২০১৫-২০২০, দুটি নির্বাচনই সিলি পয়েন্ট থেকে দেখে যেমনটা বুঝলেন সুমন ভট্টাচার্য
কেন জিতলেন অরবিন্দ কেজরিবাল?
কাজ করেছিলেন বলে।
কেন হারল বিজেপি?
সমীক্ষা বলছে, লোকসভা ভোট হলে এখনও দিল্লির ৭টি আসনই জিততে পারে গেরুয়া শিবির। অর্থাৎ, দিল্লিবাসী নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বাছতে পারেন, কিন্তু অন্য ইস্যুতে পদ্মে ছাপ দেবেন, এমনটা মনে করে নেওয়া ঠিক হবে না।
২০১৫-র দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে যা হয়েছিল, ২০২০-র বিধানসভা নির্বাচনেও ঠিক তাই হল। অর্থাৎ কংগ্রেস একেবারে ‘প্রান্তিক’ দলে পরিণত হওয়ায় বিজেপি বিরোধী গোটা ভোটটাই আপ-এর পক্ষে গিয়েছে। ২০১৫ তে আপ সেই কারণে ৬৭টি আসন পেয়েছিল, এবারও আপ ৫০টির বেশি আসন পাচ্ছে।
২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এবং আপের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সুবিধা তো বিজেপি পেয়েইছিল, তার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর ‘ক্যারিশমা’ অনেকগুলি লোকসভা কেন্দ্রেই পদ্ম চিহ্নে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট এনে দিয়েছিল। অর্থাৎ দিল্লির লোকসভা কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি স্বচ্ছন্দেই জিততে পেরেছিল। কৌশলগত কারণে হোক, দূর্বল সংগঠনের জন্য হোক, এই বিধানসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস কোনও ‘ফ্যাক্টার’ হয়ে উঠতে পারেনি। যার পুরো সুবিধাটা আপ পেয়েছে। অন্যদিকে যেহেতু এটা দেশের প্রধানমন্ত্রী বাছার নির্বাচন নয়, সেহেতু বিজেপির কাছে কোনও ‘তুরুপের তাস’ ছিল না।
প্রসঙ্গ শাহিনবাগ : শাহিনবাগকে নিয়ে বাম এব্ং এক শ্রেণীর মিডিয়া যতই লাফালাফি করুক, আসলে শাহিনবাগ বিজেপিকে সাহায্য করেছে। ‘শাহিনবাগ’ না থাকলে দিল্লি বিধানসভায় বিজেপির পক্ষে দশটি আসন পাওয়াও মুশকিল ছিল। মেরুকরণ আসলে বিজেপিকে নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক সংহত করতে এবং বিধানসভায় আসন বাড়াতে সাহায্য করেছে।
বুদ্ধিমান অরবিন্দ কেজরিওবাল ‘শাহিনবাগ’ নিয়ে কোনও বিতর্কে জড়াননি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে বিজেপির বিরোধিতা করতে রাস্তায় নেমে গিয়ে ‘আপ’-এর বিরুদ্ধে হিন্দু ভোট সংহত করারও কোনও সুযোগ দেননি। অরবিন্দ কেজরিওবাল প্রথম থেকেই নিজের গত ৫ বছরের ‘পারফরমেন্স’কেই পুঁজি করে নির্বাচন লড়েছেন এবং সেটাই তাঁকে সাফল্য এনে দিল। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা কেজরিবালকে একসময়ের দূর্ধর্ষ আরএসএস তাত্ত্বিক এবং বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় নেতা গোবিন্দাচার্যর ‘প্রিয় ছাত্র’ বলে মনে করেন। ‘কৌশলী’ অরবিন্দ কেজরিওবাল তাই নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণের চাইতে ‘হিন্দুত্ববাদী’দেরই বেশি নিশানা করেছেন। দিল্লি নির্বাচনের গোটা প্রচার পর্বে তিনি ‘এনআরসি’র তীব্র বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে মুখ খোলেননি। বুদ্ধিমান কেজরিবাল জানতেন, বিজেপিকে ঠেকাতে যে মুসলিমরা ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছিল, এই বিধানসভা নির্বাচনে সেই সংখ্যালঘুরা তাঁর দিকে ফিরবেই। কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতা করে দিল্লির হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভো্ট খোয়ানোর দরকার নেই।
শাহিনবাগ যে বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে, সেই ওখলায় আপের জয় নিয়ে অনেকেই উল্লসিত হতে পারেন, কিন্তু আদতে ‘শাহিনবাগ’ বিজেপিকে দিল্লিতে নিজেদের আসন বাড়াতে সাহায্য করেছে। শাহিনবাগ না হলে এবারের দিল্লি ভোটে আবারও আপ ৬৫র কাছাকাছি আসন পেতে পারতো।
অত:কিম? গেরুয়া শিবিরকে বুঝতে হবে, নরেন্দ্র মোদী-ই তাঁদের ‘ট্রাম্পকার্ড’। আর হিন্দুত্ববাদীদের বুঝতে হবে, অন্ধ ‘মুসলিম বিরোধিতা’ কোনও রাজনীতি হতে পারে না, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ডিভিডেন্ডও দিতে পারে না। ভারতবর্ষের ২০ কোটি মুসলিমকে দেশ থেকে ‘তাড়িয়ে’ দেওয়া যাবে, এইরকম কোনও অলীক স্বপ্ন না দেখাই ভালো। কিভাবে ভারতবর্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু এবং ২০ কোটি মুসলিমের সহাবস্থান সম্ভব, সেটা সবাইকে বুঝতে হবে। বামেদের মতো মুসলিম মৌলবাদকে পরোক্ষে মদত দেওয়ার যেমন দরকার নেই, তেমনই ‘মুসলিম মুক্ত ভারত’ গড়ার স্বপ্ন দেখাটাও বাস্তবোচিত নয়। তাই জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদী ধীরে ধীরে যে ‘বহুত্ববাদী’ ভারতবর্ষের কথা বলছেন, এবং বহু স্বরকে জায়গা করে দিতে চাইছেন, সেটাই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির জন্য সেরা পথ।

এর পরে? ২০২০-তে বিজেপির জন্য অগ্নিপরীক্ষা বিহার। নিতিশ কুমারও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতোই উন্নয়নকেই হাতিয়ার করে ভোট লড়তে চান। এবং প্রশান্ত কিশোর ও পবন বর্মাকে নিজের দল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি আপাতত বিজেপির সঙ্গ ছাড়তে চান না এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের পক্ষে। কিন্তু নিতিশ আবার বিহারে ‘এনআরসি’ হতে দেবনে না বলেও মন্তব্য করেছেন। নিতিশ-বিজেপির যুগলবন্দি বিহার নির্বাচনের পরে আবার গেরুয়া শিবিরের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, যদি না সেখানেও অতিরিক্ত ‘হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডা’ চাপানোর চেষ্টা করা হয়।
২০২১-এ পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিহার জিতে বিজেপিকে আবার জেতার ধারাবাহিকতায় ফিরতে হবে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news