চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো।
রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ছয়মাস কাটতে না কাটতেই পাঁচটি উপনির্বাচন ঘাড়ে পড়েছিল। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনের সময় বকেয়া থেকে যাওয়া সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের ভোট। ভবানীপুর উপনির্বাচনের সঙ্গেই পুজোর আগেই এই দুই কেন্দ্রে ভোট হয়েছে। আর বাকি চার আসনে ভোট আগামী ৩০ অক্টোবর। খড়দহ, গোসাবা, শান্তিপুরে উপভোট হবে। পরিসংখ্যান বলছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মোট ১২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। গড়ে প্রতি বিধানসভার নির্বাচনে সাড়ে চার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল সরকারি তহবিল থেকে। ভারতের মতো গরিব দেশে মাসে মাসে উপনির্বাচন বিলাসিতাই বটে। আর সেই নির্বাচন যদি চাপিয়ে দেওয়া হয়। রাজ্যে যে মোট পাঁচটি উপনির্বাচন হচ্ছে বা হবে, তার তিনটিই চাপিয়ে দেওয়া। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে শান্তিপুরে বিজেপি-র প্রার্থী হয়েছিলেন রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকার ও দিনহাটায় প্রার্থী হন বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশিথ প্রামাণিক। উভয়েই বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। তাই এই দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হচ্ছে।
আর ভবানীপুর বিধানসভার উপনির্বাচনও খানিকটা চাপিয়ে দেওয়াই বটে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর ছেড়ে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন। আর রাসবিহারীর ২১ বছরের বিধায়ক দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে ভবানীপুরে প্রার্থী হিসেবে নিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু, নন্দীগ্রামে একদা তাঁর অনুগত শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বিতর্কিত পরাজয় হয় তাঁর। আর ভবানীপুরে ২৮ হাজারের বেশি ভোটে জেতেন শোভনদেব। মাত্র ১৯ দিন ভবানীপুর বিধানসভার বিধায়ক থেকে ইস্তফা দেন তিনি। মুখে দলনেত্রীর জন্য স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগের কথা বললেও, তৃণমূলের অন্দরের খবর ছিল পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে মুখ্যমন্ত্রী-সহ নীশিথ প্রামানিক ও জগন্নাথ সরকারের ভোটে দাঁড়ানো নিয়েও। নীশিথ ও জগন্নাথ উভয়ই সাংসদ। তা সত্ত্বেও কেন বিধানসভার নির্বাচনে দাঁড়ালেন তাঁরা? ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিজেপি। এমন একটি দলে ‘যোগ্য প্রার্থীর কি অভাব পড়িয়াছিল?’ নাকি প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না? করোনা সংক্রমনের জেরে অন্যান্য দেশের মতো ভারতের আর্থিক পরিস্থিতিও বেহাল হয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কীভাবে বিজেপি-র মতো একটি রাজনৈতিক দল তাঁর দলের সাংসদদের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দিতে পারে? যেখানে তাঁরা জয়ী হলে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা থেকে যায়! বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন হুগলির বিজেপি সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায় ও রাজ্যসভার সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত। প্রার্থী হয়েছিলেন সদ্য বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যাওয়া কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। এই তিনজন পরাজিত হন। তাই অতিরিক্ত উপভোটে বোঝা থেকে নিস্তার পেয়েছে বাংলা।
একই কথা খাটে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও। ভবানীপুর ছাড়াও মুখ্যমন্ত্রীর দাঁড়ানোর মতো আসন ছিল। আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন খড়দহের তৃণমূল প্রার্থী কাজল সিনহা। ফলাফল ঘোষণায় জয়ী হন তিনি। যেহেতু ফল ঘোষণার আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন কাজল। তাই খড়দহে উপনির্বাচন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের ধারণা ছিল, নন্দীগ্রামের পরাজয়ের পর আর ঝুঁকি না নিয়ে খড়দহ আসনে প্রার্থী হবেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বর্ষীয়ান শোভনদেবকে ভবানীপুর থেকে পদত্যাগ করিয়ে সেই আসনেই প্রার্থী হয়ে বিধায়ক হলেন মমতা। হল আরও এক বাড়তি উপনির্বাচন। এই উপনির্বাচনের দায় তৃণমূল বা মুখ্যমন্ত্রী এড়াতে পারেন কি? প্রশ্ন উঠছে। তৃণমূল ও বিজেপি দু’দলের নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে।
একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রাজ্যের ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এ বার সেই খরচই ৬৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছিল বলে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের একটি সূত্র জানাচ্ছে। ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে মোট বুথের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লক্ষ ১ হাজার ৭৯০টি। যেখানে গত লোকসভা ভোটে রাজ্যে বুথ ছিল ৭৮ হাজার ৮০৪টি। শুধু বুথের সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, কমিশন এ বার প্রতিটি বুথই একতলায় করার নির্দেশ দিয়েছিল। এতে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার। লোকসভা ভোটে যে সংখ্যা ছিল ৫৩ হাজারের কাছাকাছি। আবার অনেক জায়গায় কমিশন প্যান্ডেল খাটিয়ে বুথ তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল। প্রতিটি বুথের জন্য ২০ বর্গমিটারের প্যান্ডেল তৈরি করতে হয়েছিল। প্রায় ৩০ হাজার প্যান্ডেল তৈরি করতে হয়েছিল বলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে জানানো হয়েছিল। এতেই খরচ বাড়বে। কারণ, এতদিন বুথ পিছু চারজন ভোটকর্মী লাগত। এ বার কোভিড পরিস্থিতিতে প্রতি বুথে এক জন অতিরিক্ত ভোটকর্মী নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৬ লক্ষ ভোটকর্মী কাজ করেছিল বিধানসভা নির্বাচনে। যেখানে গত লোকসভা ভোটে সাড়ে তিন লক্ষ ভোটকর্মী লেগেছিল। ফলে খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১২৫০ কোটিতে। এমন পরিসংখ্যানে চোখ বুলিয়ে দেখলেই হয়তো জনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া উপনির্বাচন নিয়ে নিজেরাই উত্তর খুঁজে পাবে না রাজনৈতিক দলগুলি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news