জয়ন্ত চৌধুরী :
আজ সাংবাদিক দিবস। ঘটনাচক্রে এদিন দুপুরে চলে গেল সঞ্জয় দা। সাংবাদিক সঞ্জয় সিংহ। কোভিদ আক্রান্ত হলেও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তার বাষট্টি বছরের জীবন থেমে গেলো। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ,নিয়ে গেলেও চিকিৎসার সুযোগ পায়নি চিকিৎসকরা।
দুই দশকের বেশি পরিচয় হলেও অবসরের আগে পর্যন্ত সঞ্জয় দা র সঙ্গে এক বিট ছিল আমার। মানে আমরা দুজনেই রাজনীতির খবর কভার করতাম। প্রধানত কংগ্রেস, তৃণমূল আর বিজেপি। কালীঘাটের ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট, এন্টালির বিধান ভবন এবং কলুটোলা সংলগ্ন মুরলিধর সেন লেনের অনেক অকথিত ঘটনার সাক্ষী আমি ও সঞ্জয়দা। কিছু ক্ষেত্রে অন্য অনেকে থাকলেও কয়েকটি দুর্লভ মুহূর্তে কোনও যাদুবলে শুধু আমরা দুজন। আমি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে, খবরের কাগজের রিপোর্টার সঞ্জয় দা। কিন্তু আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছিল। পরিবর্তন সাপ্তাহিক পত্রিকায় সঞ্জয়দার সাংবাদিকতা শুরু। এর পর বর্তমান, আজকাল হয়ে আনন্দবাজার। সাধারণ রিপোর্টার থেকে শুরু করে চিফ রিপোর্টার (পলিটিকাল )। পদোন্নতি হলেও ওর ‘লেগ ওয়ার্ক’ এতটুকু কমেনি।
সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তার নোট সবাই নেয়। কিন্তু সঞ্জয়দা সে ব্যাপারে অসম্ভব খুতখুঁতে। শেষ দিন পর্যন্ত দেখেছি , খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নেতা বা নেত্রীর ‘ইন ভার্বাটিম’ (in verbatim) নোট নিতে গিয়ে কিছু মিস হলে জুনিয়ারতম সাংবাদিকের কাছে নোট মিলিয়ে নিতো সঞ্জয় দা। মাঝে মধ্যে বিরক্ত হতাম। একবার বলেই দিলাম , ‘ওসব অকিঞ্চিতকর কথা আমি টুকিনি। ওসব দিয়ে কী হবে?’
আরে কপির জন্য নয়। অনেক সময় ওইসব হাবিজাবির মধ্যে বক্তার অ্যাটিটিউড (attitude) বোঝা যায়। তাই অভ্যাস টা রাখতে হয়। কখন কী কাজে লাগে বলা যায়? টেলিভিশনে এত পুঙ্খানুপুঙ্খ নোট নেওয়ার দরকার হয় না। ক্যামেরায় রেকর্ড করা থাকে। সঞ্জয় দা র আবদার রাখতে গিয়ে বেশ কয়েকবার ক্যামেরা আটকে রেকর্ডিং শোনাতে গিয়ে অফিসে কথা শুনতে হয়েছে। যে কথা গোড়ায় পেড়েছিলাম, বাংলার রাজনীতির বিশেষত পটুয়া পাড়ার ওই বাড়ির চত্বরে ঘটে যাওয়া অকথিত ঘটনার সাক্ষী থাকার প্রসঙ্গ।
