ে বললেন, ঠিক তা নয়! পুজো সংখ্যার চাপে তো আসতেই পারিনি কতদিন। তারপর এখন আবার নতুন চাপ। ওইসব পোর্টাল না কী যেন বলে। ওরা সব পুজো সংখ্যা করছে। ওদেরও লেখা দিতে হল। সব মিলিয়ে দেরি হয়ে গেল। আপনার কাছে মানে আপনাদের কাছে না এলে জীবনটা কেমন নীরস লাগে মশাই।

‘আপনাদের’ কথাটা বলেই জটায়ু একবার আমার দিকে চাইলেন।
ফেলুদা বলল, রাজীবের মৃত্যুর আশঙ্কা যখন সোমেনবাবুর মত অভিজ্ঞ রাজনীতিক করছেন তখন বিষয়টা আমায় আরও একটু বেশিই ভাবাচ্ছে।
সম্প্রতি একাধিক নিউজ পোর্টালে খবরটা বেরিয়েছে। এমনকী সোমেনবাবু নিজে টুইটও করেছেন। বলেছেন রাজীবের প্রাণহানির আশঙ্কা আছে।
লালমোহনবাবু বললেন, একটা বিষয় কি খেয়াল করেছেন ফেলুবাবু? আপনার খবরটা পোর্টালে বেরোবার পরেই সোমেনবাবু এই মন্তব্য করেছেন।
বাজারে চারমিনার বন্ধ হয়ে যাবার পর বিরক্ত ফেলুদা কিছুদিন পাইপ টানছিল। কিন্তু পাইপে অনেক ঝামেলা দেখে ফেলুদা এখন সিগার ধরেছে। একটা সিগার ধরিয়ে ফেলুদা শুধু বলল, হুম।
এই কয়েক বছরে কলকাতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ত্রিফলা আলো, ল্যাম্পপোস্টে জড়ানো ঝিকিমিকি আলো যেমন হয়েছে তেমনই সাবেক চারমিনার বিদায় নিয়ে ফেলুদার দু’আঙুলের ফাঁকে উঠেছে সিগার। আর লালমোহনবাবুর পুরনো অ্যাম্বাস্যাডারের পরিবর্তে এসেছে নতুন গাড়ি।
প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলুদা লালমোহনবাবুকে জিজ্ঞেস করল, আপনার নতুন বাহনটি যেন কী?
লালমোহনবাবু সহাস্যে বললেন, আজ্ঞে পিউগট। ফেলুদা ভুরু কুঁচকে আবার জানতে চাইল, কী? কী নাম বললেন? লালমোহনবাবু আবারও বললেন, আজ্ঞে পিউগট। ফরাসি গাড়ি। এবার পুজো সংখ্যার অনেকগুলো গল্পে এই গাড়ির কথা আমি লিখেছি। এমনকি আমার অ্যম্বাসাডার চলে যাওয়ার দুঃখের কথাও লিখেছি।
ফেলুদা বলল, গল্পেও কি ওই পিউগট শব্দটাই লিখেছেন?
লালমোহনবাবু থতমত খেলেন। বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই তিনি কোনও গণ্ডগোল করেছেন। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফেলুদার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি যা বললেন তার অর্থ আমার জানা নেই। হ্যাঁ আর না-এর মাঝামাঝি অবস্থানে গিয়ে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘হান’!
