দেবাশিস দাশগুপ্ত:
বাংলায় এতদিন রাজনীতি করেও এঁরা বাংলা এবং বাঙালির নাড়িটা বুঝতে পারলেন না। তা না হলে একজন বাঙালি নোবেলজয়ী সম্পর্কে কেউ অর্বাচীনের মতো নানা কটূ মন্তব্য করতে পারেন?
বলছিলাম বিজেপির বাঙালি নেতাদের কথা। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই তেড়েফুঁড়ে উঠেছেন একাধিক বিজেপি নেতা। দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাহুল সিংহ, মেঘালয়ের রাজ্যপাল তথাগত রায় প্রমুখ এই বাঙালি নোবেল বিজয়ীর বিরুদ্ধে নানা ধরণের মন্তব্য করে বসলেন। কেউ কেউ তো আবার তাঁর বিদেশি স্ত্রীকেও ছেড়ে কথা বললেন না। টেনে আনলেন তাঁকেও। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পীযুষ গোয়েলও অভিজিৎবাবুকে নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তাঁকে বামঘেঁষা অর্থনীতিবিদ বলে কটাক্ষ করলেন। অথচ দেখুন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বাকসর্বস্য নেতা, মন্ত্রীদের গালে সপাটে থাপ্পড় কষিয়ে অভিজিৎবাবুর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করলেন। তাঁর চিন্তাধারাকে স্বাগত জানালেন। নোবেলজয়ীর সঙ্গে তাঁর বৈঠককে ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য ওঁর আবেগ খুব স্পষ্ট। ওঁর সাফল্যে ভারত গর্বিত।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক নিয়ে অভিজিৎবাবুর আপ্লুত। দুজনেই এই বৈঠক নিয়ে খুশি। নোবেল জয়ের পরেও অভিজিৎবাবু দেশের অর্থনীতি দুর্বল মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার আগে নোট বাতিল নিয়েও তিনি ক্ষোভ গোপন করেননি। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্পোরেট কর ছাঁটাই নীতির সমালোচনা করেন তিনি। বেকারত্ব নিয়ে পরিসংখ্যান ধামাচাপা দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টারও তীব্র বিরোধিতা ছিল তাঁর। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন। অভিজিৎবাবুও তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। নোবেল পাওয়ার পর দেশে এসে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও তিনি মুখ খোলেন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এসব বিতর্কিত প্রসঙ্গ ওঠেনি বলেই খবর। বৈঠক শেষে নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ সাংবাদিক বৈঠকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক আমার অনন্য অভিজ্ঞতা। আমরা নীতির কথা শুনি, তার পিছনে ভাবনার কথা শোনা হয় না। উনি প্রশাসনকে কী ভাবে দেখেন, কেন মানুষের অবিশ্বাস প্রশাসনে ছাপ ফেলে, কীভাবে প্রশাসন অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, সরকার আর সংবেদনশীল থাকে না, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। আর মোদীও বলেছেন, বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওঁর ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখছি।
এটাই তো হওয়া উচিত। দেশের এক অর্থনীতিবিদ নোবেল পেয়েছেন। তাঁকে তো এভাবেই সম্মান জানানো উচিত। সেটা করে প্রধানমন্ত্রী যথার্থ রাজধর্ম পালন করেছেন। এর জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। এখানে তিনি বামঘেঁষা না ডানঘেঁষা, তাঁর নীতি মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে কী করেনি, তাঁর স্ত্রী দেশি না বিদেশি, এসব তর্ক বিতর্ক অপ্রাসঙ্গিক।