২০০৬ সালে ভোটে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরদিন হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে, প্রতিদিনের মতো সেদিনও আমি হাজির। তবে সাধারণত রিপোর্টাররা যে সময় পৌঁছয় তার ঘন্টা দুয়েক আগেই চলে গিয়েছিলাম। গিয়েই দেখি একদল তৃণমূল কর্মী এক স্থানীয় নেতাকে টিকিট না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ। স্লোগানের সঙ্গে অশালীন নানা মন্তব্য, ক্রমে বাতাস গরম হতে শুরু করেছে। নেত্রীর বাড়ির সামনে ওই ধরণের বিক্ষোভ আমাদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। তাই প্রথম দিকে তাতে আমল না দিয়ে ছবিন দার চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে নজর রাখছিলাম। মুহূর্তে ভিড়ের বহর গেলো বেড়ে। কেমন যেন হিংস্র চেহারা নিলো। কালীঘাটের পটুয়া পাড়ায় এমন বিক্ষোভ দেখিনি কোনওদিন। কিছু পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ভিড়টা সরে গেলেও আমি ও সঞ্জয় দা তখন স্তম্ভিত।
আপনাদের ভিতরে ডাকছেন, কে যেন এসে জানিয়ে গেলো।
আমার ক্যামেরাম্যান ততক্ষনে বিক্ষোভের ছবি (এক্সক্লুসিভ) ক্যাসেট বন্দি করে ফেলেছে। এর ঘন্টা খানেক পরে রিপোর্টাররা একে একে হাজির হতে শুরু করলো। কোনও ব্রিফিং হবে না ,সবাইকে জানিয়ে দিতে বলা হলো। ওই ঘটনা নিয়ে সঞ্জয় দা এক কুচি খবর করেনি। আমিও তাই। কার্যত খালি হাতে ফিরে গিয়েছিলাম। রাতে ফোন করলো সঞ্জয় দা। ‘এতটা সংযম কি ঠিক হলো? নেত্রীর বাড়িতে বিক্ষোভের নামে এমন হিংস্র আচরণ ,কোথাও লেখা রইলো না!’ বুঝলাম পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে প্রত্যাশিত ওর ওই যন্ত্রনা।আমারও। এত বাঙ্ময় ফুটেজ সত্ত্বেও চেপে যাওয়া খুবই পীড়া দিয়েছিল আমাদের।
সঞ্জয় দা বলেছিল , রিপোর্টারের সাহসের সঙ্গে ভাবা যেমন জরুরি তেমনই দরকারে সংযম। যদি অবশ্য পেশায় টিকে থাকতে চাও। উল্লখ্য, যার পক্ষে সেদিনের হুজ্জুতি সংগঠিত হয়েছিল তিনি বর্তমানে শাসক দলের অন্যতম সফল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি।
আজ সাংবাদিক দিবসে পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে অনেক চর্চা হচ্ছে। হবেও। এই গূঢ় তর্কের প্রেক্ষিতে সঞ্জয়দার সেদিনের কথাগুলো মনে পড়ছে। প্রসঙ্গত , খবরের বাইরে সঞ্জয় দা ,নাটক ও গানের ব্যাপারে ভীষণ দুর্বল ছিল। আন্দামানে গিয়েছিলাম বিজেপির এসাইনমেন্ট নিয়ে। সেখানে সবাই যখন সন্ধ্যায় সেলুলার জেলে লাইট এন্ড সাউন্ড দেখতে গিয়েছিল, তখন আমি আর সঞ্জয় দা তৎকালীন কংগ্রেস সাংসদ মনোরঞ্জন ভক্তর বাড়িতে। খবর করার কী অদম্য তাগিদ! আমি তার অনুগামী মাত্র। সে রাতে পোর্ট ব্লেয়ারের পিয়ারলেস ইন-এর সামনের বালুকা বেলায় ডজন খানেক গান শুনেছিলাম সঞ্জয় দার । হেমন্ত , মান্না, সতীনাথ…আরও কত কী। ছোটবেলায় যে গান শিখেছিল, সেটাও প্রথম সেদিন জানলাম সঞ্জয়দার কাছে। ইদানিং নাটক লিখতে শুরু করেছিল। প্রকাশিত নাটকগুলো নিয়ে বই করার বাসনা ছিল।
অনেক কিছুর মতো সেটাও অধরা রয়ে গেলো সঞ্জয় দার।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news