কিশোর ঘোষ

গাঁধীর মৃত্যুর পর আইনস্টাইন বলেছিলেন, এককালে মানুষ বিশ্বাস করবে না রক্ত মাংসের এমন একজন এই পৃথিবীতে ছিলেন। একই কায়দায় বলা যায়, ভর্তির তোলাবাজির রাজ্যে, শিক্ষাঙ্গনের সর্বত্র রাজনীতির নোংরা ঢুকে পড়া এই বাংলাতেই যে শান্তিনিকেতনের জনক রবীন্দ্রনাথ নামের কেউ জন্মেছিলেন তা বিশ্বাস করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে সত্যিই কি শিক্ষাব্রতী ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষ এক সময় এই বাংলায় হেঁটে চলে বেড়াতেন? পাশাপাশি ডিরোজিও, এন্ড্রুজের কথাও মনে পড়বে। আজ মনে হয় আবিশ্বাস্য! বাংলার শিক্ষাঙ্গনের আজকের হকিকত দেখে মনে হচ্ছে এই যাঁদের নাম তোলা হল তাঁরা স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন। এক সময় যে স্বপ্ন গেল ভেঙে, এবং বাঙালি বাস্তবের স্যাঁতেস্যাঁতে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কিন্তু কেন? কারণ স্বার্থান্বেষী ভাগাড়!
পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। যেমন ধরুন, আজকের গড় বাঙালি ডিগ্রি আছে কিন্তু শিক্ষাদীক্ষা নেই। ক লিখতে কলম ভাঙে। ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন—ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস কর। কিন্তু কারা ভাববে? উদ্ভট অর্থসাআজিক ও রাজনৈতিক ধোলাই হতে হতে এদের মগজ জিনিসটাই ধুয়ে সাফ হয়ে গেছে বলে মনে হয়। ঘাড়ের উপর পড়ে আছে তথ্য ভর্তি কদাকার হার্ড ডিস্ক। ছাত্র শিক্ষককে মানে না। সম্মান দেওয়া তো দূর, ফেল করা ছাত্র মাস্টার মশাই পাস মার্ক দিচ্ছেন না বলে গায়ে হাত দেয়। কিন্তু এত সাহস পায় কোথা থেকে এরা? পায় রাজনীতির দাদাদের কাছ থেকে। স্কুল বোর্ড এদের সঙ্গে আছে। কলেজে আছে ছাত্র ইউনিয়ন। যে সংগঠনের ক্ষমতা প্রিন্সিপালের চেয়ে কিঞ্চিত বেশি। অপরপক্ষে যে লোক মাস্টারির চাকরি পেয়েছে সে কোনওমতেই শিক্ষক না। স্কুলের জায়গায় পুলিশের চাকরি পেতে পারতেন, কিন্তু হাইট নেই তাই ওটা ট্রাই করেননি। এবার এই মানুষটা কোথা থেকে ছাত্র পড়ানোর প্যাশান খুঁজে পাবেন বলুন? লোকটার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি চাকরির সিকিওর লাইফ, উদ্দেশ্য ছিল ‘মাল’ কামানো। তাই প্রশ্নপত্র লিক হয়ে যায়। আমরা টিভিতে দেখি, হাতে করে টুকলি বাড়িয়ে দিয়ে ছাত্রদের ‘উপযুক্ত’ সাহাহ্য করছেন টিচার। কখনও হয়তো মিডিয়ার তৎপরতায় ধরাও পড়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু জেল খাটা ‘চোর’ তো আর ‘সাধু’ হয়ে যায় না। অবশ্য পর্যাপ্ত শিক্ষকই নেই, তার ভালো আর খারাপ শিক্ষক!
