পার্থসারথি পাণ্ডা : 
অঙ্কে মোটেই ভালো ছিলেন না চিত্তরঞ্জন। তাই পরীক্ষাগুলোতে খুব একটা ভালো রেজাল্ট হতো না। এমনকি ১৮৯০ সালে কম নম্বরের জন্য তাঁর অনার্স সম্পূর্ণ হয়নি, সাধারণভাবে বি এ পাশ করেন। তাই তিনি মজা করে বলতেনও যে, ‘আমি অকৃতকার্যে প্রথম’। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় সাধারণ হলেও তিনি কিন্তু দেশের মানুষের কাছে সততার পরীক্ষায় প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন বারে বারে।
বাবা ভুবনমোহন চিত্তরঞ্জনকে বিলেত পাঠালেন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য। যথারীতি চিত্তরঞ্জন সে পরীক্ষায় পাশ করতে পারলেন না। হয়তো পাশ করার তেমন তাগিদ তাঁর ছিল না, মনটা তখন থেকেই ইংরেজের গোলামী করতে চাইছিল না। তাই তিনি স্বাধীন জীবিকাযাপনের জন্য ব্যারিস্টারি পড়া স্থির করলেন। ব্যারিস্টারি পাশ করে ১৮৯৩ সালে যখন তিনি দেশে ফিরলেন, তখন বাবা ঋণে একেবারে জর্জরিত। সেই ঋণের দায়ে বাবাকে কোর্টে পর্যন্ত যেতে হল, তখন বাড়িতে এমন অনটন চলছে যে সংসার চালানোর সংস্থান নেই, সেই বিপুল ঋণভার মেটানোর কোন উপায়ই নেই। ব্যারিস্টারি পড়ে এসে কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দিলেও পসার জমতে তো সময় লাগে, তাই প্রায় রোজগারহীন চিত্তরঞ্জনের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হল না বাবাকে দায়মুক্ত করা। তবে সেই দায় থেকে বাবাকে সাময়িক মুক্তি দিতে তিনি বাবা ও নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করলেন। আইনের ফাঁকে বাবাকে দায়মুক্ত করলেও চিত্তরঞ্জন ঋণদাতাদের সত্যি সত্যিই ফাঁকি দিলেন না। এর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর যেমন যেমন রোজগার হতে লাগল, তা থেকে ধীরে ধীরে ঋণের পাইপয়সা অব্দি তিনি শোধ করে দিতে লাগলেন। বাবার দায় মাথায় নিয়ে তিনি প্রকৃত পুত্রের কর্তব্য পালন করেছিলেন, সেইসঙ্গে পরিচয় দিয়েছিলেন বিবেকবুদ্ধির। তাঁর এই সততা দেখে কলকাতা হাইকোর্টের তখনকার বিচারপতি ফ্লেচার বলেছিলেন—‘দেউলিয়ার খাতায় নাম লিখিয়ে কেউ আবার আগের ঋণ শোধ করে, এমন ঘটনা আমি আগে দেখিনি। এটাই প্রথম।’
বাবার ঋণের পরিমাণ শুধু ছেলেকে বিলেতে পড়তে পাঠানোতে বাড়েনি। বেড়েছে পরের উপকার করতে গিয়ে। বিপদে পড়ে যে যখন এসে তাঁর কাছে অর্থ সাহায্য চেয়েছে, তিনি অকাতরে তাকে তাই দান করেছেন। এমনকি নিজের হাতে টাকা না থাকলে, ধার করেও দিয়েছেন। অনেকেই সেই উদারতার সুযোগ নিয়েছেন। তারই ফল বিপুল ঋণভার। দানধ্যানে শুধু চিত্তরঞ্জনের বাবাই নন, তাঁর কাকা দুর্গামোহন এবং ঠাকুরদা জগদ্বন্ধুও খুব বিখ্যাত ছিলেন।
