কিশোর ঘোষঃ

‘বিকে’র কথা কেউ মনে রাখিনি।
ভগৎ সিং, রাজগুরুরা বটুকেশ্বর দত্তকে বিকে বলেই ডাকতেন। সে কালে ভারতের চরমপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সকলের প্রিয়পাত্র ছিলেন ছোটখাটো চেহারার অসীম সাহসী বীর বিপ্লবী ‘বিকে’। যাঁকে আজকের ভারতীয়রা অজয় দেবগান অভিনীত ভগৎ সিং ছবিতে দেখে হয়তো দয়া করে কিছুটা চিনেছেন। অথচ যে আন্দোলনের জন্য ভগৎ ভারতের কিংবদন্তী বিপ্লবী সেই একই আন্দোলনে প্রায় সম পরিমাণ অবদান আমাদের বিকের। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সেই বিকের শেষ জীবন কেটেছিল পাটনায়। চরম দারিদ্রে। চূড়ান্ত লাঞ্ছনায়।
অথচ বটুকেশ্বর দত্ত ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম প্রধান ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী তথা ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা। বটুকেশ্বর দত্তের জন্ম পূর্ব বর্ধমানের ওয়ারি গ্রামে ১৯১০ সালের ১৮ নভেম্বর। বাবার নাম গোষ্ঠবিহারী দত্ত। কানপুরের পিপিএম হাই স্কুলে পড়ার সময় বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ ও ভগৎ সিং-এর সংস্পর্শে আসেন তিনি, এবং বিপ্লবী রাজনীতিতে যোগ দেন। হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদশ্য হন। কালে কালে দলে বোম্ব বানানোয় বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন বিকে। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে নয়া দিল্লীর সংসদ ভবনে বোমা ফেলার পরিকল্পনা করেন বটুকেশ্বর। পরিকল্পনা মাফিক দু’টি সাধারণ বোমা ফেলেন বিকে ও ভগৎ। যাতে কারও কোনও ক্ষতি না হয়, আবার কাজের কাজটি হয়। ভগৎ সিংহের বক্তব্য ছিল, যারা বধির তাদের শোনাতে হলে উচ্চকণ্ঠ প্রয়োজন। বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগৎ সিং বোমা বিস্ফোরণের পর ইস্তাহার ছড়িয়ে দেন নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে, স্লোগান দেন এবং শান্তভাবে গ্রেফতার বরণ করেন। গ্রেফতারের পর বিস্ফোরক আইন ও হত্যা প্রচেষ্টার দায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার নামে প্রহসন করে ব্রিটিশ সরকার। জেলে বিকে এবং ভগৎ সিং ভারতীয় রাজনৈতিক জেলবন্দিদের সঙ্গে অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে, রাজবন্দীদের অধিকারের দাবিতে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন করেন। শুরু করেন অনশন। যার ফলে কিছু অধিকার আদায় করতেও সক্ষম হন তাঁরা। একই অনশনে শহিদ হন বিপ্লবী যতীন দাস।
১৯৩৮-এ বটুকেশ্বর মুক্তি পান বটে, তবে বাংলা, পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশ তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ হয় করে দেয় ব্রিটিশরাজ। ১৯৪২ সালে ফের ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে তাঁকে। তাঁর কালাপানী হয়। আন্দামানের সেলুলর জেলে বন্দী থাকেন টানা ৩ বছর।
কিন্তু শুরুতে যা বলছিলাম, আজ বলে নয়, বেঁচে থাকতেই বিকেকে ভুলে গেছিল ‘স্বাধীন’ ভারত। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর খোঁজ রাখেনি নতুন দেশের কর্তা ব্যক্তিরা। তার উপর আক্রান্ত হন টিবি রোগে। সব মিলিয়ে বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে সর্বত্যাগী বিপ্লবীর শেষ জীবন। স্বাধীনতার পর বিয়ে করেন। থাকতেন পাটনায়। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হন। কিন্তু ব্যর্থ হন। তার আগে একধিকবার সরকারের কাছে একটি চাকরির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তাঁর আবেদন নিবেদনকে পাত্তা দেয়নি তৎকালীন সরকার।
ভাবতে অবাক লাগে যে আজ অবধি বিকের মতো বিপ্লবীর মূল্যায়ন হয়নি। শেষ জীবনে যখন প্রয়োজন ছিল তখন সরকারি সাহায্য পাননি। কোনওরক সম্মান, পুরস্কার জোটেনি কপালে। ১৯৬৫ সালের ২০ জুলাই দিল্লীর একটি হাসপাতালে চূড়ান্ত অবহেলায় লোকচক্ষুর অন্তরালে মৃত্যু হয় বটুকেশ্বর দত্তের।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news