দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ কলাম :
মহেশতলার উপ-নির্বাচনের কথা আলোচনা করার আগে একবার ছুঁয়ে নেওয়া যাক মহেশকে। মহেশ?
কোন মহেশ?
শুধুমাত্র মহেশের কথা বললে ধন্দে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তবে মহেশের সঙ্গে গফুরের নামটা যোগ করলে আর কোনও ধোঁয়াশা থাকে না। বুঝতে বাকি থাকে না শরৎচন্দ্রের গল্পের মহেশের কথাই বলে হচ্ছে। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত অথচ গফুর জোলার স্নেহে সিক্ত হতভাগ্য মনিবের দুর্ভাগা ষণ্ডটির কথাই বলা হচ্ছে।
মহেশকে একবার ছুঁয়ে নিয়ে কেন মহেশতলার আলোচনা সে কথা আলোচনা এগোতে এগোতে বোঝা যাবে। যাঁরা বোঝার তাঁরা ঠিক বুঝবেন।
মহেশতলার উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়লাভ হল। শুধু জয়লাভ বললে ভুল বলা হবে বলতে হবে জয়জয়কার হল। এই নির্বাচনে কোনও কারচুপি হয়েছে কিংবা সন্ত্রাস হয়েছে এ কথা কোনও ভাবেই বলা যাবে না। কেউ কেউ সামগ্রিক সন্ত্রাসের আবহের কথা বলছেন, কেউ কেউ বলছেন বহু বুথে বিজেপির এজেন্ট বসতে পারেনি। তবে এইসব যুক্তি এক প্রকার সত্য হলেও হতে পারে তবু তা দিয়ে অন্তত অঙ্কের হিসেবে তৃণমূলের বড় জয়কে খাটো করা যায় না।
অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, যিনি নির্বাচন ও রাজনীতির আলোচনায় একটি পরিচিত নাম, তিনি ইতিমধ্যেই চ্যানেল হিন্দুস্তানে এই বিষয়ে লিখেছেন। তাঁর মতে, মুসলিম সম্প্রদায়ের একচেটিয়া ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে গেছে। সঙ্ঘপন্থী বুদ্ধিজীবী ও গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাসের মতে মহেশতলায় যে মুসলিমরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন তাঁরা কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক কারনে তৃণমূলের পক্ষে দাঁড়াননি, তাঁরা নেহাত ধর্মীয় কারনে বা বলা ভাল ধর্মীয় কারনে উৎসারিত বিজেপি বিরোধী মনোভাবের কারনে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। তাঁর লিখিত বক্তব্যের কিয়দংশ নিচে তুলে দেওয়া হল : কাইরানা উত্তর প্রদেশের একটা শহর। এখানে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুরা অধিষ্ঠান করছেন। তাদের জান, মাল, সম্পত্তির নিরাপত্তা দিতে স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ। তাদের জমি, জায়গা, ব্যবসা জলের দরে বিক্রি করে চলে আসতে হচ্ছে। মহিলারা বাড়ির বাইরে বেরোতে পারছেন না। ফলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, শহরের জনবিন্যাস কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বোঝা যাবে ১৯৪৭ সালের সঙ্গে এখনকার জনসংখ্যার তুলনামুলক তথ্য নিলে। ১৯৪৭-এ কাইরানায় হিন্দু ছিল ৫২% , এখন হিন্দু মাত্র ৯% । পক্ষান্তরে মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে। এদের অধিকাংশ এসেছেন বাংলাদেশ থেকে । তারা উর্দুভাষী। একটা সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে তারা পাকিস্তানের পক্ষে রাজাকার, আল বদর প্রভৃতির হয়ে ব্যাপক হিন্দু বাঙালি হত্যা, নারী ধর্ষণ, সম্পত্তি লুঠ করেছে। কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেন, এরা বাংলাদেশে গেল কি করে? আসলে দেশ ভাগের পরে নারায়নগঞ্জের কারখানা ও চটকলে, খুলনা, চালনা ও চট্টগ্রামের বন্দরে এরা কাজ করত। এদের অধিকাংশের বাড়ি বিহার, উত্তর প্রদেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পর এরা ঘাতক, দালাল, বেইমান হিসেবে ধিকৃত হতে থাকে।