এই বাংলার বহু স্কুলে ১০০ জন ছাত্রকে পড়ান একজন বা দু’জন শিক্ষক। এদিকে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষাও বন্ধ। কারণ নিয়োগ পক্রিয়ায় একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ এবং সেই সংক্রান্ত মামলায় জেরবার সরকার। কত শিক্ষিত, উপযুক্ত, প্যাশানেট যুবক যুবতী ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে পরীক্ষাটা দেবে বলে। অনেকে আগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ঘরে বসে। উল্টো দিকটাও ভয়ঙ্কর। শহরাঞ্চল থেকে একের পর এক বাংলা মিডিয়াম স্কুল তুলে দিতে হচ্ছে সরকারকে। কারণ ছাত্র নেই। কারণ নব্বই শতাংশ আর্থিক ভাবে সক্ষম বাঙালি আজ ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়। কারণ বাংলা মিডিয়ামকে ভরসা করে না। অপ্রিয় সত্যি হল গরিব ও নিম্নবিত্ত বাড়ির ছোটরা বাংলা মিডিয়ামে পড়তে যায় দুই কারণে। প্রথমত, তাঁদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর সংগতি নেই, দ্বিতীয়ত, মিড-ডে মিলের লোভে। অর্থাৎ এমত পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে পড়ে ছিল কলেজ শিক্ষাটুকুই। কারণ সেখানে এখনও বেসরকারি হাত পড়েনি। কিন্তু চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি নিয়ে যে সত্যি সামনে আসছে তা বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
মিডিয়া মারফৎ জানতে পারছি, সারধা, নারদা, রোজভ্যালির মতোই কলেজ ভর্তিও এক বিরাট চক্রের আকার ধারণ করেছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে ভর্তি-বিজনেস। চলছে দর হাঁকাহাঁকি। নিলামের কায়দায়। হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে কলেজের দাদারা ভাই বোনেদের ভর্তির বন্দোবস্ত করছে। পরিস্থিতি এমন আকার ধারণ করেছে যে মুখ্যমন্ত্রী নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন। কলেজের গেটে পুলিশ মোতায়েন করত হয়েছে। শোনা যাচ্ছে এত করেও পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না।
যাবেও না। কারণ শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়তে বাড়তে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
বাম আমলের যে অন্যায়ের সুত্রপাত তা বর্তমান রাজ্য সরকারের আমলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে দেখেছি প্রেসিডেন্সি নিয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকার পক্ষের রাজনীতিবিদদের অতি তৎপরতা। এখন বাকি আছে অধ্যাপকদের তাড়িয়ে পার্টির দাদাদের দিয়ে ছাত্র পড়ানো। তাহলেই ষোলোকলা পূর্ণ হয়। শিক্ষামন্ত্রী তো প্রেসিডেন্সি প্রসঙ্গে বলেই দিয়েছিলেন, আমরা টাকা দিচ্ছে অতএব আমরাই সিদ্ধান্ত নেব। প্রশ্ন ওঠে, কার টাকা দিচ্ছেন? মন্ত্রীর ব্যক্তিগত টাকা? ওঁদের পার্টিফান্ডের টাকা? না, তা তো না। দিচ্ছেন আমার আপনার টাকা। বাংলার তথা ভারতের সাধারণ নাগরিকের মাথার ঘাম পায়ের ফেলা টাকা। অতএব, রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনের টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়ে আমরাই প্রশ্ন তুলতে পারি। আমরাই তুলব। প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। কেন ভালো ছেলেমেয়েরা ভিন রাজ্যে চলে যায় তার জবাব দিতে হবে শিক্ষামন্ত্রীকে। কেন গুণমানের ক্ষেত্রে গোটা দেশের তালিকায় আমদের রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মান ক্রমশ নীচে নামছে তার উত্তর দিতে হবে। কেন নোট সর্বস্ব হয়ে গেল পড়াশুনো? কেন স্কুল শিক্ষকদের বদলে ছাত্রছাত্রীদের ভরসা বেশি গৃহশিক্ষকদের উপর? কেন এতখানি কলুষিত হবে রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামো তার জবাব চাই আমরা। তাহলে কি বাংলাকে হীরকরাজার দেশ বানাতে চান এরা!
এরা কি যন্তরমন্তর ঘরে ঢুকিয়ে দিতে চান গোটা রাজ্যটাকে! এরা কি ভেতরে ভেতরে মনে করেন—‘এরা যত বেশি জানে তত কম মানে!’
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news