তার থেকেও বড় কথা, এই নোবেলজয়ী একজন বাঙালি। এখন মার্কিন নাগরিক হলেও তিনি মনেপ্রাণে বাঙালি। না হলে নোবেল জয়ের পরে বিদেশের মাটিতে তিনি বাংলায় কথা বলতেন না। অমর্ত্য সেনের পরে এই বাঙালির নোবেল জয়েও আজ বাঙালি গর্বিত। যে বিজেপি ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন দেখছে, সেই বিজেপির বঙ্গজ নেতারা কোন আক্কেলে অভিজিৎবাবু সম্পর্কে নানা অশালীন ও কটূ মন্তব্য করলেন, তা বোঝা গেল না। দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিংহের মতো নেতাদের মুখে এরকম একজন অর্থনীতিবিদের সমালোচনা করা সাজে? তিনি বিভিন্ন সময়ে বিজেপির নানা নীতির বিরোধিতা করেছেন, সাম্প্রতিক লোকসভা ভোটের আগে কংগ্রেসের ন্যায় প্রকল্পের উদ্ভাবক তিনি, এই তাঁর অপরাধ? আজ যদি তিনি উগ্র হিন্দুত্ববাদী হতেন, আজ যদি তিনি বিজেপির বিভিন্ন নীতির সমালোচনা না করতেন, তা হলে হয়ত শাসক দলের নেতারা তাঁর সম্পর্কে এ ভাবে বলতে পারতেন না।
পীযুষ গোয়েল না হয় অন্য রাজ্যের বাসিন্দা। কিন্তু দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিংহ, তথাগত রায়রা তো এই রাজ্যের বাসিন্দা। তাঁরা বহু বছর ধরে বাংলায় রাজনীতি করছেন। রাহুলবাবু এক সময় বিজেপির রাজ্য সভাপতি ছিলেন। তথাগতবাবুও দীর্ঘদিন দলের রাজ্য সভাপতি পদে আসীন ছিলেন। তাঁরা তো বাংলার সংস্কৃতিকে ভালোই জানেন, চেনেন। তাঁদের মুখে যখন অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ বিনায়কদের বিরুদ্ধে কুৎসা শোনা যায়, তখন বাঙালি অস্মিতা ধাক্কা খায় বৈকি।
এখানেই উঠছে সহিষ্ণুতার প্রশ্ন। আমার মতের সঙ্গে না মিললেই একজন খারাপ। আমার কথায়, আমার নীতিতে তাল না মেলালেই কেউ অস্পৃশ্য, আমার মতের বিরোধী মানেই কেউ দেশদ্রোহী, এটা কোন ধরণের রাজনীতি?
দিলীপবাবুরা যাই বলুন না কেন, প্রধানমন্ত্রী এই নোবেল জয়ীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই অর্বাচিনদের মোটেই পাত্তা দেন না। তার জন্যই গত দুদিন ধরে বাংলার এই বিজেপি নেতাদের মুখ বন্ধ। জানি না, তাঁরা অভিজিৎবাবু সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে মোদী-অমিত শাহদের ধমক খেয়েছেন কিনা। আর এক বছর বাদেই রাজ্যে বিধানসভার ভোট। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের লক্ষ্য এখন একটাই, বঙ্গ বিজয়। সেখানে দিলীপ-রাহুল-তথাগতরা যদি অমর্ত্য, অভিজিতদের বিরুদ্ধে কথা বলেই যেতে থাকেন, তার কিন্তু একটা নেতিবাচক প্রভাব বাংলার ভোটে পড়বেই। বাংলার সংস্কৃতি সেটাই বলে। আশা করা যায়, বাংলার এই বাক্যবাগীশ বিজেপি নেতারা কালিদাসের মতো আচরণ থেকে বিরত থাকবেন। বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের অন্দরেই এখন দিলীপবাবুদের এই আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই বলছেন, বাঙালি হয়ে তাঁরা কেন বাঙালি নোবেল জয়ীদের পিছনে লাগছেন। এর উত্তর তাঁদেরই দিতে হবে।
(লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক। প্রাক্তন মুখ্য সাংবাদিক ,বর্তমান। প্রাক্তন সহ সম্পাদক , এই সময়।)
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news