কিশোর ঘোষ:
বুড়িমার বানানো বাজিতে বুড়ি মা-বাবাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত।
না, এ আজকের কথা না। কারণ ব্র্যান্ড বুড়িমা আজ আর শব্দ বাজি বানায় না। এখন নিষিদ্ধ। ১৯৯৬ সাল নাগাদ সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ হয় ৯০ ডেসিবেলের বেশি যাবতীয় শব্দবাজি। কিন্তু তার আগের ইতিহাস সবার জানা। সেকালে কালীপুজো মানেই শব্দবাজি। এবং অবশ্য অবশ্যই বুড়িমার চকলোট বোমায় পাড়া চমকানো। দুর্গাপুজোর বিসর্জনের আকাশে যার শুরু কালীপুজোর বিসর্জনে যার শেষ। তো চকলেট বোম পোড়ানো নিয়ে হত হাজারো পরীক্ষানীরিক্ষাও। যেমন, কীকী ভাবে শব্দ আরও বাড়ানো যায়। কিংবা হাঁড়ি চাপা দিয়ে ফাটানো। আমরা একবার খোলা মাঠে তিনটে বোমা একসঙ্গে করে তার উপর একটা ক্রিকেট ব্যাট রেখে ফাটিয়ে দেখতে চেয়েচিলাম কী হয়। হলো তো হলো ব্যাটের দফরফা। মজাই লেগেছিল যখন ব্যাট আকাশে উড়ছিল ডিগবাজি খেতে খেতে। কিন্তু ওই অবস্থাতেই দু’খণ্ড হয়ে ভূপতিত। হিরোরা অবশ্য এসবের মধ্যে নেই। তারা স্বর্গে-মর্ত্যে-পাতালে, মানে ডাঙায়-আকাশে এমনকী জলেও ছুড়ে ছুড়ে মারতো বুড়িমার চকলেট বোম। তবে সেই কাজ করতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টও ঘটেছে। হাতে বোম ফেটে রক্তারক্তি। তবে ভয়ানক কাণ্ডটা ঘটিয়েছিল ছোটবেলার বন্ধু শংকর।
সমবয়সি। আন্না কাকিমার ছেলে, ফল বেচে বাবা। তখন বছর দশেক বয়স আমাদের। বিরাট বুদ্ধি করে মা রান্না থেকে উঠে অন্য ঘরে গেছে দেখে শংকর জ্বলন্ত উনুনে চকলোট বোম দিয়ে দেখতে চাইল কী হয়। যা হওয়ার তাই হল। বোম ফেটে জ্বলন্ত কয়লা সারা ঘরে ছড়িয়ে গেল। মারাত্মক জখম অবস্থায় শংকরকে হাসপাতালে নিয়ে যেত হল। কারণ মুখ, গলা আর বুক পুড়ে গিয়েছিল ওর। অন্ধ হওয়ার কথা ছিল। শেষমেস হয়নি। বেঁচেও ফিরেছিল। কিন্তু সারা জীবনের জন্য শংকর থেকে ‘পোড়া শংকর’ হয়ে গেল আমার বন্ধু! এসব কথা কী বুড়িমা জানতেন?

অবশ্য বুড়িমা যে বাস্তবিক এক বুড়িমা তাই বা আমরা জানতাম নাকি! ভাবতাম এমনি নাম। ওই বুড়িমা জাস্ট ছবি। কেন কে জানে এতকিছু থাকতে চকলোট বোমের মতো পুরুষালী জিনিসের প্যাকেটে থুত্থুরে এক বুড়ির ছবি ছাপা! তবে পুরুষালী শব্দটা গোলমেলে, বহুমাত্রিক। পুরুষালী মানে পুরুষ না, ‘বিশেষণ’-এর খেল। ‘পুরুষালী’ মহিলাও হতে পারে। বুড়িমার ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটল।
বুড়িমার আসল নাম অন্নপূর্ণা দাস। দেশভাগের শিকার হয়ে এলেন এপারে। কোনোক্রমে ঠাঁই হল বেলুড়ে। দুই ছেলের পেটের জ্বালা মেটাতে শুরু করলেন বিড়িবাঁধা। এক কালীপুজোয় ঠিক করলেন বাজি কিনবেন ছেলেদের জন্য। পয়সা কই? তাই ছেলেদের মুখ চেয়ে নিজেই শুরু করলেন চকলেট বোম তৈরি। তারপর যা ঘটল, তাকে এককথায় বলা যায় বাঙালির শিল্পোদ্যোগের নিঃশব্দ বিপ্লব। চকোলেট বোম হয়ে উঠল দেশের সেরা শব্দ বাজি। রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে সুখ্যাতি ছড়াল ভিনরাজ্যেও। রীতিমতো কপালে ভাঁজ পড়ল শিবকাশীর বাজি ব্যবসায়ীদের। একেই বলে দাঁত কামড়ে লড়া এবং জিতে নেওয়া দুনিয়া। এমন বুড়িমার চেয়ে বেশি ‘পুরুষ’ কে?
বুড়িমা আজ আর নেই। তবে পরের প্রজন্মের হাত ধরে তাঁর ব্যবসা চলছে ঝকমকিয়ে। এখন শব্দবাজি নিষিদ্ধ। তাই ব্র্যান্ড বুড়িমা রং-বেরংয়ের চোখ ধাঁধানো আলোর বাজি বানিয়ে থাকে। এবার আবার চমক আছে। চমকের নাম ‘পিঙ্ক ফায়ারওয়ার্কস’। নতুন এই গোলাপি বাজি বানিয়ে নারী শক্তিকে কুর্নিস জানাচ্ছে ব্র্যান্ড বুড়িমা।
বুড়িমা নারীশক্তিকে সম্মান না দেখালে কে দেখাবে! নিরিহ বুড়িমা থেকে ব্র্যান্ড বুড়িমার ইতিহাস যখন জানা। তবে এটাও ঠিক, ওই বুড়িমার জন্য কত বুড়িমার যে অক্কা তোলার অবস্থা হয়েছিল! সে সব জানে আমাদের ছোটবেলা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news