ফেলুদা বলল, গল্পগুলো বইয়ের আকারে বেরোলে শুধরে নেবেন। উচ্চারণটা পিউগট নয়, পুজঁ। ফরাসি গাড়ি যখন উচ্চারণটাও তো ফরাসি হবে নাকি? বাক্যের শেষ কথাগুলো একটু নরম করে বলল ফেলুদা।
ঠিক এই সময় ডোর বেল বেজে উঠল। দু’মিনিট পরে আমাদের বসার ঘরে তিনজন ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন। তাঁদের দেখেই ফেলুদা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানাল। আমার ও লালমোহনবাবুর সঙ্গে আলাপও করিয়ে দিল। প্রথম যিনি ফেলুদার সঙ্গে করমর্দন করলেন, তাঁর পরনে ক্রিম রঙের হাফশার্ট আর বাদামী রঙের কর্ডের প্যান্ট। চুল ছোট করে ছাঁটা, চোখে চশমা। স্টাব করা দাড়ি গোঁফ, ধবধবে ফর্সা গায়ের রং। বাঁ হাতে দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি। চোখের দৃষ্টি গভীর।
দ্বিতীয়জন সম্ভবত দক্ষিণ ভারতীয়। ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা। পেটানো চেহারা। পরনে নীল টি-শার্ট ও ডেনিম প্যান্ট। বাঁ হাতের কবজিতে দামী স্পোর্টস ওয়াচ আর ডান হাতে ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড। বড় বড় চোখ। গায়ের রং কুচকুচে কালো। ব্যাকব্রাশ করা তেল বা ক্রিম চুপচুপে চুল।
তৃতীয় ভদ্রলোক এদের মধ্যে বেমানান। পরনে সাদা রঙের ঢোলা পাজামা আর পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বুকে নীল কারুকাজ। হাতে ধরা একটা আদ্যিকালের নোকিয়া তেত্রিশ দশ মোবাইল। মাথার চুল অল্প। স্টিল ফ্রেমের চশমা। দাড়ি নেই তবে গোঁফ আছে। এই ভদ্রলোকের হাতে কোনও ঘড়ি নেই। চোখে অতি ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট। উনি করমর্দন করলেন না, ফেলুদাকে নমস্কার করলেন। আমাদের দিকে ফিরেও চাইলেন না। নিজেই এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। বললেন, মিস্টার মিত্র সময় বেশি নেই। চট করে আপনার সঙ্গে দুটো কথা বলেই বেরিয়ে যাব। ফেলুদা ওই ভদ্রলোকের দিকে না তাকিয়ে বাকি দু’জনকে বলল বসুন। বাকি দু’জন ভদ্রলোক সোফাতেই বসলেন। জটায়ু বসলেন ফেলুদার ঠিক উল্টো দিকের কাউচে। আমি একটা চেয়ার টেনে নিলাম। ফেলুদা তাঁর আসনে বসে ওই ব্যস্তসমস্ত ভদ্রলোকের দিকে তাকাল। বলল একটু শান্ত হোন। আপনার তো আমার কাছে আসার কথা ছিল না। কী এমন হল যে অ্যসাইনমেন্ট ছেড়ে আমার কাছে ছুটে আসতে হল!
ভদ্রলোক বললেন, মিস্টার মিত্র অনেক শুনেছি যে আপনার চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। ঠিকই বলেছেন। আমার আসার কথা ছিল না। আমি অ্যসাইনমেন্ট থেকে চলে এসেছি। আসলে আমি ওকে দেখেছি মিস্টার মিত্র।
ফেলুদার কপালে ভাঁজ পড়ল। বলল, আপনি নিশ্চিত? যাকে দেখেছেন সে ও?
ভদ্রলোক বললেন, নাইনটি পারসেন্ট নিশ্চিত। ও ছদ্মবেশে রয়েছে। দাড়ি গোঁফে মুখ ঢাকা। চোখে সানগ্লাস।

আপনি চিনলেন কী করে? ফেলুদা জানতে চাইল।
ভদ্রলোক বললেন, মিস্টার মিত্র ও ওর সব কিছু আড়াল করেছে কিন্তু ওর হাঁটার ধরনটা বদলাতে পারেনি। যতীন দাস পার্ক মেট্রো থেকে বেরিয়ে ও অটো স্ট্যন্ডের দিকে হেঁটে যায়। আমি তখন ওকে দেখি। সেই হাঁটা। মেট্রো থেকে বেরিয়ে দু’দিকে তাকালো, সেই তাকানো।
ফেলুদা গম্ভীর হল। বলল, তাহলে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, আমি যে আশঙ্কাটা করছিলাম সেটা সত্যি নয়। ও বহাল তবিয়তেই আছে।
ভদ্রলোক বললেন, আপনার আশঙ্কা এখনও সত্যি হয়নি এটা হয়ত ঠিক, কিন্তু কাল যে সত্যি হবে না তার গ্যারান্টি তো পাচ্ছি না।
ফেলুদা বলল, কেন এমন মনে হচ্ছে আপনার? ভদ্রলোক বললেন, ওর আশেপাশে কিছু লোক রয়েছে। এমন ভাবে রয়েছে যেন এমনিতে মনে হয় ওরা সকলে ইনডিভিজুয়াল। তবে একটু পরখ করে দেখলে বোঝা যাবে ওরা আলাদা আলাদা এনটিটি নয়। ওরা একসঙ্গে মিলে ওকে ঘিরে রয়েছে। আমার মনে হয় এই কেসটা পলায়নের নয়। বরঞ্চ কিডন্যাপিংয়ের।
ফেলুদা দু’দিকে মাথা নেড়ে বলল, তা কী করে হয়? কোর্টে ওর মামলা চলছে। ওর উকিল চিঠি চালাচালি করছেন…!
