রণবীর ভট্টাচার্য :
দেশ জুড়ে করোনার উৎপাত অব্যাহত। তারই মধ্যে, আজ লক ডাউনের তিন দফা আজ শুরু হল। লাল, কমলা আর সবুজ – তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে দেশ। সেই অনুযায়ী পুরোদস্তুর লক ডাউনের নিয়ম শিথিল করা হয়েছে বাড়তি কিছু অনুমতি দিয়ে যাতে দেশীয় অর্থনীতি গতি পায়। এই শিথিলতার অন্যতম একটি দিক হল, মদ বিক্রির অনুমতি। অবশ্যই বেশিরভাগ রাজ্যে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেই সব এলাকায় যা কনটেনমেন্ট এলাকার মধ্যে নয়। সারাদিন ধরে অনেক শহরেই সেই এক চিত্র – কাতারে কাতারে মানুষ মদের দোকানের সামনে। বিভিন্ন রাজ্য মদের দামের উপর বাড়তি শুল্ক বসিয়েছে, কিন্তু তাই বলে ভিড় কম হয়নি। অনেক জায়গায় তথাকথিত সামাজিক দূরত্ব স্রেফ হাওয়ায় উবে গিয়েছে।
মিষ্টির দোকান খোলা বা বইয়ের দোকান খোলার সাথে কি মদের দোকান খোলার কোন তুলনা আনা যায়? দুই দফা লক ডাউনে বাড়ির অন্দর মহল থেকে ফেসবুকের পাতা, সর্বত্র তর্ক হয়েছে যে মদের দোকান খোলা উচিত কিনা। অনেকে পাতাভরা যুক্তি সাজিয়েছেন যে withdrawal symptom যদি সরকার বাহাদুর না বোঝে, তাহলে অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে। দক্ষিণ ভারতের বিচ্ছিন্ন কিছু সেইরকম কিছু ঘটনা তুলে আনা হয়েছে। অনেকে সরকারি কোষাগার ভরার কথা বলেছেন। সেই যুক্তি অনেকটা এই রকম যে লক ডাউনে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের জিএসটি আদায় কম হচ্ছে বা হয়েছে, তাই এই বিক্রি কিছুটা হলেও পূরণ করবে সেই ঘাটতি!
বলাই বাহুল্য, হাতে গোনা রাজ্যে মদের হোম ডেলিভারির কথা বলা হয়েছে, মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মদ কিনতে মানুষ দোকানে যাবেন। দ্বিতীয়ত, পরিসংখ্যান বলছে, এই লক ডাউনের সময় domestic violence বা বাড়ির মধ্যে নারী ও শিশুর উপর হিংসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মদ বিক্রির সিদ্ধান্ত এই সমস্যা আরও বাড়াবে না তো? কিছু মানুষ বলেছেন যে কালোবাজারি হওয়ার থেকে দোকানে বিক্রি হওয়া ভালো, তাতে অন্তত অরাজকতা সৃষ্টি হয় না, মানুষের বাজার অর্থনীতির উপর ভরসা থাকে।
এই তর্ক বিতর্কের মধ্যে মানুষ ভুলেই গেছে যে দেশের কি অবস্থা করোনার বিরুদ্ধে অসীম লড়াইয়ে। প্রথম বিশ্বের দেশগুলো স্রেফ গণকবর খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা অবস্থায় আজ। ভারতে খাদ্য সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তো উঠেছেই, সাথে সাথে বিভিন্ন রাজ্যে সুষ্ঠু বন্টন নিয়ে সমালোচনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ স্রেফ এক মুঠো অন্নের জন্যে আজ রেশন দোকানের সামনে দিনের আলো ফোঁটার আগেই অপেক্ষা করছেন। এরপরও যারা মদ্যপানের কথা তুলছেন, বিবেক কি তাদের উলঙ্গ রাজার সভাসদদের মত হারিয়ে গিয়েছে? যারা বেশি দাম দিয়ে মদ কিনেছেন তারা কি কালকে আবার নাম মাত্র দামে রেশন দোকান থেকে চাল, ডাল, নুন, তেল কিনতে যাবেন?
সংক্রমণের হার এখনও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমাতে পারেনি ভারত। পরিযায়ী শ্রমিকেরা বাড়িতে ফিরছেন বটে, কিন্তু কাজে কবে ফিরবেন কেউ জানেন না এই বিশ্বব্যাপী মহামারীতে। যেখানে লড়াই হওয়ার কথা ছিল টিকা নিয়ে, বা ভাত নিয়ে, সেখানে মানুষ সামাজিক দূরত্বের নিয়ম ভেঙে দাঁড়ালেন মদের দোকানে। গান্ধী আর নেতাজির ভারতের বোধহয় এই দিন দেখার কথা ছিল না!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news