শোনা যায়, চিত্তরঞ্জনের পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরের বাড়ির কাছে একটি অতিথিশালা করেছিলেন জগদ্বন্ধু। সেখানে পথচারীরা নিখরচায় থাকা ও খাওয়ার সুবিধে পেত। অতিথিশালা তৈরি করেই তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন না জগদ্বন্ধু। সেখানকার কর্মচারীরা অসহায়-দুর্গত পথচারী অতিথির সেবা ঠিকমতো করছে কিনা তিনি নিজে পরীক্ষা করে দেখতেন। সেভাবেই একদিন মধ্যরাত্রে নিজে পথচারী সেজে আশ্রয় চাইতে এলেন, কর্মচারীরা উঠে দরজাটুকুও খুলল না। তখন নিজের মূর্তি ধরে তাদের উত্তম-মধ্যম দিয়ে কর্তব্যকর্ম শিখিয়ে, এমন ভুল আর না-করার তিন সত্য করিয়ে তবে সেখান থেকে গেলেন। আর একবার পাল্কী নিয়ে পথে যাওয়ার সময় এক অসুস্থ বৃদ্ধকে দেখে, নিজে পাল্কী থেকে নেমে হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন, বৃদ্ধকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলেছেন। এমনই উদার, সহৃদয় ও পরোপকারীর বংশে জন্ম নিয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। ফলে, তাঁর পক্ষে দেশের মানুষের কাছের লোক হয়ে ওঠা, দেশের মানুষের বন্ধু, ‘দেশবন্ধু’ হয়ে ওঠা স্বাভাবিকই ছিল বলা যায়।
কলকাতার পটলডাঙা স্ট্রিটের বাসা নিয়ে সস্ত্রীক থাকতেন ভুবনমোহন। ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর এখানেই জন্ম হয় চিত্তরঞ্জনের। পরে তাঁরা ভবানীপুরে উঠে যান। সেখানেই চিত্তরঞ্জনের ছেলেবেলা ও বড়বেলা কেটেছে। বাপঠাকুরদার পরোপকারের ঐতিহ্য চিত্তরঞ্জনের রক্তে ছিল। যখন ব্যারিস্টারিতে খ্যাতি এলো, তখনও নিজের ভোগের জন্য অর্থ জমাতে তাঁর মন চায়নি। বিনাপয়সায় অন্যের জন্য অজস্রবার কেস লড়েছেন তো বটেই, সাহায্য চেয়ে কেউ তাঁর কাছে হাত পেতে দাঁড়ালে তিনি কাউকে কখনই ফিরিয়ে দেননি। এমনকি বিরুদ্ধ সংবাদ পত্রের সম্পাদককেও না। পুরুলিয়ায় তাঁদের একটি বাড়িতে অনাথ-আতুরদের জন্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে আশ্রিত অনাথ-আতুরদের সেবার ভার নিয়েছিলেন বোন অমলা দাশগুপ্ত। তিনি নিজের হাতে তাদের পায়খানাপেচ্ছাব পরিস্কার থেকে শুরু করে সমস্ত কাজই করতেন। আর মাসে মাসে বিপুল অঙ্কের খরচ একা যোগাতেন চিত্তরঞ্জন।
চিত্তরঞ্জনের সুত্রেই বোন সুগায়িকা অমলা দাশগুপ্ত রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিলেন। অমলার আবদারে তাঁর জন্য অনেক গান লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে চিত্তরঞ্জন ‘রবিবাবু’ বললেও, কবিপত্নীকে তিনি বলতেন, বৌঠান। বউঠানের হাতের লুচি আলুরদমের টানে তিনি হাইকোর্ট থেকে আগে সোজা ছুটতেন জোড়াসাঁকো, তারপর পেটপুরে খেয়ে নিজের লেখা রবীন্দ্রনাথকে শুনিয়ে আর রবীন্দ্রনাথের নতুন লেখা শুনে তবে ভবানীপুরের বাড়িতে ফিরতেন। এটাই ছিল তাঁর নিত্যনিমিত্তের রুটিন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের তিনি যেমন সখ্যতা পেয়েছেন, অনুজ হয়েও তেমনি পেয়েছেন দানশীলতা ও সততার জন্য শ্রদ্ধা। তাই তাঁর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ হৃদয় উজাড় করে লিখেছিলেন—
এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news