এরা নিজেরাও উদ্বাস্তু বা মুহাজির হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকত্ব প্রার্থনা করে। পাকিস্তানের উদ্ধত, দাম্ভিক মুসলমান নেতারা এদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেনি। ফলে এরা করাচি অবধি লং মার্চে অংশ নেয়। যথারীতি স্থানীয় রাজনৈতিক দলের বদান্যতায় এরা পশ্চিমবঙ্গে, বিহারে ও উত্তরপ্রদেশের শহরে থাকতে শুরু করে । কলকাতার আশপাশে শিয়ালদহ দক্ষিণ রেলপথে মল্লিকপুর, ক্যানিং অঞ্চলে লোকবসতির দিকে নজর দিলে যে কোনও বুদ্ধিমান লোক এদের দেখেই খুঁজে পাবেন। এরপর আছে রোহিঙ্গার দল। তারাও দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসের জন্য রাষ্ট্রসংঘের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে এবং স্বাধীন ভারতে বিবাহ সূত্রে সমাজের অন্য অংশের সঙ্গে মিশে গিয়েছে । কাইরানায় এখন শাটল কর্ক বোরখার বিপজ্জনক বাড়াবাড়ি সাংবাদিকদের নজর এড়ায় না। একসময় আফগানিস্তানে তালিবানরা বোরখার প্রচলন শুরু করে । এখন আমরাও পশ্চিম বঙ্গে বোরখা ব্যবসায়ী উগ্রপন্থীর খবর একেবারে পাইনি তা নয়। দুঃখের কথা, শুধু মাত্র হাতে গরম রাজনীতির জন্য দেশ বিক্রির জয়চাঁদরা এই মুসলমানদের সাহায্যে কাইরানায় ভোটে জেতার ছক করেছেন । এবং সে কাজে সাময়িকভাবে সফলও হয়েছেন । মহেশতলায় মোটামুটি ৭০ হাজার মুসলমান ভোটার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর মধ্যে ৬৫ হাজার পেয়েছে শাসক দল। অর্থাৎ, যে অঙ্ক কাইরানায় হয়েছে তা মহেশতলাতেও হয়েছে।”
এত অবধি আলোচনার পর দুটি বিষয় উঠে আসছে। এক) বিজেপি কী তাহলে হিন্দু ভোট সঙ্ঘবদ্ধ করার চেষ্টা করবে! নাকি দুই) মুসলিম ভোট নিজের দিকে আনার চেষ্টা করবে! রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের সংবিধান বলছে মুসলিম বিরোধিতা তাদের আদর্শ নয়। সঙ্ঘ রাষ্ট্রবাদ ও জাতীয়তাবাদের কথা বলে। রাষ্ট্রবাদে মুসলিম বিরোধিতার ঠাঁই নেই।
মুকুল রায় বিজেপিতে যোগ দিয়েই একটি কথা খুব পরিস্কার করে বলে দিয়েছিলেন, ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে বসে ৩২ নম্বর বাদ দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া বোকামি। অবাস্তব। বিজেপি যে মুসলিম বিরোধী নয় বরং তার বিপরীত একথা মুসলিম সম্প্রদায়কে বোঝাতে তিনি কলকাতায় একটি সেমিনারের আয়োজন করতেও উৎসাহ দেন। দিল্লিতেও একটি সেমিনারে যোগ দেন। বিভিন্ন সভা সমিতিতে কখনও নজরুলের শ্যামা সঙ্গীত, কখনও দক্ষিণেশ্বরের মন্দির সংলগ্ন মাজারের কথা বলে বাংলা তথা ভারতের স্বাভাবিক ঐতিহ্যের ধারা তিনি মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। একথা ভাবার কোনও কারন নেই যে মুকুল রায় এইসব কথা বলছেন তার দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি না নিয়েই। এমনকি একথা ভাবারও কোনও কারন নেই যে মুকুলের কথায় বা তাঁর কোনও উদ্যোগে সঙ্ঘের সমর্থন নেই। মহেশতলার ফলাফল নিয়েও মুকুল খুব সপ্রতিভ প্রতিক্রিয়াই জানাচ্ছেন। তাঁর মতে “মহেশতলার ছবি সারা বাংলার ছবি নয়। এমন বহু মুসলমান আছেন যাঁরা এই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তাঁদের সামনে সত্য ছবিটা তুলে ধরতে পারলে তারা অবশ্যই বুঝবেন। তারা বিজেপির থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন না।”
অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস যে মুসলিমদের কথা বলছেন, যাদের রাজাকারদের বংশধর বা পাকিস্তানে ঠাঁই না পাওয়া মুহাজির বলছেন, যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়াও যায় যে তাদের রক্তে এখনও ভারত বিরোধিতা রয়ে গেছে, তাহলেও তারা সংখ্যায় সবটা নয়। হিসেব বলছে ৩২ শতাংশের মধ্যে ২৯ শতাংশ মুসলিম এই গোত্রের নয়। তারা বিশ্বাস করে সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা। শান্তির ধর্ম ইসলামের অপব্যখ্যাকে যারা জীবন দর্শন করেছেন, পবিত্র কুরাণের অপব্যখ্যা করে যারা তথাকথিত জিহাদি হয়েছেন, তাদের বাদ দিয়েও একটি বৃহৎ মুসলিম সমাজ এই রাজ্যে তো বটেই, গোটা দেশ জুড়ে পড়ে আছে। ঠিক যেমন মনুসংহিতার অপব্যখ্যা করে এক সময়ের ব্রাহ্মণ সমাজ হিন্দু সংস্কৃতিকে, সনাতন ধর্মকে কলুষিত করেছিল, ঠিক সেই রকম।
তাহলে এত অবধি আলোচনায় আরও একটি বিষয় সামনে এল যে দেশ তথা বাংলা আজ হিন্দু মুসলমানে ভাগ হয়ে নেই। নিজেকে মনেপ্রাণে ভারতীয় মনে করা ভারতীয় আর না মনে করা ভারতীয়তে ভাগ হয়ে আছে।
মুকুল বলছেন ওই ২৯ শতাংশের দরজায় কড়া নাড়লে বিজেপি বিফল হবে না। তাঁর কথায় “দীর্ঘ দিনের সুপরিকল্পিত প্রচার বিজেপি বা সঙ্ঘকে একটি বড় অংশের মুসলিমের চোখে অপ্রিয় করে রেখেছে। এই প্রচার যে মিথ্যা তা বিজেপিকেই বোঝাতে হবে।”
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news