ভদ্রলোক মাঝখান থেকেই বললেন, এটা আমি ভাবিনি তা নয়। তবে আমার মনে হচ্ছে সবটাই অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে।
আপনাদের একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো, এই টানা কথোপকথনের মধ্যে একটা অত্যন্ত অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল আমাদের সঙ্গে। মানে আমার আর লালমোহনবাবুর সঙ্গে। খুব ফর্সা যে ভদ্রলোক তিনি আমার দিকে আর কুচকুচে কালো লম্বা ভদ্রলোক লালমোহনবাবুর দিকে স্থির হয়ে তাকিয়েছিলেন। বুঝতে পারছিলাম ওদের কান কথার দিকে থাকলেও চোখ আমাদের দিকে নিবদ্ধ। কালো ভদ্রলোক তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন বলে লালমোহনবাবু দু’বার ভদ্রতার হাসি হাসলেন। ভদ্রলোকও ফিরিয়ে দিলেন হাসি তবে যে হাসি ফেরালেন বাংলায় সেই হাসিকেই সম্ভবত কাষ্ঠ হাসি বলে।
ততোক্ষণে বাড়ির ভেতর থেকে চা আর ডালমুট এসে গেছে। এতক্ষণ কথা বলার পর পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোকেরও গলা ভেজাবার দরকার হয়ে পড়েছিল। তিনি সোফায় হেলান দিয়ে বসে চায়ে লম্বা চুমুক দিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম এই প্রথম কেউ ফেলুদার কাছে এলেন যাঁরা নিজেদের নাম বললেন না এবং ফেলুদাও জিজ্ঞাসা করল না। আর একটা বিষয় চা পর্বে আমার কানের কাছে মুখ এনে লালমোহনবাবু বললেন। হাতের কাপটা টেবিলে নামিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে, গলা নামিয়ে জটায়ু জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই তোপসে বলতে পার পদ কয় প্রকার? আমি তাঁকে নিরস্ত করে বললাম, আঃ ওসব পরে হবে। লালমোহনবাবু মুচকি হেসে আবার চায়ের কাপটি হাতে তুলে নিলেন। এতক্ষণে ঘন শ্যামবর্ণ মানুষটি মুখ খুললেন। ফেলুদাকে বললেন, স্যর ইউ হ্যাভ অলরেডি মেড ইওর পয়েন্ট ক্লিয়ার। ইওর ওপিনিয়ন ইজ দ্যাট এনিটাইম হি ক্যান বি কিলড।
ফেলুদা বলল, নট রিয়েলি। আই হ্যাভেন্ট মেড এনি ওপিনিয়ন ইয়েট। হুইচ ইজ্ ইন দ্যা নিউজ, ইটস মাই রেন্ডম হান্চ। নট অ্যান অবজারভেসন।
চা শেষ করে ভদ্রোলোকেরা উঠলেন। ওঁরা চলে যাবার পর ফেলুদা আবার একটা সিগার ধরাল।
লালমোহনবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, তখন কী বলছিলেন লালমোহনবাবু? পদ কয় প্রকার?
জটায়ু লজ্জা পেয়ে বললেন, আপনাদের কথার মাঝখানে সাইড টক করাটা ঠিক হয়নি বুঝতে পেরেছি। তবে অতক্ষণ ধরে কথা বললেন একবারও যাকে নিয়ে আলোচনা তার নামটা মুখে আনলেন না!

আর তখনই আপনার সর্বনাম পদের কথা মনে পড়ল তাই তো? বলল ফেলুদা।
জটায়ু জিভ কাটলেন। বললেন, খুব অন্যায় হয়ে গেছে! ওঁরা যে কী ভাবলেন!
ফেলুদা বলল, ওদের এখন মাথার ঘায়ে কুকুর-পাগল অবস্থা। অন্য কিছু ভাবার ওদের সময় নেই।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ফেলুদা ওঁরা কি পুলিশের লোক? তুমি ওঁদের চেনো? তুমি তো কারও নাম জানতে চাইলে না!
ফেলুদা বলল, পুলিশ নয় টিকটিকি। বলেই মোবাইলে একটা নম্বর লাগিয়ে সিগারটা মুখ থেকে নামিয়ে ছাইদানে রাখল। তারপর ফোনেই বলল, সত্যান্বেষী?

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *